জর্জ অরওয়েলের স্কুল জীবন

প্রকাশিত: ৫:৫৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২৪

তরুণ এরিক আর্থার ব্লেয়ারের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা একটি কনভেন্ট স্কুলে শুরু হয়। জীবনীকার গর্ডন বোকার বলেন, যেমনটি আগে ভাবা হতো যে অ্যাংলিকান নানদের দ্বারা স্কুলটি পরিচালিত হতো, আশলে তা নয়। স্কুলটি পরিচালিত হতো ফরাসি ক্যাথলিক নানদের দ্বারা। ১৯০৩ সালে ফ্রান্সে ধর্মীয় শিক্ষা সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর উরসুলিন অর্ডারের সদস্যরা নির্বাসিত হয়ে ব্রিটেনে স্কুল খোলেন। ছোটবেলায় এই স্কুলের প্রাথমিক স্মৃতি অরওয়েলের ক্যাথলিক ধর্ম সম্পর্কে তীব্র এবং কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত অনুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ক্যাথলিক ধর্মমতের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীলতার আধা-সর্বগ্রাসী অভিমুখীতার তীব্র ঘৃণা, ঐতিহাসিক সহনশীলতা এবং ধর্মতাত্ত্বিক পরিশীলিত রীতির কৃপণ প্রশংসায় খুব সামান্য মাত্রায় ভারসাম্য করা—একটি তর্কযোগ্য প্রশ্ন।

আট বছর বয়সে অরওয়েল একটি প্রিপ স্কুলে ভর্তির জন্য যোগ্য হন। এই ধরনের স্কুলগুলোর প্রস্তুতিমূলক বৈশিষ্ট্যটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলগুলোর লক্ষ্য ছিল ১৩ বা ১৪ বছর বয়সের শিক্ষার্থীদের একটি উন্নত স্কুল বা ‘ইটন’ ও ‘হ্যারো’র মতো কোনো চমৎকার পাবলিক স্কুলে ভর্তির যোগ্য করে তোলা। প্রিপারেটরি স্কুলগুলোর ছাত্ররা যে পরিমাণে বৃত্তি অর্জন করতো, বৃত্তিপ্রাপ্তদের প্রস্তুতকারক হিসাবে সেই খ্যাতির অনুপাতে স্কুলগুলো বেঁচে ছিল বা মারা গিয়েছিল। সুনাম বাড়ানোর জন্য স্কুলগুলো মেধাবীদের সল্প বেতনে শিক্ষালাভের সুযোগ দিত। তার মা তাকে পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করাতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার পরিবার ফি বহন করতে সক্ষম ছিল না। ইডা ব্লেয়ারের ভাই চার্লস লিমুজিনের সামাজিক সুসম্পর্কের কারণে অরওয়েল পূর্ব সাসেক্সের ইস্টবোর্নের সেন্ট সাইপ্রিয়ানস স্কুলে বৃত্তি অর্জন করেন। সম্ভবত ইডা ব্লেয়ার ইস্টবোর্নের সেন্ট সাইপ্রিয়ানস স্কুল পরিদর্শন করার সময় তেমনটিই আশা করেছিলেন। সেন্ট সাইপ্রিয়ানস স্কুলটি কুড়ি শতকের গোড়ার দিকে পূর্ব সাসেক্সের ইস্টবোর্নে শিক্ষা প্রসারে খ্যাতি অর্জন করে। সরকারী পেনশনের ওপর নির্ভর একটি পরিবারের জন্য বাৎসরিক ফি ১৮০ পাউন্ডের পরিবর্তে একটি অসমর্থ ফি বাবত এরিকের জন্য দিতে হবে মাত্র ৯০ পাউন্ড। এই অর্ধ-বৃত্তির বিষয়টি ছেলেটির কাছে প্রকাশ করা হয়নি। ইতোমধ্যে সে কয়েক বছর পার করেছে। এই কয়েক বছর ধরে ধনী ছেলেদের স্কুলে নিজেকে দরিদ্র ছাত্রদের একজন হিশেবে দেখার অপমান সহ্য করতে হয়েছে। প্রধান শিক্ষিকা সিসিলি এবং প্রধান শিক্ষক লুইস ভন উইল্কস (যিনি তাকে অকৃতজ্ঞতার জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন) উভয়েই তার মর্যাদা প্রকাশ করে দেন। স্কুলের প্রতি তার ঘৃণা আরও প্রবল হয়ে ওঠে যখন আট বছরের শিশুটিকে কয়েকবার বিছানায় প্রশ্রাব করার দায়ে প্রকাশ্যে বেশ কয়েকবার বেত্রাঘাত সহ্য করতে হয়। তার নিপীড়করা সঠিক ছিল –এই অনুভূতিটি ছিল ব্যথার যন্ত্রণা এবং অপমানের চেয়েও নিকৃষ্ট। শিশু অরওয়েল বিছানা ভিজিয়ে ফেলতেন। ঘটনাটিতে তার কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। নিজ মনের কোণে তিনি অপরাধী ছিলেন এবং কৃতকর্মের প্রাপ্য তিনি পেয়েছেন। অতএব, তিনি নিজেকে একজন শিকার হিশেবে দেখেছেন তবে নির্দোষ নয়।

স্থানীয় সংবাদপত্রে অরওয়েলের দুটি কবিতা প্রকাশ হয় (যার মধ্যে একটি কবিতা পুরো স্কুলে উচ্চস্বরে পড়ানো হয়)। তিনি ইটন এবং ওয়েস্টমিনস্টারে স্কলারশিপ জিতেছিলেন। তবুও সেন্ট সাইপ্রিয়ানস থেকে তিনি দূরে সরে এসেছিলেন, কারন কিছু মৌলিক নৈতিক স্তরে তার ব্যর্থতা ছিল। ত্রিশ বছর পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জর্জ অরওয়েল তার “সাচ, সাচ উইয়ার দ্য জয়েস” প্রবন্ধে আট বছর বয়সী এরিক ব্লেয়ারের জন্য সঠিক প্রতিশোধ নেন, তার ইংরেজি বোর্ডিং স্কুলটির প্রতি তিনি অভিযোগ তোলেন, যেমনটি তিনি “নাইনটিন এইটি ফোর” উপন্যাসে সর্বগ্রাসী বিশ্বের বিরুদ্ধে তুলেছিলেন। আদতে অরওয়েল স্কুলটিকে ঘৃণাই করতেন।

লুইস ভন উইলকস এবং তার স্ত্রী সিসিলি কমিন নামের তরুণ এক নব বিবাহিত দম্পতি ১৮৯৯ সালে সেন্ট সাইপ্রিয়ানস স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি মূলত কার্লাইসেল রোডের একটি বড় বাড়িতে পরিচালিত হতো। স্কুলটির খ্যাতি যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯০৬ সাল নাগাদ সামারডাউন রোডের পিছনে বিস্তৃত খেলার মাঠ সহ নব নির্মিত ভবনে যেতে বাধ্য হয়। স্কুলটি মাসকুলার খ্রিস্টধর্মের প্রচলিত নীতির সাথে পরিচালিত হতো যা রাগবি ঘরানার টমাস আর্নল্ডের সময় থেকে ব্যক্তিগত শিক্ষারীতিকে অনুসরণ করে এবং আত্মনির্ভরতা এবং চারিত্রিক সততা বিকাশের উপর অত্যন্ত জোর দেয়। এসবের পাশাপাশি অন্যান্য অনেক দিক থেকে সেন্ট সাইপ্রিয়ানস ছিল সেই সময়ের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় প্রিপ স্কুল থেকে একটু আলাদা ধরনের। অক্সফোর্ডের অল সোলস কলেজের ফেলো স্যার চার্লস গ্রান্ট রবার্টসন কর্তৃক পরিচালিত একটি স্বাধীন একাডেমিক মূল্যায়নে স্কুলটি প্রতি বছর নিজেকে উপস্থাপন করতো। স্কুলের ইউনিফর্মটি ছিল একটি ফ্যাকাশে নীল কলারের একটি সবুজ শার্ট, কর্ডুরয় ব্রীচ এবং একটি প্রতীক হিশেবে মাল্টিজ ক্রসসহ একটি টুপি।

মাসকুলার খ্রিস্টধর্ম ছিল একটি দার্শনিক আন্দোলন যা ১৯ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডে উদ্ভূত হয়েছিল। দেশপ্রেমের দায়িত্ব কর্তব্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পুরুষত্ব এবং ক্রীড়াবিষয়ক নৈতিক ও শারীরিক সৌন্দর্যে বিশ্বাসের রীতিতে চিহ্নিত হয়েছিল এই আন্দোলন। আন্দোলনটি ভিক্টোরিয়ান যুগের ইংরেজ পাবলিক স্কুলে ছাত্রদের চরিত্র গঠনের একটি পদ্ধতি হিসাবে প্রচলিত হয়। আমেরিকান রাষ্ট্রপতি থিওডোর রুজভেল্ট এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠেন যেটি মাসকুলার খ্রিস্টধর্ম অনুশীলন করত এবং তিনি এই আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট অনুগামী ছিলেন। রুজভেল্ট, কিংসলে এবং হিউজ শারীরিক শক্তি এবং স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনীতিতে খ্রিস্টীয় আদর্শের সক্রিয় সাধনাকে উন্নীত করেছিলেন। মাসকুলার খ্রিস্টধর্ম শারীরিক এবং খ্রিস্টীয় আধ্যাত্মিক বিকাশকে সমন্বয়কারী সংস্থাসমূহের মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে। এটি ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টবাদ উভয়ের মধ্যেই প্রভাবশালী। মাসকুলার খ্রিস্টধর্ম আন্দোলন কখনই আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত হয়নি। বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রবণতা যা বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশিত হয়েছিল এবং বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব এবং গীর্জা কর্তৃক সমর্থিত হয়েছিল।

ইটন এবং হ্যারো সহ শীর্ষস্থানীয় পাবলিক স্কুলসমূহে বৃত্তি অর্জনে উচ্চ সাফল্যের হার উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিভাবকদের সেন্ট সাইপ্রিয়ানসের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। যাইহোক, উইলকসরা প্রশংসা করেছেন যে পাবলিক স্কুল স্কলারশিপগুলো সত্যিই কম সচ্ছল পরিবারের প্রতিভাবান শিশুদের জন্য বরাদ্দ ছিল। এই বৃত্তিসমূহ অর্জন করার আশায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসকৃত ফিতে সেন্ট সাইপ্রিয়ানস-এ সেই ছাত্রদের স্থান দিত। আরও দুটি বৈশিষ্ট্য সেন্ট সাইপ্রিয়ানসকে আলাদা করেছে। প্রথম বৈশিষ্ট্যটি ছিল সাউথ ডাউনস উপত্যকার নৈকট্য। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় কাউন্টিগুলি জুড়ে পশ্চিমে হ্যাম্পশায়ারের ইটচেন উপত্যকা থেকে ইস্টবোর্নের সমূদ্র উপকূল পর্যন্ত প্রায় ৬৭০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় কাউন্টিগুলোর পূর্ব সাসেক্সের ডাউনল্যান্ড এস্টেটের চুনাপাথর পাহাড়ের বিশাল পরিসর এই সাউথ ডাউন। সাউথ ডাউন উপত্যকা ইংল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চুনাপাথর সমৃদ্ধ অঞ্চল হিশেবে স্বীকৃত। এই অঞ্চলটি দক্ষিণ ইংল্যান্ডের চুনাপাথর সমৃদ্ধ বিক্ষিপ্ত মাটির চারটি উচ্চভূমির প্রধান এলাকার একটি। মনোরম এলাকাটিতে ছেলেদের বন্য দৌড়, প্রাকৃতিক ইতিহাস অধ্যয়ন, হাঁটা, বনভোজন, অশ্বারোহণ এবং এমনকি সংলগ্ন মাঠগুলিতে গল্ফ খেলার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানো হয়েছিল। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি ছিল মিসেস উইলকসের অপ্রতিরোধ্য প্রভাব (তিনি ‘মম’ নামে পরিচিত ছিলেন)। তিনি স্কুলটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন এবং নারীমুক্তির আগেকার যুগে এটি তার অভিযোগের উপর একটি দুর্দান্ত ছাপ ফেলেছিল। মিসেস উইলকস ইতিহাস শিক্ষাদানে একজন মহান বিশ্বাসী ছিলেন এবং হ্যারো ইতিহাস পুরস্কারকে প্রধান পাঠ্যক্রমের মধ্যে আনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। মিসেস উইলকস ইংরেজিও শেখাতেন। তিনি স্পষ্ট ও উচ্চ মানের রচনার উপর গুরুত্ব আরোপ করে লেখকদের প্রজন্মকে উদ্দীপিত করেন। মিসেস উইলকস ছাড়াও, একটি বড় প্রভাব ছিল দ্বিতীয় মাস্টার আর এল সিলারের। তিনি স্কুলটি উদ্বোধনের পরপরই যোগ দেন এবং ৩০ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষাদানে রত ছিলেন।

চল্লিশতম বছরে স্কুল ভবনটি ১৯৩৯ সালের ১৪ মে আগুনে পুড়ে যায় এবং উপরের জানালা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে একজন গৃহকর্মী মারা যায়। সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়া ইস্টবোর্নের একটি প্রিপারেটরি স্কুল আসচাম সেন্ট ভিনসেন্ট স্কুলের ভবনে জরুরি আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৯ সালের ২০ জুলাই সেন্ট সাইপ্রিয়ানস পশ্চিম সাসেক্সের মিডহার্স্টের কাছে হুইস্পার্সে চলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনী কর্তৃক ভবনটি অধিগ্রহন না করা পর্যন্ত স্কুলটি ১৮ মাস সেখানেই অবস্থান করে। এরকম দুইবারের আঘাতের ফলে ছাত্র সংখ্যা হ্রাস পায় এবং গ্লুচেস্টারশায়ারের রোজহিল স্কুলের সাথে সংক্ষিপ্ত সংমিশ্রণের পরে অবশিষ্ট ছাত্ররা অক্সফোর্ড অঞ্চলের পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী সামার ফিল্ডস স্কুলে যোগ দিতে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ডব্লিউ জে ভি টমলিনসন (বিল) -এর সাথে চলে যায়। স্কুলের খেলার মাঠ ইস্টবোর্ন কলেজের কাছে বিক্রি হয়ে যায়।