লেখকদের রঙ্গ-রসিকতা প্রকাশিত: ৪:৫৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০২৫ লেখকদের ঘিরে মজার ঘটনা কম সূচিত হয় না। কিছু ঘটনা লেখক নিজে ঘটান, আবার কিছুটা ঘটে তাদের পরিপার্শ্বকে কেন্দ্র করে, বিভিন্ন লোকজনের মাধ্যমে। যেভাবেই ঘটুক, মজাদার ঘটনাগুলো তেমন আলোচিত হয় না বললেই চলে। আড়ালেই থেকে যায়। এই শূন্যস্থানে আমরা বরং কিছু একটা বাতচিতের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টাই করি! হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আহমদ ছফার সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। সুযোগ পেলেই পরস্পরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করতেন। একবার বইমেলায় হুমায়ুন আজাদের স্ত্রী লতিফা কোহিনূরের পা ছুঁয়ে সালাম করলেন আহমদ ছফা। কারণ ব্যাখ্যা করে বললেন— ‘এমন একজন মানুষের (হুমায়ুন আজাদ) সঙ্গে সংসার করতে পারেন যিনি, তিনি অবশ্যই সালাম পাওয়ার যোগ্য!’ হুমায়ূনকে আহমেদ হেয় করে হুমায়ুন আজাদ বলতেন তিনি অপন্যাসিক। উপন্যাস রচনা করেন না, যা হয় সেটা মূলত ‘অপন্যাস’! হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলনকে যৌথভাবে কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন হুমায়ুন আজাদ। বইটির নাম ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’। হুমায়ূন-মিলন দুজনেই মনে করলেন ‘বাণিজ্যিক ধারা’র ঔপন্যাসিক হিসেবে তারা দুজনই ‘নষ্ট’, এমন সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে উৎসর্গটিতে। ইমদাদুল হক মিলন প্রতিশোধ(!) নেওয়ার জন্য হুমায়ুন আজাদকে পাল্টা একটি বই উৎসর্গ করলেন। উপন্যাসটির নাম ‘বনমানুষ’। হুমায়ুন আজাদ এই ঘটনায় বিরক্ত হলেও হুমায়ূন আহমেদ মজা পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালের দিকে ইন্টারনেট এতটা সহজলভ্য ছিল না। তাই অনেককেই ই-মেইল করার জন্য ছুটতে হতো সাইবার ক্যাফেতে। লিটল ম্যাগাজিন ‘খেয়া’ সম্পাদক, কবি পুলক হাসান আজিজ সুপার মার্কেটে গিয়েছেন ই-মেইল করতে। দোকানদারের দিকে পেনড্রাইভ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘একটা ওয়ার্ড ফাইল মেইল করে পাঠাতে হবে।’ দোকানদার বললেন, ‘ই-মেইল অ্যাড্রেস বলেন।’ ‘ই-মেইল না তো, আমার জিমেইল।’ ‘জিমেইল বুঝেছি, আপনার ই-মেইল অ্যাড্রেসটা তো বলবেন!’ ‘আরে বাবা কতবার বলব— ই-মেইল নয়, আমার জিমেইল আছে!’ শেষপর্যন্ত কালজয়ী কম্পিউটার্সের ফারুক খানের মধ্যস্থতায় জিমেইল থেকেই ই-মেইলটা করা গেল! সম্প্রতি আরেকটা মজার ঘটনা বললেন পুলক হাসান। শীর্ষস্থানীয় একটি ওয়েব পোর্টালে নিয়মিত লেখেন তিনি। বিল জমতে জমতে পঁচিশ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। সেদিন সাক্ষাতে এ বিষয়ে বললেন, ‘আগামীকাল বিলটুর কাছে যাব। টাকা আনতে।’ ‘কোন বিলটু?’ ‘ডট কম অফিসের অ্যাকাউনটেন্ট।’ ‘যাওয়ার আগেই নাম জানলেন কীভাবে!’ ‘সহজ হিসাব। Bill বিল দেয় যে, সেই তো বিলটু!’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাস হাতে করে বাংলা একাডেমিতে গিয়েছেন দীপংকর গৌতম। সেখানে দেখা হলো ইংরেজি সাহিত্যের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে। তিনি অবাক হয়ে দীপংকর গৌতমকে বললেন, ‘আপনাকে তো বিজ্ঞানমনস্ক ভেবেছিলাম!’ ঘটনাটা অন্তত দুই যুগ আগের। কোনো এক ঈদের পরে প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম (সিঙ্গেল) কলামে প্রকাশিত হয় টুকরো সংবাদটি। প্রকৃতিবিষয়ক ও কথাসাহিত্যিক আলম শাইনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। ঈদের আগে বাড়ি যাওয়ার সময় বাসে পকেটমার তার পকেট কাটে। পরে পকেটমার ঠিকই লেখকের বাড়ি খুঁজে বের করে মানিব্যাগটি ফেরত দিতে এসেছিল। কারণ হিসেবে জানিয়েছিল— ‘আমার ওস্তাদ বলেছিলেন কখনো কোনো লেখকের পকেট কাটবি না!’ বর্তমানে সমাজে লেখকদের সম্মান নেই যারা বলেন, তারা অন্তত এখান থেকে সান্ত্বনা নিতে পারেন! পকেটমার শ্রেণির একজন অন্তত লেখকদের একটু সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন! প্রতি বছর একুশে বইমেলা এলেই অপ্রত্যাশিতভাবে অনেকের বই বেরোয়। এমন একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন লেখক-নাট্যকার শাকুর মজিদ। একদিন গৃহকর্মী মহিলা জানালেন, ‘দুইডা বই বাইর করছি!’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কোন প্রকাশনী থেকে?’ ‘খাটের নিচ থিকা!’ গত বছর বেড়াতে গিয়েছিলাম ঝিনাইদহের শৈলকূপায়। পরদিন ভোরে আমার হোস্ট বঙ্গ রাখাল পাবনার উদ্দেশে রওনা হলেন। ওখানে তার অফিস। তবে আমি কী করব পইপই করে সেই নির্দেশনাও দিয়ে গেছেন। চড়িয়ার বিল-শেখপাড়া বাজার পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাব। এর পেছনের অংশ শান্তিডাঙ্গা গ্রামে থাকেন লোককবি আকছারুল ইসলাম। সেখানে গিয়ে তার সাক্ষাৎকার নেব। এসব শেষ হলে যাব শৈলকূপায়। তরুণ কবি বায়েজিদ চাষাকে গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গ রাখাল বলে রেখেছেন আমাকে সময় দিতে হবে। শৈলকূপায় গেলাম। বায়েজিদ চাষা চারপাশে ঘুরিয়ে দেখালেন। একসময় টিউশনিতে যেতে হবে বলে বিদায় নিলেন। তবে একা ছাড়লেন না, তার স্থলাভিষিক্ত হলেন কমরেড সুজন বিপ্লব। আমার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা শুনে সুজন বিপ্লব রসিকতা করে বললেন, ‘তাহলে রাখাল দিয়ে গেছে চাষার কাছে!’ বঙ্গ রাখালের এটা বানানো নাম, বায়েজিদ চাষার অবস্থা জানি না। নিজের কথা যখন চলেই এলো, আরেকটা গল্প বলি। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম ঢাকা শহর ছেয়ে গেছে ‘স্বপ্নছোঁয়া’ চলচ্চিত্রের পোস্টারে। পোস্টার থেকে উঁকি দিচ্ছে নায়িকা ববি, নায়ক সাইমন সাদিক, ভিলেন মিশা সওদাগর প্রমুখের বদনখানি। পরিচালকের নাম আমার নামে— শফিক হাসান। একটু আশ্চর্য হলেও নিজেকে সামলে নিলাম। কমন নামের বিড়ম্বনার কারণেই তো নামে কিঞ্চিৎ সংস্কার আনলাম, তারপরও এমনটি ঘটল! তখনো বুঝতে পারিনি, নিজের বদনখানি আরও কত মলিন হবে। লেখক-প্রকাশকসহ বেশ কয়েকজন কল দিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বললেন, ‘ভাই, আপনি সিনেমা বানালেন! আর আমরা রোল পেলাম না! নায়ক না হই অন্তত ভিলেন তো হতে পারতাম!’ নারীরা তো আর নায়ক হতে পারবে না, তাদের আবদার নায়িকা বানানো হয়নি কেন! সেটা করা না গেলে নায়িকার বান্ধবীর চরিত্রটাও কি দেওয়া যেত না? সুমন মজুমদারসহ কেউ কেউ ফেসবুকে চলচ্চিত্র পরিচালক শফিক হাসান বলে ‘অপতথ্য’ ছড়াতেও কসুর করেননি। আগামীতেও নিশ্চয়ই তারা নামসংক্রান্ত এমন যন্ত্রণা দিয়ে যাবেন! সেকালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নামে দুজন লেখক ছিলেন। একদিন দুজনের দেখা হলে কম পরিচিত শরৎচন্দ্র বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই চরিত্রহীন শরৎচন্দ্র?’ এই শরৎচন্দ্র ঘায়েল করার জন্য ‘চরিত্রবান’ শরৎচন্দ্রের একটি বইয়ের নাম বলে পাল্টা প্রশ্ন করলেন। একই নামে দুজন লেখক থাকলে একটু খিটিমিটি লাগেই! সম্প্রতি একটি পাঠ-উন্মোচন অনুষ্ঠানের দাওয়াত কার্ড হাতে নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। উপন্যাসের নাম ‘উদ্বাস্তু’, লেখক আবদুল মান্নান সরকার। ০৪ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে বইটি নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আলোচনা করবেন সরকার আবদুল মান্নান। লেখক আর আলোচক একই ব্যক্তি নাকি! খটকা দূর করার জন্য প্রশ্ন করলে প্রকাশক আবু এম ইউসুফ জানালেন তাদের দুজনেরই অভিন্ন নাম। একজন নামটাকে আগ-পিছ করিয়ে নিয়েছেন ভিন্নতা বোঝানোর জন্য! একই নামে দুজন লেখক দেশে কম নেই। একইভাবে শামসুদ্দীন আবুল কালাম ও আবুল কালাম শামসুদ্দীনের নামও অভিন্ন। সম্পর্কে তারা নাকি মামা-ভাগ্নে। তো মামা-ভাগ্নেও পাঠককে বিভ্রান্ত করবেন বলে সমঝোতায় এলেন! বাংলা কবিতার সুপরিচিত নাম টাঙ্গাইলের মাহমুদ কামাল। তার বিপরীত নামের আরেকজন লেখকও আছেন— কামাল মাহমুদ। একদিন মাহমুদ কামাল কল করলেন তার ‘বৈরী’ মিতাকে। ওই প্রান্ত থেকে কামাল মাহমুদ ‘কে বলছেন’ প্রশ্ন করলে মাহমুদ কামাল বললেন, ‘আপনি যা, আমি তার উল্টোটা। আপনি কামাল মাহমুদ আর আমি মাহমুদ কামাল!’ কী মজার আলাপচারিতা। লেখালেখির শুরুর দিকে এমন আমার সঙ্গে একটি মজা করতেন সুমন্ত আসলাম। কল করে ‘শফিক হাসান বলছি’ বললে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করতেন ‘কখন বললেন’! কলকাতার ‘দেশ’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে আমাদের সাংবাদিক ও নাট্যকার ইমন চৌধুরীর গল্প। বন্ধুর গল্প, আগ্রহ নিয়েই পত্রিকা কিনলাম। পড়া শেষ করার আগেই ইমন চৌধুরী কল করে জানালেন তাজ্জব বিষয়টার কথা। ‘দেশ’ দপ্তর থেকে যোগাযোগ পরবর্তী বিলও পরিশোধ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় আবিষ্কার করলেন এই ইমন চৌধুরী তিনি নন, অন্য কেউ। কলকাতা বা আশপাশের অন্য কোনো অঙ্গরাজ্যে আরেকজন লেখক ইমন চৌধুরী আছেন! হয়তো এপারের ইমন চৌধুরীর গল্পটা প্রকাশিত হয়ে গেছে অন্য কোনো সংখ্যায়, কিংবা হয়নি। নিছক নামে নামে ভুল বোঝাবুঝির চিত্রনাট্য! SHARES সাহিত্য বিষয়: লোকজনেরসূচিতহুমায়ুন