চীনের উত্থান, শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশিত: ১:০৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৫

বিশ্ব হতবাক হয়ে দেখল যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের এক নজিরবিহীন ধস। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে গত সোমবার বাজার থেকে উধাও হয়ে গেল ১ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিশাল ক্ষতির মূলে ছিল সম্প্রতি চীনের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্টার্টআপ ‘ডিপসিক’। চীন সম্প্রতি তাদের নতুন এআই মডেল আর-১ প্রকাশ করেছে, যা বিশ্ব প্রযুক্তিতে আলোড়ন তৈরি করেছে। এই উদ্ভাবন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের এআই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এর মধ্য দিয়ে চীনের প্রযুক্তিবিদরা যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিকে তাদের নিজস্ব কৌশলে পরাজিত করার নতুন উপায় বাতলে দিলেন।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিপসিকের আর-১ মডেলটি জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করার ক্ষেত্রে ‘যুক্তি প্রয়োগ’ করতে সক্ষম। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্টদের উন্নত সফটওয়্যারগুলোর সমপর্যায়ে কাজ করে। তবে এই মডেল তৈরি করতে যে ব্যয় হয়েছে, তা মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের একই ধরনের মডেলের তুলনায় অনেক কম। যার কারণে মডেলটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে অল্পদিনেই ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটিকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের আইওএস অ্যাপ স্টোরে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া বিনামূল্যের অ্যাপে পরিণত হয়েছে।

চীনা এআই স্টার্টআপ ডিপসিকের যুগান্তকারী আবিষ্কার কেবল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেই নয়, প্রযুক্তিশিল্পেও গভীর প্রভাব ফেলতে চলেছে। ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটির উত্থান যেভাবে হয়েছিল, ডিপসিকের অগ্রগতিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাণিজ্যিক উন্নয়ন ও গ্রহণযোগ্যতাকে দ্রুততর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই আবিষ্কার এমন এক হুমকি তৈরি করেছে, যা পুরো মার্কিন শেয়ারবাজারের বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রচলিত ধারণাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কারণ এটি দেখিয়েছে উন্নত এআই মডেল তৈরি করতে বিশাল অবকাঠামো এবং বিপুল পরিমাণ মূলধনের দরকার পড়ে না।

ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ওয়ালস্ট্রিট পর্যন্ত এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, চীন কি এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলেছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্ব এআই প্রযুক্তির এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে। যেখানে মেশিনের বুদ্ধিমত্তা মানবসদৃশ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এআই গবেষণায় এই পর্যায়কে কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা (এজিআই) বলা হয়, যা মানব মস্তিষ্কের মতো চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে।

গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান এরিক শ্মিড বলেন, ‘চীনাভিত্তিক ডিপসিকের অ্যালগরিদমিক উদ্ভাবন এআই প্রতিযোগিতার এক নতুন বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছে। এই উদ্ভাবনের মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয়েছে, আমরা প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে নিশ্চিত নই; যা আমাদের আরও দক্ষ এবং শক্তিশালী এআই তৈরিতে অনুপ্রাণিত করছে। শ্মিডের পরামর্শ, এজিআই অর্জনে সফল হতে হলে উদ্ভাবনশীলতা এবং প্রতিভায় বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি ওপেন সোর্স পরিবেশকে সমর্থন করতে হবে। শুধু প্রতিযোগীদের চেয়ে বেশি খরচ করলেই হবে না, বরং বেশি উদ্ভাবনী হতে হবে।’

ডিপসিক সিলিকন ভ্যালির স্টাইলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল এক উদ্ভট হেজ ফান্ড বিলিয়নেয়ার লিয়াং ওয়েনফেংয়ের একটি পার্শ্বপ্রকল্প হিসেবে। তখন পৃথিবীজুড়ে চ্যাটজিপিটির পুনর্নির্মাণের প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে এটি চীনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এআই ল্যাবে পরিণত হয়েছে। সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।