নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা, বিপদে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা প্রকাশিত: ৪:০৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২৬ সবজি, মুরগি, ভোজ্যতেল, চিনিসহ বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দর অস্বাভাবিক বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতা। দাম বাড়তি থাকায় পছন্দের পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে কিছুটা কম দরের পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এ কারণে পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, দাম আরও বাড়তে পারে কিংবা সংকট দেখা দিতে পারে– এমন ভীতি থেকে ক্রেতারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছেন। একশ্রেণির ব্যবসায়ী এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাম আরও বাড়িয়েছেন। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মতো ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার বড় প্রভাব পড়েছে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে। এই সংকট দেশের বাজারেও পড়ছে। এতে যাতায়াত ও পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুত করছেন। এতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় পণ্য আটকে রেখে সংকট তৈরি করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো, মজুতের বিষয়ে জনগণকে জানানো, আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ এবং দেশীয় উৎপাদনের সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমাতে না পারলে এই সংকট সহজে কাটবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তরফে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার দাবি করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির চেয়ে মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ হলো পণ্যের দাম কমছে। তবে বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বেশির ভাগ জিনিসপত্রের দাম বাড়তি। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। মূলত গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেলের সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে। ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার প্রবণতা ছিল। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও, কারওয়ান বাজার ও মহাখালী কাঁচাবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিনের লিটার বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা দরে। আর পাম অয়েলের লিটার বিক্রি হয়েছে ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকা দরে। এক মাস আগে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দর ছিল যথাক্রমে ১৭৫ থেকে ১৮০ ও ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে দুই ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ১৯ টাকা। তবে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে ভোজ্যতেলের দাম আরও বেশি বেড়েছে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে সরকার প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৭৬ ও পাম অয়েল ১৬৬ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। সেই হিসাবে বাজারে সয়াবিনের লিটার ১৪ থেকে ১৯ এবং পাম অয়েলের লিটার ১৮ থেকে ১৯ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। বোতলে দাম লেখা থাকায় এর চেয়ে বেশি দরে বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন না বিক্রেতারা। যদিও কোথাও কোথাও সংকট দেখিয়ে বোতলের দামের চেয়েও বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে চিনির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। ঈদের আগে খোলা চিনির কেজি ছিল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। এখন বেড়ে হয়েছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে পাঁচ টাকা। বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা সমকালকে বলেন, কোম্পানিগুলো তাদের জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে। তা ছাড়া যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। সে কারণে মিলগেটে দর বেড়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারে। আমিষে নাভিশ্বাস সাধারণ মানুষের আমিষের বড় উৎস ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাজারেও অস্থিরতা চলছে। সোনালি মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকা টাকায়। রোজার মাঝামাঝি সময়ে দর ছিল ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা। ঈদের সপ্তাহখানেক আগে কিছুটা বেড়ে প্রতি কেজির দর ওঠে ৩৪০ থেকে ৩৭০ টাকা। সেই হিসাবে মাসখানেকের ব্যবধানে দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৩০ টাকা। এ ছাড়া ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় এবং লেয়ার মুরগির কেজি ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা। সোনালি মুরগির দাম অস্বাভাবিক বাড়ায় আঁচ লেগেছে গরুর মাংসের বাজারে। ঈদের আগে গরুর মাংসের কেজি ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৮০০ টাকা। তবে দাম বাড়লেও বাজারে মুরগি বা গরুর মাংসের কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি মাছের বাজারে। তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে এমন মাছ রুই, কাতলা, তেলাপিয়ার দাম কিছুটা বাড়তি। ঈদের আগের তুলনায় কেজিতে ২০ টাকার মতো বেড়েছে। সবজির বাজারে উত্তাপ চার-পাঁচ দিনে বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সবজির বাজার। ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে বেশ কয়েকটি সবজির কেজি শতক ছাড়িয়েছে। চিচিঙ্গা, ঝিঙে ও ধুন্দল– এই তিনটি গ্রীষ্মকালীন সবজি। বাজারে সরবরাহে কমতি না থাকলেও ১০০ টাকার কমে এগুলোর কোনোটি কেনা যাচ্ছে না। চার দিন আগে এসব সবজির কেজি ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ঈদের আগে ও পরে পটোলের কেজি কেনা গেছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বাজারে কাঁকরোলের দেখা মিলেছে। নতুন করে আসায় দাম বেশি, কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। ঢ্যাঁড়শের কেজি ৫৫ থেকে ৭০ টাকা। তবে স্বস্তি আছে আলু-পেঁপের দরে। ২৫ থেকে ৩০ টাকায় আলু, ৪০ থেকে ৫০ টাকায় পেঁপে কেনা যাচ্ছে। বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি ইমরান মাস্টার বলেন, কয়েক দিন আগে বৃষ্টি হয়েছিল। এতে অনেক সবজি ক্ষেতে পানি উঠে ফসলহানি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ পরিবহন ভাড়া। এক মাস আগে যে ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৫ হাজার, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। তবে চাল, আটা, ডিমসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম মাসখানেক ধরে স্বাভাবিক রয়েছে। সরকার নির্ধারিত দরে মিলছে না এলপিজি নিত্যপণ্যের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের দামও চড়েছে। গত ২ এপ্রিল ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারিণ করেছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে কোথাও এ দরে পাওয়া যাচ্ছে না গ্যাস সিলিন্ডার। খুচরা বিক্রেতারা দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার পরামর্শ কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট দেখিয়ে মানুষের পকেট কাটছেন। সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চেয়েও বেশি বেড়েছে। অথচ সরকার বলছে, সবকিছু স্বাভাবিক। আগের সরকারগুলোও বলত– সব ঠিক আছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের সুরে এ ধরনের বক্তব্যে মানুষের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা ফ্রি স্টাইলে দাম বাড়িয়ে ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে যেন জিম্মি করতে না পারে, সে জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক আবু ইউসুফ বলেন, কঠোর বাজার তদারকির বিকল্প নেই। প্রশাসনের পাশাপাশি বাজার কমিটিকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের চিহ্নিত করে শুধু জরিমানা নয়, কারাগারেও পাঠাতে হবে। এ ছাড়া সরকারকে সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগামী দু-তিন মাসের মজুতের বিষয়ে জনগণকে তথ্য দিয়ে আশ্বস্ত করতে হবে। সরকার কী বলছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল সমকালকে বলেন, তদারকি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অধিদপ্তর এখন ভোজ্যতেল আর এলপিজি গ্যাসের বাজারের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। অন্য নিত্যপণ্যের বাজারেও তদারকির চেষ্টা চলছে। তবে ভোক্তা অধিদপ্তরের একার পক্ষে এত বড় কাজ করা কঠিন। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ভোজ্যতেলের সরবরাহ ও বিপণন পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে খুচরা বিক্রেতারা জানান, তারা চাহিদার চেয়ে তেল কম পাচ্ছেন। পাঁচ লিটারের বোতল একেবারে কম। এ ছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। এ সময় তিনি দ্রুতই সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে আশ্বাস দেন। SHARES অর্থনীতি বিষয়: নিত্যপণ্যের দামপণ্যমধ্যবিত্ত