ইলিশের দাম নাগালে আনতে সিন্ডিকেট ভাঙা জরুরি

প্রকাশিত: ১২:১৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২৬

একসময় বাংলা নববর্ষ মানেই ছিল ঘরের পান্তা ভাত, কাঁচা পেঁয়াজ আর সবার জন্য ভাগ করে নেওয়া এক টুকরো ইলিশ—সামর্থ্য যাই হোক, আনন্দে ছিল না কোনো ভেদাভেদ। নদীর দেশ বাংলাদেশের মানুষের কাছে ইলিশ শুধু খাবার নয়, ছিল উৎসবের প্রাণ, ঐতিহ্যের স্বাদ। কিন্তু আজ সেই পরিচিত দৃশ্য হারিয়ে যাচ্ছে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে ইলিশের দাম এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, নববর্ষের আনন্দ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ইলিশ আজ আর সবার নয়—এ যেন এক সীমিত সুখের স্বাদ, যা কেবল কিছু মানুষের মধ্যেই আটকে যাচ্ছে।

ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ—একটি পরিচয়, একটি গর্ব, একটি ঐতিহ্য। অথচ এই মাছটির স্বাদ থেকে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বছরের পর বছর বঞ্চিত। এই বৈপরীত্য শুধু দুঃখজনক নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি, বাজার কাঠামো এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ জনমনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে দেশের বাজারের চাহিদাকে উপেক্ষা করে ভারতে ইলিশ পাঠানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়েও কম মূল্যে। ফলে দেশের মানুষ নিজেদের জাতীয় সম্পদের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থেকেছে; এই বঞ্চনা কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি এক ধরনের গভীর মানসিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব একটা আসেনি—এমন ধারণা এখনো জনমনে রয়েছে। ফলে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের দিকে। মানুষের প্রত্যাশা—জাতীয় মাছ ইলিশ যেন আর কেবল ধনীদের পাতে সীমাবদ্ধ না থাকে; এটি যেন ফিরে আসে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। কিন্তু এই প্রত্যাশার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজারে সক্রিয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

বাস্তবতা হলো, ইলিশের উৎপাদন কম নয়—বরং গত এক দশকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাটকা সংরক্ষণ, মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা এবং জেলেদের সহায়তা কর্মসূচির কারণে উৎপাদনের ভিত্তি আরও মজবুত হয়েছে। তবুও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। জেলে যে দামে মাছ বিক্রি করেন, ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি সুসংগঠিত চক্র, যারা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে।

এই সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে ইলিশ কখনোই সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে না। সরকার যদি কার্যকরভাবে এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, তাহলে বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং দামও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে—এটাই এখন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে চোরাই পথে ইলিশ পাচার। সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইলিশ অবৈধভাবে ভারতে চলে যায়, যেখানে একই মাছ তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয়। এই মূল্য পার্থক্য পাচারকারীদের উৎসাহিত করে এবং দেশের বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। ফলে বাংলাদেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম আরও বেড়ে যায়। তাই সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সরাসরি ভোক্তা সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত।

অন্যদিকে সরকারিভাবে ইলিশ রপ্তানি না করার কথা বলা হলেও “সৌজন্যমূলক” পাঠানোর বিষয়টি জনমনে প্রশ্ন তোলে। যখন দেশের মানুষই ইলিশ কিনতে পারে না, তখন বিদেশে ইলিশ পাঠানো স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। তাই এই ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ-এর বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, “চোর-পুলিশ খেলে জাটকা নিধন বন্ধ করা যাবে না।” এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায়—কাগুজে অভিযান বা লোকদেখানো তৎপরতা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন কঠোর, ধারাবাহিক এবং নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, যেখানে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ থাকবে না।

জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ, মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা এবং জেলেদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি—এসব উদ্যোগ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই উৎপাদন যেন ন্যায্যমূল্যে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়।

বিশেষ করে সীমান্তে পাচার বন্ধ করতে হবে, বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, সরাসরি জেলে থেকে ভোক্তার কাছে বিক্রির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, এবং সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। সর্বোপরি, নীতিনির্ধারণে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

ইলিশ কেবল একটি মাছ নয়—এটি আমাদের জাতির পরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এই মাছ যদি দেশের মানুষের পাতে না পৌঁছায়, তাহলে সেটি শুধু একটি বাজার ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। সুতরাং, সময় এসেছে—ইলিশকে আবারও সাধারণ মানুষের পাতে তোলার। কারণ জাতীয় সম্পদের স্বাদ থেকে জনগণকে বঞ্চিত রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।