টিকার ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারকে ৫টি চিঠি দেয় ইউনিসেফ

প্রকাশিত: ১:১৩ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২৬

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা (ইউনিসেফ) জানিয়েছে-গত বছর দীর্ঘ সময়জুড়ে বাংলাদেশে হামের রুটিন টিকার সংকট ছিল। ২০২৪ সাল থেকেই তারা (ইউনিসেফ) অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকা নিয়ে অন্তত ১০ বার সতর্ক করেছিল। আর ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচটি চিঠি দিয়েছিল। শেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে পৌঁছেছিল। ইউনিসেফ আশা করেছিল যে, যিনি নতুন করে এই দায়িত্ব (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) পাবেন তার ডেস্কে চিঠিটি থাকবে। কিন্তু পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।

বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশ কার্যালয়ের জেপিজি কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ও চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রম’ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন, ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থাকে। এর ফলে দেশে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের মিজেলস আউটব্রেক (হাম প্রাদুর্ভাব) পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশে আবার হামের রুটিন টিকা এসেছে। এখন দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আওতায় আনা এবং আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ কোটি ৭৮ লাখ (১৭.৮ মিলিয়ন) হামের টিকা আসে, যা ছিল মোট চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। দেশে বছরে প্রায় ৭ কোটি (৭০ মিলিয়ন) হামের টিকার প্রয়োজন হলেও দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত রুটিন টিকা পাওয়া যায়নি।

রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘কোনো মহামারি রাতারাতি ঘটে না। কিছু বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এরকম পরিস্থিতি দেখা দেয়। বিশেষ করে টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে। টিকার ঘাটতি নিয়ে ২০১৯ সালের পর থেকেই সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করেছে।’

সংকট তৈরির মূল কারণ ব্যাখ্যা করে ইউনিসেফ জানিয়েছে, এই সংকট কোনো অর্থ বা তহবিলের অভাবের কারণে হয়নি; বরং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণ ছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে (অন্তর্বর্তী সরকারের) মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্ত। ইউনিসেফ প্রতিনিধির ভাষ্য, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন হওয়া উচিত নয়। সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

গত দুই বছরে বাংলাদেশে কোনো টিকা সংকট ছিল কিনা জানতে চাইলে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘আমরা ২০২৪ সালেই টিকার সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। পরবর্তী দুই বছরে বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আমরা আগেভাগেই সতর্ক করছিলাম এবং ক্রমাগত মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম যে তারা সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার পর ‘আফটার অ্যাকশন রিভিউ’ বা পরবর্তী আলোচনা এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা খতিয়ে দেখব কেন অনেক বছর ধরে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ শিশু টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।’ টিকা কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে রানা বলেন, ‘আমরা যা যা কিনি, তার জন্য জনসম্মুখে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান সবচেয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতি। তবে টিকার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন, কারণ এটি একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত পণ্য। এখানে আপনি শুধু এক লাখ মানুষের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক কিনছেন না, আপনার লক্ষ্য অনেক বড় সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনার কাছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত টিকা আছে। তাই আপনি সবচেয়ে সস্তা টিকার পেছনে ছুটবেন না। আপনি সেই টিকাই নেবেন, যেটার কার্যকারিতা প্রমাণিত এবং যার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তাই ইউনিসেফ বহু বছর আগে বিশ্বের জন্য টিকা সংগ্রহ ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’

ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পক্ষ থেকে টিকা সংগ্রহ করি। টিকা প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের মান নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। যেহেতু আমরা অনেক বেশি পরিমাণে কিনি, তাই আমরা দামে সাশ্রয় করতে পারি। ইউনিসেফ যে দামে টিকা পায়, তার চেয়ে কম দামে দরপত্র পাওয়া সম্ভব নয়, আমরা তা জানি।’

আরও ৬ শিশুর মৃত্যু : বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম এবং রোগটির উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে হাম উপসর্গে ৩ (ঢাকা-১, সিলেট-১, খুলনা-১) শিশু এবং নিশ্চিত হামে ৩ (ঢাকা-১, বরিশাল-২) শিশু মারা গেছে। এ সময় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪০৮ শিশু। অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দুই মাসে ৪৮১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৮০ শিশুর। আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪০১ শিশু। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৬৭ শিশু। আর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৫৭ হাজার ৮৫৬ শিশু।