চীনের ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব

প্রকাশিত: ২:২৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২৬

বাংলাদেশে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে চীনের ১১টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় মুদ্রায় যা ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে)। চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাস অনুসন্ধান, মহাসড়ক, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা, লজিস্টিকস, টেক্সটাইল, রেলওয়ে ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ করবে। এছাড়াও বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে মালয়েশিয়ায় দুই প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাস ও এয়ার এশিয়া। ২১ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ দুটি সফর করেন। প্রধানমন্ত্রীর ওই সফরে বিনিয়োগের ব্যাপারে এসব অগ্রগতি হয়েছে। ওই সফরে চীনের বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনসহ একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল।

জানতে চাইলে বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান খান রচি রোববার যুগান্তরকে বলেন, চীন ও মালয়েশিয়া সফরে বিনিয়োগসংক্রান্ত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ও মোংলায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন নিয়ে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়বে। তিনি বলেন, সিসিপিআইটির (চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড) সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে। এটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। কারণ এর ফলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের একটি টেকসই প্রবাহ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, এই সফরে বিনিয়োগসংক্রান্ত একাধিক প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এই বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্য অংশ আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। মালয়েশিয়ায় পেট্রোনাস ও এয়ার এশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে তারা বাংলাদেশের কৌশলগত খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সামগ্রিকভাবে এই দুই সফর বাংলাদেশের বিনিয়োগ পাইপলাইনকে আরও শক্তিশালী করবে।

চীনের মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রস্তাব দিয়েছে সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ। এই গ্রুপটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) প্রকল্পে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। এছাড়া ঝংক্সিন এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন গ্রুপ পায়রা বন্দরে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার শিল্পে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এছাড়াও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে ৮৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে সাংহাই এসইউএস এনভায়রনমেন্ট। চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার এবং চায়না ফিউচার এনার্জি গ্রুপ গ্যাস অনুসন্ধানে ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়াও স্মার্ট মিটার উৎপাদন, কোল্ড চেইন ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ, পুনর্ব্যবহৃত টেক্সটাইল, রোলিং স্টক উৎপাদন, কারিগরি শিক্ষা এবং ভেষজ চাষসহ বিভিন্ন খাতে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। এরমধ্যে হুয়াক্সিন টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি পুনর্ব্যবহৃত সুতা উৎপাদন, লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন এবং ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ১৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। সিআরআরসি জিয়াং বিটিএমএফের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে রেলওয়ের রোলিং স্টক অ্যাসেম্বলি কারখানা স্থাপনে ১৯০ মিলিয়ন ডলার, চায়না কেপাই এডুকেশন গ্রুপ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা পার্ক নির্মাণে ২৭০ মিলিয়ন ডলার এবং চায়না শানডং ঝংক্সিন ফার্মাসিউটিক্যাল বৃহৎ পরিসরে চীনা ভেষজ উদ্ভিদ চাষে ১৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।

বিডা সূত্র জানায়, প্রস্তাবগুলো সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। প্রস্তাব বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, চীন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থনীতি। দেশটির সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বেশকিছু চুক্তি হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক। তিনি বলেন, চীন ছাড়া আমাদের প্রকল্পগুলোতে কোনো দেশই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করবে না। করলেও দু-একটি প্রকল্পে করতে পারে। কিন্তু একাধিক প্রকল্পে অর্থায়ন মিলবে না।

আবু আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে এখন সবচেয়ে বেশি দরকার বিনিয়োগ। কারণ বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান বাড়বে না। মানুষের হাতে কাজ না থাকলে অর্থনীতির উন্নতি হবে না। এসব বিবেচনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর স্বার্থে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বাড়াতেই হবে। অপরদিকে আমাদের প্রবাসীদের জন্য মালয়েশিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি আমাদের জন্য অন্যতম শ্রমবাজার। এই শ্রমবাজার কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।