সিনেমার গানের মূল স্বত্ব কিছু কোম্পানি গিলে খাচ্ছে, এ অনিয়ম দূর করতে হবে

প্রকাশিত: ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৫, ২০২৪

সংগীতের যুবরাজ আসিফ আকবরের জন্মদিন আজ। বায়ান্ন বছর পেরিয়ে তেপান্নতে পা রাখলেন জনপ্রিয় এই গায়ক। বিশেষ এই দিনটি উপলক্ষে সংগীতের নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক আনন্দ

বায়ান্ন বছর চলে গেল। এটা ভাবতে কেমন লাগে?

জন্মদিনের উচ্ছ্বাস থাকে ছোটবেলায়। যখন নামডাক হয়ে গেল তখন এক ধরনের ব্যাপার ছিল। কয়েক বছর পর ভাবলাম, দেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২৫ মার্চ। কালরাত। অনেক উচ্ছ্বাস হয়েছে। দেশের এত বড় একটা ঘটনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে উৎসবটা সেভাবে আর পালন করি না।

তবুও পরিবারের সঙ্গে একটি প্ল্যান থাকে না, আজকের দিনটি কীভাবে কাটবে?

বড় ছেলে, ছেলের বউ দেশের বাইরে। এক ছেলে, মেয়ে আর স্ত্রী। সন্ধ্যায় বাসায় ওরা কেক কাটে। এর পর অফিসে অনেকে আসে, তাদের সঙ্গে আড্ডা হয়। এভাবেই কাটে।

গান নিয়ে বর্তমান ব্যস্ততা কেমন?

যা কিছু করি গান নিয়েই, মিউজিক নিয়েই আছি। আমার চিন্তাভাবনা মিউজিক নিয়েই। আমি আমার উইং ডেভেলপড করছি, বাইরের কোম্পানির সঙ্গেও কাজ করছি। কিছু মেগা প্রজেক্ট হবে মুম্বাইবেজড। মুম্বাইয়ের কিছু কোম্পানির সঙ্গে কথা হচ্ছে। টি-সিরিজসহ অন্যান্য কোম্পানিও আছে। সামনে মুম্বাইয়ের রেকর্ডিং নিয়ে একটা চাপ থাকবে। এখন এর বেশি বলতে চাচ্ছি না। সময় হোক তারপর সব জানাব।

শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গে দ্বৈত গান করার কথা ছিল। ওই প্রজেক্ট কতদূর এগোল?

শ্রেয়া ঘোষাল এখন ইন্ডিয়ান আইডল নিয়ে ব্যস্ত। জুন পর্যন্ত টাইম নিয়েছে। শ্রেয়ার সঙ্গে ভয়েসটা দিতে পারলে ভালো লাগত। এর মধ্যে অনুরাধা পাড়োয়ালের সঙ্গে একটা দ্বৈত গান হচ্ছে। উনি ভয়েস দিয়েছেন। আগামী মাসে মুম্বাই গিয়ে আমি ভয়েস দেব। ওটার বাংলা-হিন্দি দুটো ভার্সনই হবে। বাংলাটার প্রডিউস আমি নিজেই করব, আর হিন্দিটা করবে টি-সিরিজ। বাংলাদেশি প্রডিউসাররা খুব বেশি অ্যাকটিভ নয়। আমি নিজেই প্রডাকশন চালু রাখছি।

দুই বছর আগে আমাদের সময়ের ইন্টারভিউয়ে আপনি বলেছিলেন, আগামীতে কোনো কোম্পানিই থাকবে না। তা হলে কি সেটাই সত্য হতে যাচ্ছে? এ থেকে উত্তরণের কি উপায় নেই?

অবশ্যই আছে। প্রত্যেকটা সমস্যা সমাধান নিয়ে আসে। এটা আমি বিশ^াস করি। কারণ হচ্ছে আমরা খুব দ্রুত সময়ে সিডি ক্যাসেট থেকে ভার্চুয়ালি চলে আসছি। এটা বুঝতেই আমাদের অনেক সময় চলে গেছে। এর পর যখন বুঝলাম তখন আমরা জড়িয়ে গেলাম অন্তর্দ্বন্দ্বে। কোম্পানি ভার্সেস গীতিকার, গীতিকার ভার্সেস সুরকার, সুরকার ভার্সেস শিল্পী। সেই সঙ্গে মুঠোফোন প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন মামলা, মোকদ্দমা। ফোন কোম্পানিকে আদালতে তোলা। তারা গান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। এখান থেকে ভালো রেভিনিউ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বিরাট বাজার ছিল আমাদের। আমি স্বপ্ন দেখছিলাম, আমাদের শিল্পীদের হয়তো পেনশন স্কিম বা কিছু একটা চালু হয়ে যাচ্ছে। দু-চারজন লোক মামলা-মোকদ্দমা করে তাদের বিমুখ করে ফেলল। এর পর স্বাধীন অ্যাপ, বিলিভ মিউজিক এসেছে। এমন আরও অনেক কোম্পানি আসবে। ইন্ডিয়ান কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি মোড়কে আসবে। আর সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল মিউজিক ভিডিওর পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করা। বাজেট শর্টকাট করে লিরিক ভিডিও করে গান প্রকাশ করতে হবে।

আপনি কি লিরিক ভিডিওতে জোর দিচ্ছেন?

আমি সব সময় লিরিক ভিডিওর প্রতি জোর দিয়ে আসছি। আমার অনেক গান, প্রায় এক হাজারের মতো গান লিরিক ভিডিও আকারে প্রকাশ হবে। এ গানগুলো গীতিকার, সুরকার সবাই নিজের চ্যানেল থেকেও প্রকাশ করতে পারবে। এ কাজটা আমি নিজ খরচেই করব। রেভিনিউ যার যার চ্যানেল থেকে যেভাবে আসে সেভাবেই পাবে। কারণ রেভিনিউয়ের আইনগতভাবে কোনো কিছুর সুরাহা হয়নি।

এতে করে কি ইন্ডাস্ট্রির প্রাণ ফিরে আসবে বলে মনে হয়?

শিল্পীদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বহুদিন ধরে ফাইট করে আসছি। জেল থেকে আসার পরও সমস্যাগুলো সমাধান হয়নি। সিনেমার গানের মূল স্বত্ব অনুপমসহ কিছু কোম্পানি একচ্ছত্রভাবে গিলে খাচ্ছে, এসব অনিয়ম দূর করতে হবে। কারণ ফিল্মের গানের রেভিনিউ, ফিল্মের গানের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। এখনো বাংলাদেশে যত গান হিট হয়, ফিল্ম থেকেই হয়। অডিও গান ইন্ডাস্ট্রি ডোমিনেট করে না। অডিও গান সাময়িক। এই মুহূর্তে ভারতের পার্লামেন্টে একটা আইন আছে, ৪৩-এর অ্যাক্ট। ওটার আলোকে বাংলাদেশের আইনটা সংশোধন করতে হবে। প্রডিউসারের কাছ থেকে একচ্ছত্র অধিকার তুলে নিয়ে শিল্পীদের ডিস্ট্রিবিউট করে দিতে হবে। প্রডিউসারও ভাগ পাবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আসল প্রডিউসার কিন্তু নেই। এখন আছে ফাও প্রডিউসার। ফিল্মের গান থেকে রেভিনিউ আসা শুরু হলে ইন্ডাস্ট্রি চাঙ্গা হবে। এখানে আরও ইনভেস্টমেন্ট হবে। কোম্পানিগুলো বহুমাত্রিক ব্যবসা করতে পারবে। শিল্পী, সুরকার, গীতিকার সবাই ভালোভাবে বাঁচতে পারবে।

কাভার সং করছেন। শ্রোতারা বেশ ভালোভাবে নিচ্ছে। এটা কি চলতে থাকবে?

হ্যাঁ চলতেই থাকবে। আমার শুরু তো কাভার সং দিয়ে। কিশোর কুমারের দশটা গান গেয়েছিলাম। রিমেক অ্যালবামও করেছিলাম। হেমন্ত মুখার্জির ‘আয় খুকু আয়’, এবং ‘শোন একদিন’Ñ এই দুটি গান ছোটবেলা থেকে গেয়ে আসছি এবং ভয়েসের সঙ্গে একটা সামঞ্জস্যতা রেখে যতটুকু পারা যায় ভালো গাওয়ার চেষ্টা করেছি। এর পর আমার রিমেকের নেশা চলে আসছে। আমাদের দেশের যারা, অনেক পুরনো গায়ক-গায়িকা, গীতিকার, কম্পোজার আছেন তাদের ট্রিবুট করে গাইব। মকসুদ জামিল মিন্টু ভাইকে ট্রিবুট করে ‘একদিন ঘুম ভেঙ্গে দেখি’ গানটি প্রকাশ করলাম। মকসুদ ভাই আমাকে মেসেজ দিয়েছে ‘ছোটভাই তুমি আমাকে মনে রেখেছ, ট্রিবুট করেছ আমি খুব খুশি হয়েছি।’ ইশতিয়াক ভাইয়ের স্ত্রী লিখেছে, ‘আপনার মাধ্যমে আমার ইশতিয়াক বেঁচে থাকুক।’ যে গানে যার অবদান বেশি তাকে ট্রিবুট করে গাইতে থাকব। নতুন গাইলাম ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’, খালিদ হাসান মিলু ভাইকে ট্রিবুট করে গাইব ‘কত দিন দেখি না মায়ের মুখ’।

সিনেমার গানে খুব বেশি দেখা যায় না, আপনার তো গাওয়ার শতভাগ সামর্থ্য আছে। কেন?

যারা এই সময়ে কাজ করছে তাদের একটা পছন্দ থাকতে পারে। এটা হয়, পটপরিবর্তন হয়, টেস্ট চেঞ্জ হতে পারে। ইন্ডিয়াতেও তো এমন হয়েছে কুমার শানু, উদিত নারায়ণ, সনো নিগম এখন আর আগের মতো গায় না। নতুন প্রজন্ম গাইছে। সমস্যাটা হলো টেস্ট পরিবর্তন হওয়ার পর সেটা দীর্ঘস্থায়ী কতটুকু হলো? আমার কাছে যেগুলো আসে, অন্যরা যে গানগুলো গাইতে পারবে না সেই গানগুলো আমাকে দিয়ে গাওয়ানো হয়। আমিও ওই গানটার জন্য অপেক্ষা করি।

সিনেমার গানে বিশাল সিন্ডিকেটের কথা শোনা যায়। এ নিয়ে আপনার ভাষ্য কী?

সিন্ডিকেট সব সময় ছিল। আমাদের সময়ও ছিল, রুনা আপাদের সময়ও ছিল। এগুলো সব সময় থাকে। নতুন কিছু নয়। কোনোটা খারাপ, কোনোটা ভালো। কেউ পায় না, কেউ বেশি পায়।

আপনি তো প্লেব্যাক সব সময় করতে চান?

প্লেব্যাক সব সময়ই করতে চাই। সিনেমার পরিচালক, প্রযোজক যখন বলবে এই গায়ককে আমার লাগবে। তখন নিঃসন্দেহে তারা আমাকে দিয়ে গাওয়াবে। ফিল্মের ব্যাপারটাই এমন। এটা মেনে নিতে হবে। এটাই পেশাদারিত্ব।

সংগীতের দীর্ঘ পথচলায় অনেকের সঙ্গে মান-অভিমান হয়েছে, আবার দেখা যাচ্ছে সমঝোতাও করে নিচ্ছেন।

না, সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। শওকত আলী ইমন ভাইয়ের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তিতে কিছুদিন আগে একটা প্রোগ্রাম হয়। ইমন ভাই যেহেতু আমার বস। তো আমি ইমন ভাইকে বললাম ইমন ভাই, আমার একটা শখ আপনার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তিতে একটা জাঁকজমক পার্টি হবে। আপনি কাকে কাকে দাওয়াত দেবেন দিতে থাকেন। কারণ এটা হলো আপনার প্রোগ্রাম। আপনি চাইলে শফিক তুহিনকেও দাওয়াত দিতে পারেন। ইমন ভাই তাকে ইনভায়েড করেছে। প্রোগ্রামের দিন মানাম ভাই, ইমন ভাই এবং আঁখি আলমগীর ছিল। তারা চেয়েছে এটার শেষ হোক। আমাদের নাম ঘোষণা দিল, স্টেজে উঠলাম। এখানে জুনিয়র অনেক ছেলেমেয়ে ছিল। তাদের সামনে আমি কোনো সিন ক্রিয়েট করিনি। আমি জাস্ট শফিক তুহিনকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। একসঙ্গে ছিলাম দীর্ঘদিন। এমন তো কিছু হয়নি যে ওখানে সিন ক্রিয়েট করব। যাই হোক ওখানেই শেষ করেছি। তার পর আমি বলেছি, আপনারা যা করেছেন ঠিক আছে, আর আগানোর দরকার নেই। আমি তো মামলায় জিতে গেছি এখন। সব মামলায় জিতেছি। আরেকটা মামলা আছে মাদকের। ওটাও জিতব। আমার উচিত ছিল মামলা থেকে মুক্ত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করা। যা ঘটার ঘটে গেছে। জেলে গেছি, ভুলে গেছি। আমার ছেলেরা আমাকে চোর মনে করত। মানুষ আমাকে চোর মনে করছিল। এটা গা থেকে পড়ে গেছে। আমার আর তাদের সঙ্গে ঝগড়া, ঝামেলা করার সময় নেই।

শিল্পীরা অভিমানী হয়। সাদি মহম্মদ চলে যাওয়ায় অভিমানের বিষয় সামনে এসেছে। আপনার ভীষণ প্রিয়শিল্পী খালিদও অসময়ে চলে গেলেন। প্রায়ই শোনা যায়, আমরা গুণীদের সঠিক সময়ে সম্মান দিচ্ছি না।

অভিমান নয়। অভিমানের কিছু নেই। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক এগুলো তো রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক। আমাকে দিয়েই যদি বলি, ২০০১ সালে ক্যারিয়ার শুরুর পর ২০০৩, ২০০৪, ২০০৫ সালে আমার তিনটা সিনেমা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডের। ‘মেঘের কোলে রোদ’, ‘সবুজের বুকে লাল’ ও ‘কারাগার’। এ সিনেমার সবাই ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। আমি কিন্তু বিএনপির লোক। আমি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেলাম না। ফ্যান্টাস্টিক! ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলো। ‘রাণী কুঠির বাকি ইতিহাস’ সিনেমার ‘আমার মাঝে নেই এখন আমি’র জন্য ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেলাম। তার পরও আরও অনেক সিনেমা হয়েছে। আসলে আমি যোগ্যতম সময়ে পাইনি। এটা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।

পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়েও নানা বিতর্ক। এসব নিয়ে কী বলবেন?

পুরস্কার নিয়ে, বিশেষ করে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড নিয়ে বলব, আমাদের জুরি বোর্ডের কোনো ভূমিকাই নেই। এটা ফরমায়েশি কাজ করছেন তারা। জনপ্রিয় গান, মুখে মুখে যেগুলো থাকে সেগুলো ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পায় না। কোথাকার কোন চ্যানেল একবার মাছরাঙা সিনেমা বানায়, আরেকবার চ্যানেল আই সিনেমা বানায়, আর তারা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পায়। এগুলো কেউ দেখেও না। এগুলো বড় ধরনের নাটক আর কী! মেইনস্ট্রিম সিনেমাকে প্রমোশন করা হয় না। আর একুশে পদকের ব্যাপারে হয়েছে কী, নোবেল থেকে শুরু করে বড় বড় সব পদকের জন্যই আবেদন করতে হয়। কারোর প্রাপ্তিতে অন্যরা যা খুশি বলুক। আমাদের জায়গাটা কিন্তু ছোট। আমরা সবাই সবাইকে চিনি। এখানে সিনিয়রদের সিনিয়রের মতো কথা বলতে হবে। জুনিয়র যারা, অনেক বড় তারকা তাদেরও সেভাবে বলতে হবে। পাবলিক প্লেসে না বলে প্রয়োজনে আলোচনা করে নেওয়া যায়। মানুষের গালিগালাজ খাওয়াইয়ে নিজে বড় হয়ে কোনো লাভ নেই। এতে করে ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যারা ইউটিউবার তারা খুব মজা পায়। কনটেন্ট বানায়। এতে নিজেরা নিজেদের ছোট করা হচ্ছে।