কে এই মাসুদ পেজেশকিয়ান?

প্রকাশিত: ৪:২২ অপরাহ্ণ, জুলাই ৬, ২০২৪

সংস্কারপন্থী নেতা মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। কট্টরপন্থী নেতা সাইদ জালিলিকে হারিয়ে তিনি দেশটির ১৪তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। তাঁর নির্বাচিত হওয়ার খবরে অনেকটা আশার আলো দেখছেন লাখো ইরানি। পেজেশকিয়ান ইরানের দ্রুত অগ্রসরমান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে শান্তিপূর্ণ উপায়ের দিয়ে অগ্রসর হতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির নেতৃত্বে ইরানে সংস্কারপন্থি নীতির পুনরুত্থান হয়। গত ১৯ মে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর আবারও সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট পেল দেশটি।

ব্যক্তিগত জীবন 
মাসুদ পেজেশকিয়ানের জন্ম ১৯৫৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইরানের মাহাবাদে। তাঁর বাবা একজন আজেরি এবং মা একজন কুর্দি। বহুভাষী পেজেশকিয়ান ইরানের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিষয়ে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে পরিচিত। কার্ডিয়াক সার্জন পেজেশকিয়ান পরবর্তীতে তাবরিজ ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সের প্রধান হন।

১৯৯৪ সালে এক মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও কন্যাকে হারান পেজেকশিয়ান। বেঁচে যাওয়া দুই ছেলে ও এক মেয়েকে একা বড় করেন তিনি।

রাজনৈতিক জীবন
রাজনীতিতে প্রবেশ করে পেজেশকিয়ান ইরানের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় পেজেশকিয়ানকে প্রথম সারিতে মেডিকেল টিম মোতায়েনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

পেজেশকিয়ান পরবর্তীতে পার্লামেন্ট সদস্য বা আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হন। ৫ বার আইনপ্রণেতা হিসেবে নির্বাচিত হন পেজেশকিয়ান। পরবর্তীতে পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নিবন্ধন করলেও পেজেশকিয়ান তা প্রত্যাহার করে নেন। আর ২০২১ সালের নির্বাচনে যাদের ওপর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নিষেধাজ্ঞা ছিল, তিনি সে সকল প্রার্থীদের মধ্যে একজন। অবশেষে তাঁর ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল।

কেমন প্রেসিডেন্ট হতে পারেন পেজেশকিয়ান
ইরানে একটি বাস্তবসম্মত পররাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির বিষয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে সম্মত হয়েছিল তেহরান। এ ছাড়া দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে সামাজিক উদারনীতি এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদের সম্ভাবনাগুলোকে উন্নত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

যদিও ইরানি দ্বৈত শাসনব্যবস্থার কারণে দেশটির প্রেসিডেন্ট পারমাণবিক কর্মসূচি বা মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের বিষয়ে বড় ধরনের কোনো নীতিগত পরিবর্তন করতে পারেন না। দেশের শীর্ষ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

পেজেশকিয়ান টেলিভিশন বিতর্ক ও সাক্ষাৎকারে খামেনির নীতির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে ইরানের বিভিন্ন নীতির ধরনকে প্রভাবিত করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। এ ছাড়া খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।

২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন পেজেশকিয়ান। নারীদের পোশাক বিষয়ক নীতি বা হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হয় মাহসার। তাঁর মৃত্যুতে ইরানজুড়ে টানা কয়েক মাস বিক্ষোভ চলে। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় বহু বিক্ষোভকারীকে।

সম্প্রতি পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা হিজাব আইনকে সম্মান করব। তবে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা অমানবিক আচরণ সমর্থন করা উচিত নয়।’

গত মাসে তেহরানে একটি সভায় ২০২২-২৩ সালে হিজাব আন্দোলনে জড়িত অভিযোগে কারাবন্দি শিক্ষার্থীদের মুক্তির সম্পর্কে করা একটি প্রশ্নের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘রাজনৈতিক বন্দিদের বিষয়টি আমার ক্ষমতার মধ্যে নেই। এ বিষয়ে আমি চাইলেও কিছু করা সম্ভব হবে না।’

সবমিলিয়ে মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্ট হিসেবে কতখানি সফল হতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এপি