মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সার সরবরাহে বিঘ্ন, বিশ্বজুড়ে চরম খাদ্যসংকটের আশঙ্কা প্রকাশিত: ৫:৪২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২৬ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা কেবল জ্বালানি খাতের ওপর আঘাত হানছে না, বরং এটি বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থাকেও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিটাস মেরিটাইম-এর চিফ অপারেটিং অফিসার অলিভিয়া লেনক্স-কিং এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সারের সরবরাহ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। গতকাল মঙ্গলবার হংকংয়ের ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, বর্তমানে ড্রাই বাল্ক শিপিং শিল্পের প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সার। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত সার ইউরিয়া বাণিজ্য এই সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈশ্বিক ইউরিয়া চাহিদার প্রায় ১২ শতাংশই মেটানো হয় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যা বর্তমানে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। লেনক্স-কিং আরও উল্লেখ করেন, ইউরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক দেশ চীনও তাদের সার কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে ইউরিয়া সারের ঘাটতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। যদি এই পরিস্থিতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত গড়ায়, তবে সারের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন হ্রাস করবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, বিশ্বের মোট সার বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশই সম্পাদিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই জলপথটি দীর্ঘকাল রুদ্ধ থাকলে সারের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। এই মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করে জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, জ্বালানি ও সারের দামের এই লাগামহীন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বছরের মধ্যভাগ নাগাদ অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন হতে পারে। বৈশ্বিক এই সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিনগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন কেবল আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথগুলো রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোতে এই প্রভাব পড়েছে সবথেকে ভয়াবহভাবে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো হুঁশিয়ারি দিচ্ছে যে, খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এই মহাদেশের অরক্ষিত দেশগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। মর্সি ক্রপস-এর আফ্রিকাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মেলাকু ইয়ারগা সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই সংকটের সময়টি ইথিওপিয়া, সুদান ও সোমালিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। এসব দেশের লাখ লাখ মানুষ আগে থেকেই খরা, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি এবং অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের কবলে পড়ে ধুঁকছে। জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) মতে, সোমালিয়া ও সুদানে গত কয়েক বছরে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল; মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশ দুটি আবারও তীব্র অনাহারের মুখে পড়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ডব্লিউএফপি আশঙ্কা করছে যে, বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার্তের তালিকায় যুক্ত হতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন একসময়ে এই সংকট দেখা দিয়েছে যখন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো ভয়াবহ তহবিলসংকটে ভুগছে। ইয়ারগা সতর্ক করে বলেন, আমরা হয়তো ‘সহায়তা-পরবর্তী যুগের’ প্রথম বড় সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষের প্রয়োজন সীমাহীন হলেও সেই অনুযায়ী ত্রাণের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনা আরও কয়েক মাস স্থায়ী হলে তার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ। এটি কেবল বপন মৌসুমকেই ব্যাহত করবে না, বরং খাদ্যমূল্যকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে পুরোপুরি অচল করে দেবে। সাহায্য সংস্থাগুলো যখন ইতোমধ্যেই তাদের সামর্থ্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছে, তখন এই পরিস্থিতি আরও অনেক মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: অস্থিরতাআশঙ্কাখাদ্যসংকটেরগভীর সংকটের মুখেবিশ্বজুড়েবৈশ্বিকমধ্যপ্রাচ্য সংঘাতেমানবিক বিপর্যয়ের বিষয়েশীর্ষস্থানীয়সমুদ্রপথেসার সরবরাহে