এসএসসির ফল ‌‘পুনর্মূল্যায়ন ফাঁদ’, শিক্ষার্থীদের গচ্চা ২০ কোটি টাকা

প্রকাশিত: ২:১৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২৬

এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়। ফল নিয়ে অসন্তোষ, সন্দেহ-সংশয় থাকলে শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারে। আগে এ পুনর্নিরীক্ষণে প্রাপ্ত নম্বর যোগ-বিয়োগে ভুল আছে কি না, শুধুই তা দেখা হতো। এবার পুনরায় খাতা দেখা হবে- এমন ঘোষণায় এসএসসি ও সমমানের ফল পুনর্নিরীক্ষণে রেকর্ডসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। ফলে এসব আবেদন নিয়ে খাতা পুনর্মূল্যায়নে হিমশিম খাচ্ছে বোর্ডগুলো।

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্যমতে, গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। পরদিন ১১ আগস্ট থেকে পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন শুরু হয়। এ প্রক্রিয়া চলেছে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে চার লাখ দুই হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী আবেদন করেছেন। শিক্ষার্থীদের অনেকে একাধিক খাতা চ্যালেঞ্জ বা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনও করেছেন। এতে মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছে।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানিয়েছেন, খাতা আবারও দেখা হবে অর্থাৎ, পুনর্মূল্যায়ন হবে- এমন ঘোষণায় তারা আবেদন করেছেন। খাতাপ্রতি বাড়তি ফি পরিশোধ করেছেন। তাদের প্রত্যাশা খাতা পুনরায় মূল্যায়ন করলে তারা পাস অথবা আগের চেয়ে ভালো ফল করবেন।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এক বিষয়ের খাতা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনে ফি ১৫০ টাকা। এবার মোট আবেদন জমা পড়েছে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি। সেই হিসাবে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনে শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচ হচ্ছে ১৯ কোটি ৩১ লাখ ৮৮ হাজার ৯০০ টাকা

যদিও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা ভিন্ন তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রী সব খাতা পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দিলেও এটি প্রায় অসম্ভব কাজ। স্বল্পসময়ে প্রায় ১৩ লাখ খাতা তৃতীয় পরীক্ষক দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এ কারণে এবারও নামমাত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে। যেসব শিক্ষার্থী পুনর্মূল্যায়নের আশায় খাতা চ্যালেঞ্জের বা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন করেছে, তারা মূলত ‌‌‘ফাঁদে’ পা দিয়েছে বলেও মনে করছেন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শিক্ষার্থীদের ব্যয় প্রায় ২০ কোটি টাকা, ফি গ্রহণ নিয়ে ‘প্রশ্ন’

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এক বিষয়ের খাতা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনে ফি ১৫০ টাকা। এবার মোট আবেদন জমা পড়েছে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি। সেই হিসাবে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনে শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচ হচ্ছে ১৯ কোটি ৩১ লাখ ৮৮ হাজার ৯০০ টাকা।

পুনর্নিরীক্ষণে কোনো ফি নেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফরম পূরণের সময় পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা মূল্যায়ন ও ফল তৈরি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়। এরপরও শিক্ষার্থীদের খাতা ঠিকঠাকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। তখন যদি কোনো শিক্ষার্থী আবেদন করতে চায়, তাহলে তাকে ফি দিতে হবে কেন? শুধু সে পুনর্নিরীক্ষণ চায়, এ আগ্রহ জানালেই তো বোর্ড পুনরায় খাতা দেখে তার ফল জানাতে বাধ্য।’

এ শিক্ষাবিদের সঙ্গে একমত রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া এক শিক্ষার্থীর মা। আরিফা জাহান হেনা নামের ওই অভিভাবক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা তো ফরম পূরণের সঙ্গে সব ফি দিয়েছি। তাহলে আবার কেন ফি দিতে হবে? তাছাড়া পুরো খাতাটা নাকি দেখাও হয় না। তারা যোগ বা বিয়োগ করতে ভুল করে; সেটা সংশোধনে আবার উল্টো আমাদের কাছ থেকেই টাকা নেন। এটা তো জুলুম।’

খাতা পুনর্নিরীক্ষণে বিগত ৪ বছরে কত আবেদন

২০২২ সালে এসএসসির ফল প্রকাশের পর দুই লাখ ৭৮ হাজার ৮৫৪টি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়ে। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে প্রায় ৫ লাখ আবেদন জমা পড়েছিল। ২০২৫ সালে ৬ লাখ ২৩ হাজার খাতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।

পুনর্নিরীক্ষণে কোন বছরে শিক্ষার্থীদের ব্যয় কত

আগে প্রতিটি খাতা পুনর্নিরীক্ষণ ফি ছিল ১২৫ টাকা। সেই হিসাবে ২০২২ সালে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার ৭৫০ টাকা আয় করেছিল শিক্ষা বোর্ডগুলো।

২০২৩ সালে উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জ বা পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন করতে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে শিক্ষা বোর্ডে গিয়েছিল প্রায় ৫ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন ফি থেকে বোর্ডগুলোর আয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা চ্যালেঞ্জের ফি বাড়িয়ে দেয় শিক্ষা বোর্ডগুলো। ওই বছর থেকে পুনর্নিরীক্ষণ ফি ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সেই হিসাব ধরে ২০২৫ সালে পুনর্নিরীক্ষণ বাবদ শিক্ষার্থীদের ব্যয় এবং বোর্ডগুলোর আয় ছিল প্রায় ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

আবেদন লাখ লাখ, ফল পরিবর্তন খুবই অল্প শিক্ষার্থীর

প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণে লাখ লাখ আবেদন জমা পড়লেও খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তন হয়। এতে বোর্ডের আয় বাড়ে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের বাড়তি খরচের বোঝা টানতে হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে পৌনে ৩ লাখ খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করা হলেও ফল পরিবর্তন হয় মাত্র ২ হাজার ৭৮৩ জনের। ২০২৩ সালে সাড়ে ৪ লাখ আবেদন জমা হলেও ফল পরিবর্তন হয়েছিল ১১ হাজার ৩৬২ জন শিক্ষার্থীর।

jagonews24খাতা পুনর্মূল্যায়নে নতুন নীতিমালা করা যায় কি না, তা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী/ফাইল ছবি

২০২৪ সালে ৫ লাখ আবেদন জমা পড়লেও ৮ হাজার ৮৭৫ জনের ফলাফলে পরিবর্তন আসে। আর ২০২৫ সালে সোয়া ৬ লাখ আবেদন থাকলেও ফল পরিবর্তন হয়েছিল ১৫ হাজার ২৪৩ জন শিক্ষার্থীর।

এবার পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা, আবেদনে রেকর্ড

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনা, খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা এবং পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দেন। এতে খাতা পুনর্নিরীক্ষণে আবেদনও পড়েছে বেশি।

বার এসএসসির উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ১২ লাখের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এ অবস্থা দেখে মনে হয় প্রায় সব শিক্ষার্থীই খাতা পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়। তাই খাতা পুনর্মূল্যায়নে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।- ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, শিক্ষামন্ত্রী

শিক্ষা বোর্ড সূত্র বলছে, আগে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা শিক্ষার্থীর উত্তরপত্রের চারটি দিক দেখা হতো। সেগুলো হলো- উত্তরপত্রের সব প্রশ্নের সঠিকভাবে নম্বর দেওয়া হয়েছে কি না; প্রাপ্ত নম্বর গণনা ঠিক রয়েছে কি না; প্রাপ্ত নম্বর ওএমআর শিটে ওঠানো হয়েছে কি না এবং প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী ওএমআর শিটের বৃত্ত ভরাট করা হয়েছে কি না। এ চারটি জায়গায় কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করে নতুন করে ফল প্রকাশ করা হতো।

তবে এবার শিক্ষামন্ত্রী খাতা পুনরায় মূল্যায়নের ঘোষণা দেওয়ায় বিপত্তিতে পড়েছে বোর্ডগুলো। ঢাকা বোর্ডের একজন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নাম প্রকাশ না করে জানান, এবার বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে, অথচ সময় মাত্র ২৩ দিন। এ সময়ের মধ্যে পুনর্নিরীক্ষণ করে ফল প্রকাশ করতে হবে। সেক্ষেত্রে পুনরায় খাতা দেখা প্রায় অসম্ভব কাজ।

তিনি বলেন, ‘প্রতি বান্ডিল খাতা থেকে র‌্যানডম (দ্বৈবচয়ন ভিত্তিতে) কয়েককটি খাতা নিয়ে দেখে তাতে গরমিল পাওয়া গেলে, বান্ডিলের সব খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে। যদি কোনো বান্ডিলে এমন সমস্যা না হয়, তাহলে শুধু নম্বরের যোগ-বিয়োগ ঠিক করা হবে।’

পুনর্নিরীক্ষণের ফল কবে, একাদশে আবেদন যেভাবে

চলতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন শুরু হচ্ছে আগামী ২ সেপ্টেম্বর। অনলাইনে এ প্রক্রিয়া চলবে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অথচ ফলাফলে অসন্তুষ্ট হয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ করা হতে পারে ১০ সেপ্টেম্বরের পর। সেক্ষেত্রে কেউ যদি ফেল থেকে পাস করেন, তাহলে তিনি কীভাবে আবেদন করবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা বোর্ড সূত্র বলছে, পুনর্নিরীক্ষণে ফল বদলানো শিক্ষার্থীদের একাদশে ভর্তিতে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হবে। ১০ সেপ্টেম্বর আবেদন শেষ হলেও পুনর্নিরীক্ষণের পর ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ফল বদলানো শিক্ষার্থীরা এ সুযোগ পাবেন।

কা বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুনর্নিরীক্ষণে কেউ যদি ফেল থেকে পাস করে, সেদিক বিবেচনায় দুই দিন আবেদনের সুযোগ রেখেছি। তারা একই নিয়মে অনলাইনে আবেদন করতে পারবে। তাদের আবেদন নেওয়ার পর একাদশে ভর্তিতে কে, কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে, সেই তালিকা প্রকাশ করা হবে। এতে ভয় বা উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। আগ্রহী সবাই ভর্তির সুযোগ পাবে।’

চাপের মুখে নিয়ম বদলানোর পরিকল্পনায় শিক্ষামন্ত্রী

এদিকে, পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণার পর রেকর্ডসংখ্যক আবেদন জমা পড়ায় চাপে পড়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। পুনর্মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশে দেরি হবে। এতে একাদশ শ্রেণির ভর্তি ও ক্লাস শুরুর সময়ও পিছিয়ে যাবে। সব মিলিয়ে শিক্ষাপঞ্জি এলোমেলো হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

চাপের মুখে খাতা পুনর্মূল্যায়নে নতুন নীতিমালা করা যায় কি না, তা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। গত ১৭ আগস্ট রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ড. এহছানুল হক মিলন বলেন, এবার এসএসসির উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ১২ লাখের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এ অবস্থা দেখে মনে হয় প্রায় সব শিক্ষার্থীই খাতা পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়। তাই খাতা পুনর্মূল্যায়নে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এত খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তাই খাতা পুনর্মূল্যায়নে নতুন নীতিমালা প্রণয়নে পরিকল্পনা করা হচ্ছে; যেন কোন ধরনের খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা যাবে, সেগুলোর আওতা নির্দিষ্ট করা যায়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অসংখ্য খাতা পুনর্নিরীক্ষণে আবেদন এসেছে এবার। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় কাজ করছি। পুনর্মূল্যায়ন বলেন বা পুনর্নিরীক্ষণ বলেন, যেটা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা, সেটাই আমরা মানছি। এর বাইরে আর কিছু জানানো সম্ভব নয়।’