নিরাপদ চিকিৎসার বৈশ্বিক বার্তা

প্রকাশিত: ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

চিকিৎসা সেবার মূল ভিত্তিই হলো রোগীর কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং তাদের ক্ষতি থেকে মুক্ত রাখা। তবে বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাগুলোর উন্নতির মাঝেও ভুল বা অসাবধানতাবশত ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা চিকিৎসা জগতের এক বড় চ্যালেঞ্জ। রোগীদের প্রতি এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি কমানো এবং মানসম্মত সেবার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বিশ্ব রোগী সুরক্ষা দিবস’।

দিবসের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রোগীর সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আন্দোলন জোরদার করতে ২০১৯ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত ৭২তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই দূরদর্শী উদ্যোক্তার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো এবং ভুলবশত চিকিৎসা সংক্রান্ত ক্ষতি হ্রাস করা। এই ধারাবাহিকতায় সর্ব প্রথম ২০১৯ সালেই আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালন করা হয়। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি সনাতন নীতি ‘আগে কোনো ক্ষতি কোরো না’-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২১ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদি একটি বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যেন বিশ্বের প্রতিটি কোণে রোগীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে ওঠে।

​রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ৫ কৌশল

​স্বাস্থ্য খাতকে ঝুঁকিমুক্ত ও কার্যকর করতে বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবিত বহুমুখী পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত জরুরি-

​১. নিরাপত্তা সংস্কৃতি চর্চা

ভুল গোপন না করে খোলামেলা রিপোর্ট তৈরি করা, ত্রুটি থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করা।

২. মানসম্মত প্রোটোকল প্রয়োগ

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রোপচারের সুরক্ষা চেকলিস্ট এবং নির্ভুল ওষুধ প্রশাসন প্রোটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা।

৩. প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিক শিক্ষা

চিকিৎসাকর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করা এবং হালনাগাদ গাইডলাইন অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষিত করা।

৪. আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন

ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, কম্পিউটারাইজড ফিজিশিয়ান অর্ডার এন্ট্রি এবং ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট ব্যবহার করে ভুল কমানো।

৫. রোগী ও স্বজনদের সম্পৃক্তকরণ

চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় রোগী ও তার পরিবারকে সম্পৃক্ত করা, যেন তারা নিজেদের অবস্থা ও ওষুধ সম্পর্কে সচেতন থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।

​দূরীকরণের ভবিষ্যৎ সচেতনতা ও কার্যক্রমে বৈশ্বিক সংহতি

এই বিশেষ দিনে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজের সমন্বয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহে সেমিনার, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়। এছাড়া রোগী সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সেতু ও হাসপাতালগুলোতে চমৎকার ‘কমলা রঙের’ আলো জ্বালিয়ে বিশ্বব্যাপী ঐক্য প্রদর্শন করা হয়।

দূরীকরণের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

​বিশ্বব্যাপী দক্ষ জনবলের অভাব এবং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত সংস্থানের ঘাটতি এখনো রোগী সুরক্ষায় বড় বাধা। তবে একটি সমন্বিত ও সহানুভূতিশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব। রোগী এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও নিখুঁত সেবার এই আন্দোলন কিন্তু একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিদিনের অব্যাহত চর্চার অঙ্গীকার হওয়া উচিত।