সোনার প্রতি সবার এত আকর্ষণ কেন?

প্রকাশিত: ২:১৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

মানুষের হাতে ধাতুর ব্যবহার শুরু হওয়ার বহু আগেই প্রকৃতিতে থাকা সোনার ঝলক হয়তো মানুষের চোখে পড়েছিল। পাথর, কাঠ কিংবা লোহার মতো সোনায় সহজে মরিচা ধরে না, এর উজ্জ্বলতা দীর্ঘদিন থাকে এবং খুব সামান্য সোনা দিয়েও তৈরি করা যায় অসাধারণ অলংকার। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরলতা, সৌন্দর্য, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মূল্য। ফলে হাজার হাজার বছর ধরে সোনা মানুষের কল্পনা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

যতই দিন যাচ্ছে সোনার দাম বাড়ছে এবং সেই সঙ্গে মানুষের এর প্রতি আগ্রহ-আকর্ষণ বাড়ছে। কিন্তু জানেন কি কেন সোনা অন্য ধাতুর চেয়ে মূল্যবান। কেন দাম বাড়লেও মানুষের এর প্রতি আগ্রহ-আকর্ষণ কমছে না।

বিজ্ঞাপন

সোনার প্রথম আবিষ্কার কবে জানেন?

সোনা কে প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন, তার নির্দিষ্ট উত্তর ইতিহাসে নেই। কারণ সোনা প্রকৃতিতে কখনো কখনো ধাতব অবস্থাতেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ অন্য অনেক ধাতুর মতো আকরিক থেকে জটিল প্রক্রিয়ায় ধাতু আলাদা করার প্রয়োজন সবসময় হয় না।

সোনা শুধু মূল্যবান ধাতু নয়, বরং সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক

সোনা শুধু মূল্যবান ধাতু নয়, বরং সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক

প্রাচীন মানুষের সোনার ব্যবহার সম্পর্কে সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রমাণগুলোর একটি পাওয়া গেছে বর্তমান বুলগেরিয়ার ভার্না নেক্রোপলিসে। সেখানে ৪৬০০ থেকে ৪২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের সমাধি থেকে প্রায় তিন হাজারের বেশি সোনার বস্তু পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এটি প্রাগৈতিহাসিক সমাজে সম্পদ ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

তবে এরও আগে সোনা প্রক্রিয়াজাত করার প্রমাণের দাবি রয়েছে। বুলগেরিয়ার ইউনাতসিতেতে পাওয়া একটি ছোট সোনার পুঁতির বয়স প্রায় ৬৫০০ বছর বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। ফলে সোনার ইতিহাস লিখতে গেলে একটি নির্দিষ্ট ‘আবিষ্কারের দিন’ বলা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

২১ নাকি ২২ ক্যারেট সোনা ভালো, আসল নকল চিনবেন যেভাবে

মিশরে সোনা ছিল দেবত্বের প্রতীক

প্রাচীন মিশরের সঙ্গে সোনার সম্পর্ক ছিল বিশেষ গভীর। মিশরীয়রা সোনাকে শুধু অলংকার হিসেবে ব্যবহার করত না; মন্দির, ধর্মীয় আচার এবং মৃতদের সমাধিতেও এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের তথ্য অনুযায়ী, মিশরে চতুর্থ সহস্রাব্দ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকেই সোনার তৈরি বস্তু পাওয়া যায়। রাজপরিবারের পাশাপাশি সমাজের অপেক্ষাকৃত সাধারণ মানুষের কাছেও সোনার অলংকার ছিল।

৪৬০০ থেকে ৪২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের সমাধি থেকে প্রায় তিন হাজারের বেশি সোনার বস্তু পাওয়া গেছে

৪৬০০ থেকে ৪২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের সমাধি থেকে প্রায় তিন হাজারের বেশি সোনার বস্তু পাওয়া গেছে

মিশরীয়দের কাছে সোনার রং ও স্থায়িত্বের সঙ্গে দেবত্ব ও অমরত্বের ধারণার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। মৃতদের মুখে সোনার পাত বা সোনালি মুখোশ ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া যায়। মধ্য রাজ্যের এক সমাধিতে প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১৯৮১-১৯৭৫ সালের একটি সোনার মুখোশের নিদর্শন রয়েছে। আর তুতানখামুনের সমাধির বিপুল সোনার সামগ্রী আজও প্রাচীন মিশরের ঐশ্বর্যের অন্যতম প্রতীক। তার সমাধি তুলনামূলকভাবে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় সেই সময়ের রাজকীয় সম্পদের এক বিরল ছবি ইতিহাসের সামনে এসেছে।

শুধু মিশর নয়, মেসোপটেমিয়াতেও সোনার কদর

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উর নগরীর সমাধিগুলোতেও সোনার অলংকার, মাথার সাজ, কানের দুল, হারসহ নানা মূল্যবান সামগ্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রায় ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের এসব সমাধি দেখায়, সোনা তখন শুধু সৌন্দর্যের বিষয় ছিল না এটি সামাজিক মর্যাদা ও আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল। এমনকি প্রাচীন মিশরে ধাতুর ওজন হিসাব করে লেনদেনের নজিরও রয়েছে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে সোনার বার, আংটি ও অন্যান্য ধাতব বস্তু নির্দিষ্ট ওজন অনুযায়ী লেনদেনের কাজে ব্যবহৃত হতো।

তদের মুখে সোনার পাত বা সোনালি মুখোশ ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া যায়

তদের মুখে সোনার পাত বা সোনালি মুখোশ ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া যায়

কিন্তু সোনা কীভাবে টাকার রূপ পেল?

সোনার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে যখন এটি মুদ্রার সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমান তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলের প্রাচীন রাজ্য লিডিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিকে ইলেকট্রাম প্রাকৃতিক সোনা-রুপার মিশ্র ধাতু দিয়ে মুদ্রা তৈরি করা শুরু হয়। পরে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে খাঁটি সোনার মুদ্রা তৈরি হয়।

লিডিয়ার রাজা ক্রোয়েসাসের নামের সঙ্গে যুক্ত ‘ক্রোয়েসিড’ সোনার মুদ্রা এতটাই বিখ্যাত হয়ে ওঠে যে পরবর্তীকালে ক্রোয়েসাস নামটিই বিপুল সম্পদের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়ায়। তার মুদ্রাব্যবস্থা পারস্য ও পরে ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের অন্য অংশেও প্রভাব ফেলেছিল।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে সোনা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

দক্ষিণ এশিয়ায় সোনার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও আবেগপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতে সোনা বিয়ে, ধর্মীয় উৎসব, পারিবারিক সম্পদ ও ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের গবেষণা অনুযায়ী, ভারতীয় সোনার বাজারে বিয়ে ও উৎসব বড় চালিকাশক্তি এবং কনের গয়না বাজারের একটি বিশাল অংশ দখল করে। অনেক পরিবারের কাছে বিয়েতে পাওয়া সোনা নারীর নিজস্ব সম্পদ বা আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও বিয়ের গয়না, পারিবারিক সঞ্চয় ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সোনার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফলে সোনার দাম বাড়লেও এর প্রতি মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

বিজ্ঞাপন

 অনেক পরিবারের কাছে বিয়েতে পাওয়া সোনা নারীর নিজস্ব সম্পদ বা আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়

অনেক পরিবারের কাছে বিয়েতে পাওয়া সোনা নারীর নিজস্ব সম্পদ বা আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়

ইউরোপ থেকে আমেরিকা সোনার জন্য সংঘাতও হয়েছে

সোনার আকর্ষণ শুধু অলংকার বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমেরিকার প্রাক-কলম্বীয় সভ্যতাগুলোতেও সোনার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল। ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের কাছে আমেরিকার বিপুল সোনা ছিল লোভের অন্যতম কারণ। স্প্যানিশ বিজয়ের সময় সোনার সন্ধান ও লুণ্ঠন ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় তৈরি করে। অর্থাৎ সোনা যেখানে সম্পদের প্রতীক হয়েছে, সেখানেই এটি ক্ষমতা, দখল ও সংঘাতের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

সোনা কি আসলেই এত মূল্যবান?

এর একটি বড় কারণ হলো সোনার বিরলতা। পৃথিবীতে সোনার মজুত সীমিত। একই সঙ্গে এটি সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, অত্যন্ত নমনীয় এবং পাতলা করে টানা বা পেটানো যায়। তাই গয়না তৈরির পাশাপাশি শিল্প ও প্রযুক্তিতেও এর ব্যবহার সম্ভব। আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে সোনা ব্যবহার করা হয় কারণ এটি ভালো বৈদ্যুতিক পরিবাহী এবং ক্ষয় প্রতিরোধী। বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রযুক্তি খাতে সোনার ব্যবহার প্রায় ৮০ টন ছিল; এআই অবকাঠামোর প্রসারও প্রযুক্তিতে সোনার চাহিদাকে সমর্থন করছে।

আরও পড়ুন

গুগলের চাকরি-মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়ার মঞ্চ, উমাঙ্গা নারীদের অনুপ্রেরণা

স্বর্ণমান থেকে আধুনিক অর্থনীতি

একসময় বিশ্বের মুদ্রাব্যবস্থার সঙ্গেও সোনা সরাসরি যুক্ত ছিল। ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ ব্যবস্থায় বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মূল্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস ব্যবস্থায় মার্কিন ডলার সোনার সঙ্গে নির্দিষ্ট মূল্যে যুক্ত ছিল। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডলার-সোনা রূপান্তরযোগ্যতা বন্ধ করলে সেই ব্যবস্থা কার্যত শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সোনা অর্থনীতির কেন্দ্র থেকে সরে গেলেও মানুষের আস্থা থেকে হারায়নি।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের কাছে আমেরিকার বিপুল সোনা ছিল লোভের অন্যতম কারণ

ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের কাছে আমেরিকার বিপুল সোনা ছিল লোভের অন্যতম কারণ

আজও কেন সোনার প্রতি এত আগ্রহ?

বর্তমান বিশ্বে সোনা একসঙ্গে গয়না, বিনিয়োগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ এবং প্রযুক্তির কাঁচামাল। ২০২৫ সালে বিশ্বে মোট সোনার চাহিদা প্রথমবার ৫ হাজার টন ছাড়ায় এবং মোট চাহিদার মূল্য ৫৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। একই বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট ৮৬৩ টন সোনা কিনেছে।

২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিট সোনা কেনা বেড়ে ২৮৯ টনে পৌঁছায়। বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের মতে, রিজার্ভ বৈচিত্র্যকরণ এবং ভূরাজনৈতিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তার সময় সোনার ভূমিকা এর চাহিদাকে সমর্থন করছে।

তবে দাম যত বাড়ছে, গয়না হিসেবে সোনার পরিমাণগত চাহিদা ততটা বাড়ছে না। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক গয়না চাহিদা কমলেও সোনার উচ্চ মূল্যের কারণে মোট ব্যয়ের পরিমাণ শক্তিশালী ছিল। অর্থাৎ মানুষ কম পরিমাণ সোনা কিনলেও প্রতি ইউনিটে বেশি অর্থ খরচ করছে।

সোনার গল্প আসলে শুধু একটি ধাতুর গল্প নয়। এটি মানুষের সৌন্দর্যবোধ, ধর্ম, রাজনীতি, যুদ্ধ, বাণিজ্য, মুদ্রা, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার গল্প। হাজার হাজার বছর ধরে সভ্যতা বদলেছে, মুদ্রা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে কিন্তু সোনার ঝলক মানুষের চোখে এখনও একই রকম আকর্ষণ তৈরি করে। সম্ভবত এ কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বস্তু যদি একই সঙ্গে অলংকার, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতীক হয়ে থাকতে পারে, সেটি হলো সোনা।