নারায়ণগঞ্জে ৮ বছর ধরে অব্যবহৃত সিজেএম ভবন, নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ প্রকাশিত: ২:৩৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বহুতল বিশিষ্ট চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) ভবন। নারায়ণগঞ্জ শহরের শায়েস্ত খাঁ সড়কের সুবিশাল এ সরকারি ভবনটিতে একদিনের জন্যও যেন বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। ফলে অযত্ন-অবহেলা আর অকার্যকর অবস্থায় ফেলে রাখায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হতে বসেছে। যখনই এই ভবনটিতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারকি কার্যক্রম স্থানান্তর করার ব্যাপারে আলাপ আলোচনা শুরু হয় তখনই নানা প্রতিবন্ধতায় আটকে যায়। বিশেষ করে আইনজীবীরা কোনোভাবেই চান না যেন বিচারকি কার্যক্রম শুরু করা হোক। ‘আইনজীবীদের একই দিনে বিভিন্ন কোর্টে বিভিন্ন মামলা থাকে। নারায়ণগঞ্জে ফ্যাসিস্টদের টানাটানির কারণে সাধারণ মানুষজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই ক্ষতিগ্রস্তের হাত থেকে নারায়ণগঞ্জবাসী কীভাবে মুক্তি পাবে সেই চেষ্টা করছি। এখানে যেন সরকারি হাসপাতাল অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করা হয় সেই চেষ্টা করবো। এই সরকারের আমলে গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে বলে আশা করি।’ আইনজীবীদের যুক্তি- বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ শহর যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় শহরের শায়েস্ত খাঁ সড়কের বহুতল বিশিষ্ট চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) ভবনে বিচারকি কার্যক্রম শুরু করা হলে শহরের যানজট আরও অনেক বেশি বেড়ে যাবে। সেই সঙ্গেই আইনজীবীদেরও বিচারকি কার্যক্রম পরিচালনা করতে বেগ পোহাতে হবে। আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় শহরের শায়েস্তা খাঁ সড়কে একই ভবনে জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক কার্যক্রম চলতো। পরে চাঁদমারী এলাকায় তা স্থানান্তর করা হয়। সেখানে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভবন থাকলেও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ করা হয়নি। ‘আমরা কোনোভাবেই ওই ভবনে যেতে রাজি না। ওই ভবনে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম স্থানান্তর করা হলে শুধু আইনজীবীরা নয়, পুরো নারায়ণগঞ্জবাসীর ভোগান্তি হবে। তাই আমাদের দাবি, ওই ভবনটি অন্য কাজে লাগিয়ে সুবিধাজনক জায়গায় আবার নতুন করে সিজেএম ভবন নির্মাণ করা হোক।’ পরবর্তীতে সেখানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভবন ও জেলা আদালত ভবনের একটি অংশে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকি কার্যক্রম শুরু করা হয়। যা এখনও চলমান রয়েছে। এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে নিম্ন আদালতের কার্যক্রম বেগবান করার উদ্দেশ্যে ৬৪ জেলায় পৃথক ও নতুন চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়। ওই সময় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাশে জমি না পাওয়ায় শায়েস্তা খাঁ সড়কেই নির্মাণ করা হয় এই ভবন। ‘৬৪ জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন’ প্রকল্পের আওতায় ৮ তলার এ ভবনটি নির্মাণের দায়িত্ব পায় গণপূর্ত অধিদপ্তর। সেই সঙ্গে ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে ভবনটি নির্মাণকাজ শেষ করার পর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরও করে বাস্তবায়নকারী এ সংস্থাটি। কিন্তু পরবর্তীতে আইনজীবীরা আপত্তি জানালে এ ভবনে বিচার কার্যক্রম স্থানান্তর করা যায়নি। আইনজীবীরা ওই সময় শায়েস্তা খাঁ সড়কে নতুন ভবনে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম শুরু করা নিয়ে ঘোর বিরোধিতা করেন। তাদের ভাষ্যমতে, নতুন বহুতল ভবনটি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। দেশের প্রায় সব জেলাতেই জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত একই কম্পাউন্ডে বা কাছাকাছি থাকলেও নারায়ণগঞ্জে দুই ভবনের দূরত্ব বিচারিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাবে। আইনজীবীরা বলেন, আসামিদের ভোগান্তি ও ঝুঁকি অনেক সময় একই দিনে একজন আসামির জেলা জজ আদালত ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত উভয় স্থানেই হাজিরা থাকে। দুই কিলোমিটার দূরত্ব যাতায়াত করতে গিয়ে আসামিদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে। প্রতিদিন কয়েকশ’ আইনজীবী, পুলিশ সদস্য ও হাজারও বিচারপ্রার্থীকে দুই আদালতের মধ্যে বারবার যাতায়াত করতে হবে, যা অতিরিক্ত ভোগান্তি ও সময় অপচয়ের কারণ হবে। সেই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের জনপ্রতিনিধিরাও আইনজীবীদের পক্ষেই মতামত দেন। এদিকে কোটি কোটি টাকার এ ভবনটি অব্যবহৃত হিসেবে পড়ে থাকায় ভেতরের লাইট, ফ্যান ও অন্যান্য জিনিসপত্র অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে আদালতের কার্যক্রম শুরু না করা গেলে অন্য কোনো সরকারি সংস্থার কাজে ব্যবহারেরও দাবি জানান অনেকে। ভবনটিকে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের দাবিও উঠেছিল নাগরিক ও রাজনৈতিক মহল থেকে। করোনা মহামারির সময়ে নমুনা পরীক্ষার কাজে এ ভবনের একটি অংশ ব্যবহার করা হলেও পরে সেটি আবারও ফাঁকাই পড়ে থাকে। তবে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি ভবন ব্যবহার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সুশীল সমাজ ও স্থানীয় জনগণ। সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ এভাবে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে ভবনটি বিকল্প কোনো রাষ্ট্রীয় কাজে লাগানোর দাবি উঠেছে। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেটর সরকার হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা কোনোভাবেই ওই ভবনে যেতে রাজি না। ওই ভবনে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম স্থানান্তর করা হলে শুধু আইনজীবীরা নয়, পুরো নারায়ণগঞ্জবাসীর ভোগান্তি হবে। তাই আমাদের দাবি, ওই ভবনটি অন্য কাজে লাগিয়ে সুবিধাজনক জায়গায় আবার নতুন করে সিজেএম ভবন নির্মাণ করা হোক। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, এখানে কোটি কোটি টাকা খরচ জুডিসিয়াল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এখন বিভিন্ন কারণেই আইনজীবীরা এখানে আসতে চাচ্ছেন না। সেই সাথে শহরবাসীরও ভোগান্তি বাড়বে। সরকারের অনেকগুলো শাখা যারা বিভিন্ন জায়গা ভাড়া করে অফিস কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তাদেরকে এখানে নিয়ে আসা যেতে পারে। অথবা এখানে অত্যাধুনিক হাসপাতাল করে দিলে মানুষেরও উপকার হবে এবং জায়গারও অপচয় হবে না। আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, এখানে পুরো আদালত ভবন জজ কোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, জজদের বাসভবনসহ অনেকগুলো প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই সময় মেয়র এবং এমপির টানাটানিতে প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন আইনজীবীর যদি একদিনে জজ কোর্ট এবং ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে দুইটি মামলা থাকে তাহলে ওই সময় তার কি অবস্থা হবে। তিনি আরও বলেন, আইনজীবীদের একই দিনে বিভিন্ন কোর্টে বিভিন্ন মামলা থাকে। নারায়ণগঞ্জে ফ্যাসিস্টদের টানাটানির কারণে সাধারণ মানুষজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই ক্ষতিগ্রস্তের হাত থেকে নারায়ণগঞ্জবাসী কীভাবে মুক্তি পাবে সেই চেষ্টা করছি। এখানে যেন সরকারি হাসপাতাল অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করা হয় সেই চেষ্টা করবো। এই সরকারের আমলে গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে বলে আশা করি। Download PhotoCard SHARES জেলা/উপজেলা বিষয়: নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদনারায়ণগঞ্জে ৮ বছর ধরে অব্যবহৃত সিজেএম ভবন