মীনা : শুধু কার্টুন নয়, কার্টুনের অধিক প্রকাশিত: ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬ কিছু চরিত্র পর্দায় আসে, গল্প বলে, তারপর হারিয়ে যায়। কিছু চরিত্র মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়। আর খুব অল্প কিছু চরিত্র গল্পের সীমানা পেরিয়ে মানুষের সামাজিক চেতনার অংশ হয়ে ওঠে। মীনা সেই বিরল চরিত্রগুলোর একটি। বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে মীনা শুধু শৈশবের কার্টুন নয়। সে স্কুলে যাওয়ার অধিকার, ছেলেমেয়ের সমান যত্ন, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান, শিশুশ্রমকে প্রশ্ন করা এবং অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকার প্রতীক। মীনা শিশুদের সামনে বক্তৃতা দেয় না। সে তাদের মতো করে বাঁচে, প্রশ্ন করে, সমস্যায় পড়ে, ভুল থেকে শেখে এবং সমাধানের পথ খোঁজে। তার শক্তি সেখানেই। মীনার জন্ম কোনো সাধারণ বিনোদনমূলক কার্টুন হিসেবে হয়নি। ১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্য ছিল গভীর সামাজিক বাস্তবতা। দক্ষিণ এশীয় সরকারগুলো ১৯৯০-এর দশককে ‘Decade of the Girl Child’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ ১৯৯১ সালে মীনা কমিউনিকেশন ইনিশিয়েটিভ শুরু করে স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন প্রোগ্রাম হিসেবে। যার লক্ষ্য ছিল মেয়েদের বেঁচে থাকা, সুরক্ষা, বিকাশ ও অংশগ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করা সামাজিক ধারণা ও আচরণকে পরিবর্তন করা। মীনার সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ কারণ চরিত্রের সাংস্কৃতিক পরিচিতি। তাকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের মেয়ে হিসেবে তৈরি করা হয়নি। মীনাকে দক্ষিণ এশিয়ার বহু শিশুর পরিচিত সামাজিক বাস্তবতা, পরিবার, গ্রাম, স্কুল, ভাইবোন, প্রতিবেশী এবং দৈনন্দিন সমস্যার ভেতরে আনা হয়েছে। মীনা নামটিও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিচিত নাম। বাংলাদেশে মীনার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৩ সালে Count Your Chickens ছবির মাধ্যমে। এরপর ২৬টি টেলিভিশন এপিসোড, রেডিও অনুষ্ঠান, কমিকস, বই এবং নানা যোগাযোগমাধ্যমে সে শিশু ও পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। ইউনিসেফ-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের ৮১ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী মীনাকে চিনেছে। দক্ষিণ এশিয়ার আরও বহু দেশে স্থানীয় ভাষায় তার গল্প পৌঁছে গেছে। তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়েও মীনা আছে। তাই আজকের জিজ্ঞাসা মীনা হারিয়ে গেছে কিনা, তা নয়। জিজ্ঞাসা হলো, বদলে যাওয়া শিশুর পৃথিবীতে মীনাকে কীভাবে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তোলা যায়। কারণ শিশুর পৃথিবী বদলে গেছে। যে শিশু একসময় নির্দিষ্ট সময়ে টেলিভিশনের সামনে বসে মীনার গল্প দেখত, আজ তার মনোযোগ একই সঙ্গে মুঠোফোন, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট ভিডিও, খেলাধুলার নানা পর্দা এবং অসংখ্য নতুন বিনোদনের দিকে ছড়িয়ে আছে। ফলে মীনার সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন গল্প তৈরি করা নয়, নতুন সময়ের ভাষায় গল্প বলাও জরুরি। মীনার জন্মও সাধারণ বিনোদনমূলক কার্টুন তৈরির উদ্যোগ হিসেবে হয়নি। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ায় মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্য ছিল গভীর সামাজিক বাস্তবতা। সেই প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ ১৯৯১ সালে মীনা যোগাযোগ উদ্যোগ শুরু করে। লক্ষ্য ছিল মেয়েশিশুর বেঁচে থাকা, সুরক্ষা, বিকাশ, শিক্ষা ও অংশগ্রহণের পথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধাগুলোকে প্রশ্ন করা এবং যোগাযোগের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা। মীনার পরিচয় তৈরিতেও শিশুদের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চার দেশের শিল্পীরা দক্ষিণ এশীয় মেয়েদের নানা রূপ আঁকেন এবং প্রথমে ছবি তৈরির আগে ১০ হাজারের বেশি শিশুর মতামত নেওয়া হয়। মীনা কেমন দেখতে হবে, কী ধরনের পোশাক পরবে, তার জীবনযাপন ও স্বভাব কেমন হবে-এসব বিষয়েও শিশুদের মতামত শোনা হয়েছে। মীনার গল্পের শক্তি তার পরিচিত পৃথিবী-পরিবার, স্কুল, প্রতিবেশী, ভাইবোন, বন্ধুত্ব, বৈষম্য, ভুল ধারণা আর প্রতিদিনের ছোট ছোট দ্বন্দ্ব। তার সঙ্গে থাকে ভাই রাজু ও পোষা টিয়া মিঠু। ফলে কঠিন সামাজিক বিষয়ও শিশুদের কাছে দূরের কোনো শিক্ষা হয়ে ওঠেনি, গল্পের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। বিনোদনের ভেতর দিয়ে শেখানো এবং আচরণে পরিবর্তনের পথ তৈরি করার এই পদ্ধতিই মীনাকে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরিতে সাহায্য করেছে। মীনার সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ কারণ চরিত্রের সাংস্কৃতিক পরিচিতি। তাকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের মেয়ে হিসেবে তৈরি করা হয়নি। মীনাকে দক্ষিণ এশিয়ার বহু শিশুর পরিচিত সামাজিক বাস্তবতা, পরিবার, গ্রাম, স্কুল, ভাইবোন, প্রতিবেশী এবং দৈনন্দিন সমস্যার ভেতরে আনা হয়েছে। মীনা নামটিও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিচিত নাম। মীনা প্রজন্মকে অতিক্রম করেছে। ১৯৯০-এর দশকের শিশুরা পরে বাবা-মা হয়েছে, আর তাদের অনেকেই সন্তানদের সঙ্গে মীনার গল্প নিয়ে কথা বলেছে। এই প্রজন্মান্তরের স্মৃতি মীনার বড় সম্পদ। ২০০৫ সালে চালু হওয়া মীনা মিডিয়া পুরস্কারও দেখায়, মীনা দীর্ঘদিন ধরে শিশু অধিকার ও গণমাধ্যমের বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। তবে সময়ের সঙ্গে মীনার দর্শক কমে যাওয়ার ঘটনা মীনার প্রতি মানুষের আগ্রহ হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি জটিল। ইউনিসেফের মূল্যায়ন এবং ২০২৬-২৭ সালের বর্তমান পরিকল্পনা-দুই ক্ষেত্রেই নতুন অনুষ্ঠান তৈরির সীমিত ধারাবাহিকতা এবং শিশুদের দ্রুত বদলে যাওয়া গণমাধ্যমের পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১১ সালের পর নতুন পর্ব তৈরির ধারাবাহিকতা কমে গেছে। একই সময়ে অনেক স্কুল ও এলাকায় মীনা-ভিত্তিক কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। নির্দিষ্ট টেলিভিশন সম্প্রচারের সময় না থাকায় নিয়মিত দর্শকগোষ্ঠীও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মুঠোফোন ও অনলাইন মাধ্যম দ্রুত শিশুদের বিনোদন ও তথ্য পাওয়ার প্রধান জায়গার অংশ হয়ে উঠেছে। নতুন চ্যালেঞ্জ যতখানি মীনার তারচেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে ধারাবাহিক নতুন গল্প তৈরি এবং বদলে যাওয়া গণমাধ্যমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জায়গায়। মীনা অনলাইন জগৎ থেকেও হারিয়ে যায়নি। পুরোনো পর্বগুলো এখনো বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা যায়। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো-মীনা কম দেখা যেতে পারে, কিন্তু মীনা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। এই অবস্থান ২০২৬ সালের ইউনিসেফ বাংলাদেশের পরিকল্পনাতেও স্পষ্ট। সেখানে মীনাকে এখনো পরিচিত ও বিশ্বস্ত চরিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি ও পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষা, শিশুর সুরক্ষা, ছেলে-মেয়ের সমতা এবং কিশোর-কিশোরীদের সুস্থতার মতো বিষয়ে মানুষের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নতুন অ্যানিমেশন, ইন্টার্যাকটিভ রেডিও অনুষ্ঠান, ছবি-গল্প, পুতুলনাট্য এবং স্থানীয় পর্যায়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে মীনা উদ্যোগকে নতুন করে শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও আছে। মীনার আগামী অবশ্যই নতুন গল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। কারণ পুরোনো সমস্যাগুলো এখনো আছে-শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, ছেলেমেয়ের বৈষম্য, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও শিশুর সুরক্ষা। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। আর ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ গত এক মাসে কোনো না কোনো কঠোর শাসনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। পুরোনো সমস্যার সঙ্গে এসেছে নতুন বাস্তবতাও-অনলাইনে হয়রানি, শিশুর অনলাইন নিরাপত্তা, ভুল তথ্য, মানসিক সুস্থতা, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ প্রস্তুতি, মাসিক স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী শিশুর অন্তর্ভুক্তি, পজিটিভ প্যারেন্টিং, কিশোর-কিশোরীদের অংশগ্রহণ এবং আর্থিক জ্ঞান। ২০১৯ সালের মূল্যায়নে শিশুরাই জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ রক্ষা, যৌন হয়রানি, মাদকাসক্তি এবং মুঠোফোনের অপব্যবহারের মতো বিষয় নিয়ে নতুন মীনা গল্পের কথা বলেছিল। তাই মীনাকে বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই, সময়ের প্রয়োজনে মীনার গল্পের পৃথিবীকে বদলাতে হবে। মীনার নতুন যুগে গল্পকে নানা মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল কার্যকর হতে পারে। টেলিভিশনের পূর্ণাঙ্গ গল্প থেকে তৈরি হতে পারে ছোট ভিডিও, ছবি-গল্প, রেডিও কথোপকথন, শ্রেণিকক্ষের আলোচনা কিংবা মা-বাবা ও সন্তানের যৌথ কাজ। টেলিভিশন থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রেডিও ও স্থানীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান। মীনার দর্শক যেখানে আছে, মীনাকেও সেখানে থাকতে হবে। স্কুলকে এই পুনর্গঠনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা জরুরি। মীনা দিবসকে শুধু বছরের একটি দিনের অনুষ্ঠান না করে সারা বছরের শেখার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। গল্পের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের আলোচনা, গল্প বলা, বিতর্ক, ছবি আঁকা, শিক্ষকের সহায়িকা এবং অভিভাবকের অংশগ্রহণ যুক্ত হলে মীনা দেখা কোনো বিচ্ছিন্ন অনুষ্ঠান থাকবে না। মীনা নিয়ে কথা বলা ও কাজ করা হয়ে উঠবে শেখার অংশ। শিশুদের শুধু দর্শক হিসেবে না দেখে গল্প তৈরির অংশীদার করাও জরুরি। ‘পরের গল্পে মীনা কী নিয়ে কথা বলবে?’-এই জিজ্ঞাসা স্কুল, শিশু ক্লাব, স্থানীয় সংগঠন ও অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে। অভিভাবকের মাধ্যমে অনলাইন থেকে শিশুরাই তখন নিজেদের অভিজ্ঞতা, প্রশ্ন ও সমস্যা বিবেচনা করে পরবর্তী গল্পের বিষয় তুলে আনবে। কেউ গল্পের পরামর্শ দেবে, কেউ ছবি আঁকবে, কেউ স্থানীয় প্রতিবেদন জানাবে, কেউ নিজের এলাকার গল্প বলবে। শিশুদের কথা শুনে মীনা আবার সেখানে ফিরে আসবে, যেখান থেকে তার শক্তির শুরু। মীনার গল্পে রাজুর ভূমিকাও নতুনভাবে ভাবতে হবে। ছেলেমেয়ের সমতা শুধু মেয়েদের বিষয় নয়, এটা ছেলে ও মেয়ের যৌথ সামাজিক শিক্ষা। রাজু হতে পারে সমতার সহযাত্রী। মীনা প্রশ্ন করবে, রাজু পাশে দাঁড়াবে, কখনো রাজুই প্রশ্ন করবে, মীনা তার সঙ্গে উত্তর খুঁজবে। তখন দুজনেই হয়ে উঠবে পরিবর্তনের অংশীদার। বাংলাদেশের বাস্তবতায় মীনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ের গল্পসঙ্গী হিসেবেও ভাবা জরুরি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা, পানি, স্বাস্থ্য ও ভিটেমাটি হারানো শিশুদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। মীনা দুর্যোগের প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা, নিরাপদ আচরণ, প্রকৃতি রক্ষা ও স্থানীয় মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলতে পারে। আজকের শিশুদের পৃথিবী আগের চেয়ে জটিল। তাদের হাতে বেশি তথ্য, বেশি প্রযুক্তি, বেশি সম্ভাবনা, একই সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও বেশি। তাদের এমন গল্পসঙ্গী প্রয়োজন, যে তাদের হয়ে কথা বলবে না, বরং নিজের কথা বলার সাহস তৈরি করবে। সেটা হবে আগামীর মীনা। একইভাবে ভুল তথ্যের সময়ে সে শেখাতে পারে কীভাবে কোনো খবর বিশ্বাস করার আগে যাচাই করতে হয়, অনলাইনে নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হয় এবং গুজব থেকে সত্য আলাদা করতে হয়। এসব বিষয়ও বক্তৃতা হিসেবে নয়, গল্পের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে আসবে। মীনার সাফল্য মাপার পদ্ধতি বদলাতে হবে। কতজন অনুষ্ঠান দেখেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ, তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন শিশু বার্তা মনে রাখছে, কতজন বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে তা নিয়ে কথা বলছে, কতজন শিক্ষক গল্প ব্যবহার করছেন এবং কতজন শিশুর আচরণে পরিবর্তন আসছে। অনলাইনে শুধু কতবার দেখা হয়েছে তা নয়, কতক্ষণ দেখা হয়েছে, আবার দেখা হয়েছে কিনা, শেয়ার করেছে কিনা এবং দর্শক কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে-এসবও বিবেচনায় নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত একটাই জিজ্ঞাসা-মীনা কি মানুষের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে পরিবর্তন আনছে? তিন দশকের বেশি সময় ধরে টিকে থাকার পেছনে মীনার সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রযুক্তি নয়, আস্থা। শিশুরা তাকে চেনে, বাবা-মায়েরা তাকে মনে রেখেছেন, শিক্ষকরা তাকে চেনেন এবং ইউনিসেফের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্ক তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে। কিন্তু আস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গেলেও দর্শক উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না। প্রতিটি নতুন প্রজন্মকে মীনাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। মীনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হবে তাকে অতীতে ফিরিয়ে নেওয়া। তার পরিচিত চেহারা, মূল মূল্যবোধ এবং মীনা-রাজু-মিঠুর সম্পর্ক থাকবে তবে গল্পের পৃথিবী বদলাতে হবে। একসময় সে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, আজ কিশোরীদের শিক্ষা, আত্মনির্ভরতা ও নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিয়ে কথা বলবে। আজকের শিশুদের পৃথিবী আগের চেয়ে জটিল। তাদের হাতে বেশি তথ্য, বেশি প্রযুক্তি, বেশি সম্ভাবনা, একই সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও বেশি। তাদের এমন গল্পসঙ্গী প্রয়োজন, যে তাদের হয়ে কথা বলবে না, বরং নিজের কথা বলার সাহস তৈরি করবে। সেটা হবে আগামীর মীনা। মীনার প্রথম যুগের বড় জিজ্ঞাসা ছিল-শিশুর অধিকার আছে কিনা? মীনার বর্তমান যুগের জিজ্ঞাসা হবে-শিশু নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলবে কীভাবে? এই পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তখনই সামাজিক শক্তিতে রূপ নেয়, যখন শিশু নিজেই সেই অধিকারকে নিজের ভাষায় বুঝতে, প্রশ্ন করতে এবং দাবি করতে পারে। মীনার ভবিষ্যৎ তাই পুরোনো চরিত্রকে নতুন পোশাকে ফিরিয়ে আনা নয়। এটা এমন যোগাযোগের পরিবেশ তৈরির সুযোগ, যেখানে মীনা শিশুদের সঙ্গে কথা বলে, শিশুদের কথা শোনে এবং তাদের নিজেদের কণ্ঠ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। তিন দশক ধরে মীনা বলে এসেছে-পরিবর্তন সম্ভব। এখন সময় এসেছে মীনা নতুন প্রশ্ন করুক। আর সেই প্রশ্নের উত্তর যেন শুধু বড়রা না দেয়। শিশুরাই যেন উত্তর দেয়। দীপু মাহমুদ : কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী dipumahmud1971@gmail.com Download PhotoCard SHARES মুক্তমত বিষয়: কার্টুনের অধিকমীনা : শুধু কার্টুন নয়