বিশ্ববাজারে বাড়ছে খাদ্যের দাম, চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ

প্রকাশিত: ৪:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি এবং এল নিনোর প্রভাবে খরার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খবর রয়টার্স

আগামী কয়েক মাসে খাদ্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে।

এর প্রভাব ২০২৭ সালজুড়েও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন নিম্ন আয়ের মানুষ। 

ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার ৬৩ বছর বয়সী পার্কিংকর্মী মুহাম্মদ ইয়াসিনের অভিজ্ঞতায় এরই মধ্যে সেই চাপ স্পষ্ট। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাকে খাবার খাওয়া কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

আগে ৭ থেকে ৮ হাজার রুপিয়ায় চাল, টেম্পে ও টোফু কিনতে পারতেন তিনি। এখন একই খাবারের জন্য খরচ হচ্ছে ১৫ হাজার রুপিয়া। চার সন্তানের বাবা ইয়াসিনের সাপ্তাহিক আয় ২ লাখ থেকে ৩ লাখ রুপিয়া। 

বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।

কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে গমের চালান ব্যাহত হচ্ছে। লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকিতে জাহাজ চলাচলের পথ দীর্ঘ হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও সার সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে এল নিনোর প্রভাবে খরার আশঙ্কা যুক্ত হওয়ায় শস্য উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। 

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, এসব কারণে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে।

চলতি বছরের শেষ দিকে এবং আগামী বছরের শুরুতে এর প্রভাব আরো তীব্র হতে পারে। এমনকি পুরো ২০২৭ সালজুড়েও পরিস্থিতির প্রভাব থাকতে পারে। 

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৫০টি দেশের মধ্যে ২২ শতাংশ দেশে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ।

এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক গত সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটিই সর্বোচ্চ অবস্থান।

চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। এসব দেশে চালের মজুত পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ছে।

দেশভেদেও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। ইন্দোনেশিয়ায় চালের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় আকারের একেকটি রুটির দাম জুলাই মাসের ৪ পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় ৫ মিসরীয় পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়ায় এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। আর উৎপাদন ঘাটতির কারণে ভারতে সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

ভারতের নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেন, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি এখন বাস্তবতা। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশও কঠিন হয়ে উঠেছে।

খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যয়ও ভূমিকা রাখছে। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে শস্য পরিবহনের অবকাঠামোয় হামলার কারণে গমের চালান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে গম সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণে কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকাস ওয়েলিরাং বলেন, পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশটির মুদ্রা রুপিয়ার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানির খরচ আরো বেড়েছে।

দেশটির গমকলগুলোর উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ছে। কে-প্লারের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় সেপ্টেম্বরে গমের চালান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমে ৪ লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশটির কয়েকটি গমকল পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

এদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পেছনে জ্বালানি ও সারের দামও ভূমিকা রাখছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠলেও পরে কিছুটা কমেছে। তবে দাম এখনো তুলনামূলক বেশি।

মিসরের রাজধানী কায়রোর একটি বেকারির ব্যবসায়ী সায়েদ আবদেল হামিদ মোহাম্মদ বলেন, শুধু ময়দার দাম বাড়েনি, রুটি তৈরির অন্যান্য উপকরণ ও উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। দক্ষ শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, পানি ও ইস্টের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক মাসে খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক চাহিদা আরো বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার যেসব দেশ স্থানীয়ভাবে ভালো ফসল উৎপাদিত হওয়ায় কিছুদিন ধরে বিশ্ববাজার থেকে আমদানি কমিয়ে রেখেছিল, তাদের আবার বাজারে ফিরতে হচ্ছে। এতে একসঙ্গে অনেক দেশের চাহিদা বাড়লে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হবে।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেক্সান্ডার কারাভাইতসেভ বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকেরা আবার বাজারে ফিরলে চাহিদার বড় একটি নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ তোরেরো বলেন, আগের মৌসুমগুলোর ভালো ফলন ও পর্যাপ্ত মজুত এত দিন বিশ্ববাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সেই সুরক্ষা এখন চাপের মুখে পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। এখন এসব চুক্তি নবায়ন করতে গিয়ে তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ব্যয় আরও বাড়ছে।

বর্তমানে সয়াবিন ও ভুট্টার মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও ভবিষ্যতে এসব পণ্যের সরবরাহ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদনের ওপর। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জৈব জ্বালানি তৈরিতে এসব ফসলের ব্যবহার বাড়ছে, যা দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হতে পারে।

দক্ষিণ গোলার্ধে গমের ভালো ফলনের প্রত্যাশা থাকলেও অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো প্রধান রপ্তানিকারক দেশে উৎপাদন কমে গেলে বিশ্ববাজারে গমের দাম আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কারাভাইতসেভ।

খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতা আরো কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য সরবরাহকারী দেশগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে সংকট আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে খাদ্য মূল্যস্ফীতি শুধু বাড়বেই না, অনেক দেশের সরকারের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।