ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অযোগ্যরা যেভাবে যোগ্যদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে

প্রকাশিত: ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
ডিজিটাল যুগে মানুষ আর বক্তার জ্ঞান, জ্ঞানের সূত্র কিংবা তাঁর পদ্ধতি সম্পর্কে আগের মতো প্রশ্ন করা হয় না; বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—তাঁর অনুসারী কতজন? তাঁর কণ্ঠস্বর কি আকর্ষণীয়? তিনি কি প্রচলিত ধারণা ভেঙে দর্শকদের হাসাতে পারেন?

অনেক মানুষ এখন এমন ব্যক্তিদের হাতে নিজেদের দ্বিনের জ্ঞান তুলে দিচ্ছে, যারা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে বেশি দক্ষ। তারা আকিদা নিয়ে কথা বলা শিল্পীকে অনুসরণ করে, বিয়ে ও তালাকের ফতোয়া দেওয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তির কথা শোনে, এমনকি রোজার ‘আধ্যাত্মিকতা’ নিয়ে কথা বলা গায়কের বক্তব্যও গ্রহণ করে!

আমরা যেন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে কৌশলী কথাবার্তার মাধ্যমে দ্বিন ব্যাখ্যা করার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে।

এখানে দুঃসাহসের সঙ্গে অজ্ঞতা মিশে যাচ্ছে, প্রতারণা ইজতিহাদের পোশাক পরছে, আর প্রকৃত জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞতার পরিবর্তে মানুষের কণ্ঠস্বর, বাগ্মিতা কিংবা গণমাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

চায়ের দোকান থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম : সবাই সবজান্তা

সাহাবি ও তাবেঈদের জীবনে দেখা যায়, তাঁরা ফতোয়া দেওয়াকে অত্যন্ত ভয় করতেন। আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলা (রহ.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ১২০ জন সাহাবিকে পেয়েছি। তাঁদের কাউকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি চাইতেন, তাঁর কোনো ভাই যেন সেই প্রশ্নের জবাব দিয়ে তাঁকে দায়মুক্ত করেন।

(আদ-দারিমি, হাদিস : ১৩৮) 

তাঁরা আল্লাহর দ্বিন সম্পর্কে জ্ঞান ছাড়া একটি কথাও বলতে ভয় পেতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, দ্বিন সম্পর্কে কথা বলা আল্লাহর সামনে জবাবদিহির বিষয়—মানুষের কাছে খ্যাতি অর্জনের মাধ্যম নয়। কিন্তু আজ গণমাধ্যমের মঞ্চে এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখা যায়, যাঁরা দাবি করেন—হিজাব নাকি নিছক সামাজিক রীতি, মদ্যপান নাকি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর শরিয়তের নির্ধারিত শাস্তিগুলো নাকি ইসলামের অংশই নয়!

এটি জ্ঞানভিত্তিক সাহস নয়; বরং আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে দুঃসাহস। এমন দুঃসাহস মানুষের বিবেকের আগেই তার হৃদয়কে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৩৬) 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম : চালাকির নতুন মঞ্চ

এখন আর এই প্রবণতা শুধু চায়ের দোকানের আড্ডায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং অ্যালগরিদম ও বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহায়তায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। কেউ মাত্র এক মিনিটের একটি ভিডিও তৈরি করে, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে কয়েকটি আকর্ষণীয় বাক্য বলে নিজেকে উপস্থাপন করলেই সে লাখ লাখ অনুসারীর ‘ডিজিটাল দাঈ’ হয়ে উঠতে পারে। অথচ বেদনাদায়ক বৈপরীত্য হলো, প্রকৃত আলেম—যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় বই, শিক্ষকদের সান্নিধ্য ও গবেষণায় ব্যয় করেছেন, তিনি অনেক সময় আড়ালেই থেকে যান। তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখান মূলত আন্তরিক জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা।

 

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়া দ্বিনের বিষয়ে কথা বলে, সে মিথ্যাবাদীর মতো—যদিও সে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা না বলে।’ (মাজমু আল-ফাতাওয়া : ১০/৪৪৯)
এখানে মূল শিক্ষা হলো ভালো নিয়ত অজ্ঞতাকে বৈধতা দেয় না, আর আবেগ ও উদ্দীপনা জ্ঞানের বিকল্প হতে পারে না।

এ ধরনের কৌশলী ও ভিত্তিহীন ফতোয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি হলো সাধারণ মানুষ তাদের ইবাদত ও দ্বিনি জীবন সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সত্য ও মিথ্যা, সঠিক ও ভুল তাদের কাছে গুলিয়ে যায়। এর কয়েকটি পরিণতি হলো—বিদআত ও অগ্রহণযোগ্য ফতোয়ার বিস্তার, আলেমদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা, মানুষের হৃদয়ে দ্বিনের মর্যাদা দুর্বল হয়ে পড়া।

এভাবেই একটি উম্মাহ চিন্তাগত বিভ্রান্তি, আকিদাগত অস্থিরতা ও জ্ঞানগত বিশৃঙ্খলায় আক্রান্ত হয়। ফলে অনভিজ্ঞ, বাড়াবাড়িতে লিপ্ত ও বিদ্রুপকারী ব্যক্তিদের দ্বারা সাধারণ মানুষ সহজেই প্রভাবিত হতে পারে।

আমাদের দায়িত্ব

আজ উম্মাহর প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব হলো বিষয়গুলোকে যথাযথ অবস্থানে ফিরিয়ে আনা। আল্লাহর দ্বিন কোনো ছোট ভিডিও থেকে কিংবা অজ্ঞাতপরিচয়ের কোনো বক্তার কাছ থেকে গ্রহণ করা উচিত নয়; বরং দ্বিনের জ্ঞান নিতে হবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও গভীর জ্ঞানসম্পন্ন আলেমদের কাছ থেকে, যাঁরা নবীদের রেখে যাওয়া জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উত্তরাধিকার বহন করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত : ৪৩)

মনে রাখবেন, কোনো আলেমের যোগ্যতা তাঁর অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, ওহির প্রতি আমানতদারি এবং সালাফে সালেহিনের বুঝ অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর যোগ্যতা মূল্যায়ন করতে হয়।