মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় নারীদের অবদান প্রকাশিত: ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২৬ ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু মহীয়সী নারীর সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা নিজেদের সম্পদ, মেধা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা বিস্তার এবং জনকল্যাণে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁদের কেউ প্রতিষ্ঠা করেছেন মাদ্রাসা, কেউ নির্মাণ করেছেন মসজিদ, আবার কেউ এতিমদের আশ্রয় ও শিক্ষার সুব্যবস্থা করেছেন। নিজেদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ, দেনমোহর কিংবা ব্যক্তিগত উপার্জনকে তাঁরা শুধু ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে ব্যয় করেননি; বরং মানুষের কল্যাণে এবং ইলমের প্রসারে ব্যয় করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ইসলাম নারীদের সম্পদের মালিকানা, উত্তরাধিকার লাভ এবং নিজ সম্পদ ব্যবহারের স্বতন্ত্র অধিকার দিয়েছে। একজন নারী তাঁর বাবার সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকার পান, স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহর লাভ করেন এবং বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের মালিক হন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্তে স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তায়। ফলে নারীর নিজস্ব সম্পদ থাকলে তা দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন, ব্যবসা করতে পারেন কিংবা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারেন। যুগে যুগে মুসলিম সমাজের বহু নারী এই অধিকারকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মানবকল্যাণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের অবদান শুধু অর্থদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, জ্ঞানচর্চা এবং স্থায়ী জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁরা ছিলেন অগ্রগামী। বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর উইলে তাঁর স্ত্রীর প্রাপ্য অনাদায়ী হাতখরচের অর্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরিমাণটি ছিল ৩০০ দিনার। তৎকালীন মিসরের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই অর্থের মূল্য ছিল যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। এ ঘটনা থেকে মধ্যযুগের মুসলিম সমাজে নারীর আর্থিক অধিকার ও সম্পদের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এসব সম্পদ কীভাবে সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত হতো, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মুসলিম ইতিহাসের বহু মহীয়সী নারীর জীবন ও কর্মে। ফাতিমা আল-ফিহরি : জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে যার অবদান অনস্বীকার্য মুসলিম ইতিহাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় নারীদের অবদানের কথা বলতে গেলে প্রথমেই স্মরণ করতে হয় ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ আল-ফিহরি (রহ.)-এর নাম। তিনি ছিলেন জ্ঞানানুরাগী, ধর্মপরায়ণ এবং জনকল্যাণে নিবেদিত এক মহীয়সী নারী। তাঁর বাবা মুহাম্মদ আল-ফিহরি ছিলেন একজন বিত্তশালী ব্যবসায়ী। পরিবারের বসতি ছিল মরক্কোর ফাস নগরে। বাবার মৃত্যুর পর ফাতিমা ও তাঁর বোন মারিয়াম উত্তরাধিকারসূত্রে উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হন। তাঁরা সেই সম্পদ নিজেদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের পাশাপাশি ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন। ফাতিমা আল-ফিহরি ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রসার এবং মানুষের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ থেকে জমি কিনে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়, নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করতেন, যাতে তাঁর সম্পদ বৈধভাবে ব্যয় হয় এবং প্রতিষ্ঠানের নির্মাণে হারাম অর্থের সংমিশ্রণ না ঘটে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আল-কারাউইয়িন মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র পরবর্তী সময়ে ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মরক্কোর ফাস নগরে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, ফিকহ, হাদিস, ভাষা ও অন্যান্য জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফাতিমার এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, তিনি নিজের সম্পদকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় করেছিলেন, যার সুফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ ভোগ করেছে। তাঁর জীবন মুসলিম নারীদের জ্ঞানচর্চা, দূরদর্শিতা ও জনকল্যাণে আত্মনিয়োগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর বোন মারিয়ামও জনকল্যাণমূলক কাজে পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি ফাস নগরে জামেউল আন্দালুস নামে পরিচিত একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। এভাবে দুই বোন নিজেদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদকে ধর্মীয় ও সামাজিক কল্যাণে কাজে লাগিয়ে মুসলিম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। উম্মে হুসাইন : এতিমদের আশ্রয় ও শিক্ষার ব্যবস্থা মক্কার প্রধান বিচারপতি শায়খ শিহাবুদ্দিন তাবারি (রহ.)-এর কন্যা উম্মে হুসাইনও ছিলেন জ্ঞানী ও ধর্মপরায়ণ নারী। ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁকে মুহাদ্দিসা ও ফকিহা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে কাজ করার আগ্রহও ছিল তাঁর প্রবল। তিনি মক্কায় একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে এতিম শিশুরা আশ্রয়, খাবার ও শিক্ষার সুযোগ পেতে পারত। এতিমদের জীবনকে নিরাপদ ও সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম যেন দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সে ব্যবস্থাও করেছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি মক্কা ও মক্কার বাইরের বিভিন্ন সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে দেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ওয়াক্ফের মাধ্যমে সম্পদের আয় জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার যে ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন, তা ছিল দূরদর্শী উদ্যোগ। কারণ, এর ফলে ব্যক্তির মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান মানুষের উপকারে আসার সুযোগ পায়। রাজপরিবারের নারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা মুসলিম ইতিহাসে শুধু সাধারণ বিত্তশালী পরিবার নয়, রাজপরিবারের নারীরাও শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের অনেকেই নিজেদের সম্পদ ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার এবং ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। মিসরের সুলতান নাসির মুহাম্মদ ইবনু কালাউনের কন্যার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাতুল হিজাজিয়্যাহ এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ঐতিহাসিক বিবরণে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের কথা পাওয়া যায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়ানোর জন্য বিপুলসংখ্যক বই সংরক্ষণ ও ওয়াক্ফ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি শুধু পাঠদানের স্থান হিসেবেই নয়, বরং জ্ঞান অর্জন ও বইপত্র অধ্যয়নের কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খলিফা নাসির লিদিনিল্লাহর মা জামরাদও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য স্মরণীয়। তুর্কি বংশোদ্ভূত এই নারী একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। একইভাবে বাদশাহ আশরাফ মুসার স্ত্রী তুরকান বিনতে মালিক সিরিয়ার মাকামে জাবালে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি তাঁর নামেই পরিচিতি লাভ করে। মৃত্যুর পর তাঁকে সেই মাদ্রাসার প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)-এর বোন রাবিয়া খাতুনও ছিলেন জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য পরিচিত। তিনিও সিরিয়ায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। উসমানি সাম্রাজ্যে নারীদের শিক্ষায় বিনিয়োগ উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় নারীদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুলতান মুরাদ শাহের মা ইস্কাদার শহরে একটি বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন উপলক্ষে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আলেমদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অনুষ্ঠানে আগত আলেমদের প্রত্যেককে এক হাজার দিনার করে উপহার দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্য থেকে ৫০ জন আলেমকে মাদ্রাসাটির শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনা থেকে তৎকালীন মুসলিম সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং আলেমদের সম্মান জানানোর গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একজন নারী শুধু একটি ভবন নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সেখানে পাঠদান ও জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। তাজবিদ ও কিরাত শিক্ষায় নারীর অবদান দামেস্কের উম্মে সালেহ নামের এক নারীও শিক্ষাবিস্তারে স্বতন্ত্র ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ মাদ্রাসার কথা পাওয়া যায়, যেখানে মূলত পবিত্র কোরআনের তাজবিদ ও কিরাত বিষয়ে পাঠদান করা হতো। কোরআন সঠিকভাবে তিলাওয়াত করা, উচ্চারণের নিয়ম শেখা এবং বিভিন্ন কিরাতের জ্ঞান সংরক্ষণ করা ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি কোরআন শিক্ষার প্রসারে অবদান রেখেছিলেন। বাংলাদেশেও রয়েছে নারীদের অবদানের ঐতিহাসিক নিদর্শন নারীদের ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার এই ঐতিহ্য শুধু আরব, মিসর, সিরিয়া কিংবা উত্তর আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলার ইতিহাসেও নারীদের উদ্যোগে মসজিদ প্রতিষ্ঠার নজির পাওয়া যায়। ঢাকার নারিন্দা অঞ্চলে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি ৮৬১ হিজরিতে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের নিদর্শন প্রমাণ করে, বাংলার মুসলিম সমাজেও নারীরা ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ ও জনকল্যাণমূলক কাজে অবদান রেখেছেন। বর্তমানে নারীদের করণীয় মুসলিম ইতিহাসের এসব ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে—সম্পদ শুধু ব্যক্তিগত ভোগের উপকরণ নয়; সঠিক নিয়ত ও পরিকল্পনার মাধ্যমে তা মানুষের কল্যাণের স্থায়ী মাধ্যমেও পরিণত হতে পারে। ফাতিমা আল-ফিহরির মতো নারীরা নিজেদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। উম্মে হুসাইনের মতো নারীরা এতিমদের আশ্রয় ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। অন্যরা মসজিদ, গ্রন্থাগার এবং বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। আজকের সমাজেও এই ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সামর্থ্যবান নারীরা চাইলে শিক্ষাবৃত্তি চালু করতে পারেন, এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য সহায়তা তহবিল গঠন করতে পারেন, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কিংবা মসজিদ-মাদ্রাসা ও অন্যান্য কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পদ সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে। মহান আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন। Download PhotoCard SHARES ইসলাম বিষয়: মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় নারীদের অবদান
ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু মহীয়সী নারীর সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা নিজেদের সম্পদ, মেধা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা বিস্তার এবং জনকল্যাণে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁদের কেউ প্রতিষ্ঠা করেছেন মাদ্রাসা, কেউ নির্মাণ করেছেন মসজিদ, আবার কেউ এতিমদের আশ্রয় ও শিক্ষার সুব্যবস্থা করেছেন।
নিজেদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ, দেনমোহর কিংবা ব্যক্তিগত উপার্জনকে তাঁরা শুধু ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে ব্যয় করেননি; বরং মানুষের কল্যাণে এবং ইলমের প্রসারে ব্যয় করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ইসলাম নারীদের সম্পদের মালিকানা, উত্তরাধিকার লাভ এবং নিজ সম্পদ ব্যবহারের স্বতন্ত্র অধিকার দিয়েছে। একজন নারী তাঁর বাবার সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকার পান, স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহর লাভ করেন এবং বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের মালিক হন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্তে স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তায়।
ফলে নারীর নিজস্ব সম্পদ থাকলে তা দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন, ব্যবসা করতে পারেন কিংবা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারেন। যুগে যুগে মুসলিম সমাজের বহু নারী এই অধিকারকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মানবকল্যাণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের অবদান শুধু অর্থদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, জ্ঞানচর্চা এবং স্থায়ী জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁরা ছিলেন অগ্রগামী। বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর উইলে তাঁর স্ত্রীর প্রাপ্য অনাদায়ী হাতখরচের অর্থের উল্লেখ পাওয়া যায়।
পরিমাণটি ছিল ৩০০ দিনার। তৎকালীন মিসরের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই অর্থের মূল্য ছিল যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। এ ঘটনা থেকে মধ্যযুগের মুসলিম সমাজে নারীর আর্থিক অধিকার ও সম্পদের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এসব সম্পদ কীভাবে সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত হতো, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মুসলিম ইতিহাসের বহু মহীয়সী নারীর জীবন ও কর্মে। ফাতিমা আল-ফিহরি : জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে যার অবদান অনস্বীকার্য মুসলিম ইতিহাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় নারীদের অবদানের কথা বলতে গেলে প্রথমেই স্মরণ করতে হয় ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ আল-ফিহরি (রহ.)-এর নাম।
তিনি ছিলেন জ্ঞানানুরাগী, ধর্মপরায়ণ এবং জনকল্যাণে নিবেদিত এক মহীয়সী নারী। তাঁর বাবা মুহাম্মদ আল-ফিহরি ছিলেন একজন বিত্তশালী ব্যবসায়ী। পরিবারের বসতি ছিল মরক্কোর ফাস নগরে। বাবার মৃত্যুর পর ফাতিমা ও তাঁর বোন মারিয়াম উত্তরাধিকারসূত্রে উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হন। তাঁরা সেই সম্পদ নিজেদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের পাশাপাশি ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন। ফাতিমা আল-ফিহরি ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রসার এবং মানুষের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ থেকে জমি কিনে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়, নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করতেন, যাতে তাঁর সম্পদ বৈধভাবে ব্যয় হয় এবং প্রতিষ্ঠানের নির্মাণে হারাম অর্থের সংমিশ্রণ না ঘটে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আল-কারাউইয়িন মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র পরবর্তী সময়ে ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মরক্কোর ফাস নগরে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, ফিকহ, হাদিস, ভাষা ও অন্যান্য জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফাতিমার এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, তিনি নিজের সম্পদকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় করেছিলেন, যার সুফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ ভোগ করেছে। তাঁর জীবন মুসলিম নারীদের জ্ঞানচর্চা, দূরদর্শিতা ও জনকল্যাণে আত্মনিয়োগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর বোন মারিয়ামও জনকল্যাণমূলক কাজে পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি ফাস নগরে জামেউল আন্দালুস নামে পরিচিত একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। এভাবে দুই বোন নিজেদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদকে ধর্মীয় ও সামাজিক কল্যাণে কাজে লাগিয়ে মুসলিম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। উম্মে হুসাইন : এতিমদের আশ্রয় ও শিক্ষার ব্যবস্থা মক্কার প্রধান বিচারপতি শায়খ শিহাবুদ্দিন তাবারি (রহ.)-এর কন্যা উম্মে হুসাইনও ছিলেন জ্ঞানী ও ধর্মপরায়ণ নারী। ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁকে মুহাদ্দিসা ও ফকিহা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে কাজ করার আগ্রহও ছিল তাঁর প্রবল। তিনি মক্কায় একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে এতিম শিশুরা আশ্রয়, খাবার ও শিক্ষার সুযোগ পেতে পারত। এতিমদের জীবনকে নিরাপদ ও সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম যেন দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সে ব্যবস্থাও করেছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি মক্কা ও মক্কার বাইরের বিভিন্ন সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে দেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ওয়াক্ফের মাধ্যমে সম্পদের আয় জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার যে ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন, তা ছিল দূরদর্শী উদ্যোগ। কারণ, এর ফলে ব্যক্তির মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান মানুষের উপকারে আসার সুযোগ পায়। রাজপরিবারের নারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা মুসলিম ইতিহাসে শুধু সাধারণ বিত্তশালী পরিবার নয়, রাজপরিবারের নারীরাও শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের অনেকেই নিজেদের সম্পদ ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার এবং ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। মিসরের সুলতান নাসির মুহাম্মদ ইবনু কালাউনের কন্যার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাতুল হিজাজিয়্যাহ এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ঐতিহাসিক বিবরণে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের কথা পাওয়া যায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়ানোর জন্য বিপুলসংখ্যক বই সংরক্ষণ ও ওয়াক্ফ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি শুধু পাঠদানের স্থান হিসেবেই নয়, বরং জ্ঞান অর্জন ও বইপত্র অধ্যয়নের কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খলিফা নাসির লিদিনিল্লাহর মা জামরাদও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য স্মরণীয়। তুর্কি বংশোদ্ভূত এই নারী একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। একইভাবে বাদশাহ আশরাফ মুসার স্ত্রী তুরকান বিনতে মালিক সিরিয়ার মাকামে জাবালে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি তাঁর নামেই পরিচিতি লাভ করে। মৃত্যুর পর তাঁকে সেই মাদ্রাসার প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)-এর বোন রাবিয়া খাতুনও ছিলেন জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য পরিচিত। তিনিও সিরিয়ায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। উসমানি সাম্রাজ্যে নারীদের শিক্ষায় বিনিয়োগ উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় নারীদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুলতান মুরাদ শাহের মা ইস্কাদার শহরে একটি বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন উপলক্ষে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আলেমদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অনুষ্ঠানে আগত আলেমদের প্রত্যেককে এক হাজার দিনার করে উপহার দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্য থেকে ৫০ জন আলেমকে মাদ্রাসাটির শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনা থেকে তৎকালীন মুসলিম সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং আলেমদের সম্মান জানানোর গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একজন নারী শুধু একটি ভবন নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সেখানে পাঠদান ও জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। তাজবিদ ও কিরাত শিক্ষায় নারীর অবদান দামেস্কের উম্মে সালেহ নামের এক নারীও শিক্ষাবিস্তারে স্বতন্ত্র ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ মাদ্রাসার কথা পাওয়া যায়, যেখানে মূলত পবিত্র কোরআনের তাজবিদ ও কিরাত বিষয়ে পাঠদান করা হতো। কোরআন সঠিকভাবে তিলাওয়াত করা, উচ্চারণের নিয়ম শেখা এবং বিভিন্ন কিরাতের জ্ঞান সংরক্ষণ করা ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি কোরআন শিক্ষার প্রসারে অবদান রেখেছিলেন। বাংলাদেশেও রয়েছে নারীদের অবদানের ঐতিহাসিক নিদর্শন নারীদের ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার এই ঐতিহ্য শুধু আরব, মিসর, সিরিয়া কিংবা উত্তর আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলার ইতিহাসেও নারীদের উদ্যোগে মসজিদ প্রতিষ্ঠার নজির পাওয়া যায়। ঢাকার নারিন্দা অঞ্চলে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি ৮৬১ হিজরিতে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের নিদর্শন প্রমাণ করে, বাংলার মুসলিম সমাজেও নারীরা ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ ও জনকল্যাণমূলক কাজে অবদান রেখেছেন। বর্তমানে নারীদের করণীয় মুসলিম ইতিহাসের এসব ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে—সম্পদ শুধু ব্যক্তিগত ভোগের উপকরণ নয়; সঠিক নিয়ত ও পরিকল্পনার মাধ্যমে তা মানুষের কল্যাণের স্থায়ী মাধ্যমেও পরিণত হতে পারে। ফাতিমা আল-ফিহরির মতো নারীরা নিজেদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। উম্মে হুসাইনের মতো নারীরা এতিমদের আশ্রয় ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। অন্যরা মসজিদ, গ্রন্থাগার এবং বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। আজকের সমাজেও এই ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সামর্থ্যবান নারীরা চাইলে শিক্ষাবৃত্তি চালু করতে পারেন, এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য সহায়তা তহবিল গঠন করতে পারেন, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কিংবা মসজিদ-মাদ্রাসা ও অন্যান্য কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পদ সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে। মহান আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন।