জামায়াত যেভাবে বেঁচে আছে প্রকাশিত: ২:৪৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২৪ স্বাধীনতার মাসে জামায়াতে ইসলামী ঢাকার এক পাঁচতারকা হোটেলে জমকালো ইফতার পার্টির আয়োজন করে। ৮ বছর পর গত ৩০ মার্চ ঢাকার প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এই আয়োজন করেছিল জামায়াত। এই ইফতার পার্টিতে স্থায়ী কমিটির দুই সদস্যসহ ১৮ জন বিএনপি নেতা যোগ দেন। এই ইফতার পার্টির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলটি তাদের অস্তিত্ব নতুন করে জানান দিল। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের দৃশ্যমান তৎপরতা কারও নজর এড়ায়নি। নির্বাচনের আগে থেকেই জামায়াত গুহা থেকে বের হতে শুরু করে। গত বছর জামায়াত দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্য সমাবেশ করে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে কর্মিসভার আদলে এই সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াত রাজনীতিতে নতুন করে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করে। নিবন্ধনহীন রাজনৈতিক দল জামায়াত দীর্ঘদিন পর মূলধারার রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন শুরু করে। ইদানীং জামায়াত বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা-বিবৃতিও দিচ্ছে। কদিন আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়ার মুক্তি এবং বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দলটি এক বিবৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সংগঠিত হওয়ার খবর আসছে। বুয়েটে শিবির এখন বেশ শক্তিশালী—এমন দাবি করছেন অনেকেই। শিবির ও হিজবুত তাহরীর প্ররোচণাতেই বুয়েটে ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবস্থান বলে অনেকে মনে করেন। উপজেলা নির্বাচনেও জামায়াত প্রার্থী দিচ্ছে বলেও জানা গেছে। প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা জামায়াতপন্থিরা নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। জেলায় জেলায় জামায়াতের সংগঠিত হওয়ার খবর এখন আর গোপন বিষয় নয়। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিএনপির অনেক নেতাই। রাজনীতির মাঠে এখন আলোচনার বিষয় ‘জামায়াত-বিএনপির কাছে আসার গল্প’। সব কিছু মিলিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এই রাজনৈতিক সংগঠনটির পুনর্জন্ম হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে ’৭১-এর পরাজিত রাজনৈতিক দল জামায়াত। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের টিকে থাকারই কথা ছিল না। ’৭১-এর অপকর্মের জন্য এ দলটির ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যতবার অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, ততবারই নানা কৌশলে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এবারও তাই। এবারের চিত্রটা বেশ আতঙ্কের। বাংলাদেশে একদিকে ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নীরব উত্থান ঘটেছে। অন্যদিকে জামায়াত নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। আমি মনে করি, দুটি ঘটনা এক সূত্রে গাঁথা। এটি বাংলাদেশের জন্য আগামীর সংকটের বার্তা দেয়। কিন্তু এটা কেন ঘটছে? ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সে সময় এটি ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য এবং সাহসী একটি সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্ম ছাড়া খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিল এই ঘোষণা। এই অবিশ্বাসের যৌক্তিক কারণ ছিল। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। এখান থেকে শুরু হয় বাংলাদেশের উল্টো চলা। শুরু হয় বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানো মিশন। জিয়া ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন শুরু করেন। তিনি দালাল আইন বাতিল করেন। রাজাকার, আলবদরদের জেল থেকে মুক্তি দেন। লন্ডনে বসে ‘পাকিস্তান মুক্তি আন্দোলনে’ নেতৃত্ব দেওয়া যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক বড় স্বপ্ন ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ। এ কারণেই ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু জিয়া সামরিক ফরমান বলে সংবিধানের এই বিধান বাতিল করেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় বসে সামরিক গোয়েন্দাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। বিএনপিতে তিনি রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসিত করেন। বহুল আলোচিত রাজাকার, মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজকে জিয়া প্রধানমন্ত্রী বানান। এখান থেকে শুরু। এই ধারা অব্যাহত থাকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। দীর্ঘ ২১ বছরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং যুদ্ধাপরাধীরা ফুলেফেঁপে উঠেছিল। ক্ষমতা কেন্দ্রে তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছিল। প্রশাসনে, বিচার বিভাগে, সশস্ত্র বাহিনীতে স্বাধীনতাবিরোধীদের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। সব জায়গায় তাদের প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে একাত্তরের পরে জামায়াত আবার মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে। যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘হালাল’ হয় জামায়াত। ’৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। জামায়াত সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন দেয়। স্বাধীনতার মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যে গণহত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত সরকারের হিস্যা হয়। এ সময় জামায়াত তার মুখোশ খুলে আসল চেহারা বের করে। যুদ্ধাপরাধের শিরোমণি পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে তারা দলের ‘আমির’ ঘোষণা করে। জামায়াতের এই ধৃষ্টতাকে চ্যালেঞ্জ জানায় মুক্ত বুদ্ধির সচেতন নাগরিকবৃন্দ। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে উত্তাল হয় গোটা দেশ। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে বিএনপি গোলাম আযমকে গ্রেপ্তারে বাধ্য হয়। ‘গণআদালতে’ বিচার হয় চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের। লাখো মানুষ এই বিচারে সংহতি জানায়। সরকার গণআদালতের রায়কে সম্মান জানিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু না করে আয়োজকদের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ জননী এবং বরেণ্য বুদ্ধিজীবী হলেন দেশদ্রোহী! আর আইনি মারপ্যাঁচে গোলাম আযম পেল নাগরিকত্ব। শহীদ জননী যে চেতনার মশাল জ্বালিয়েছিলেন, তা তরুণ প্রজন্মকে আলোকিত করে। এখান থেকেই যুদ্ধাপরাধী বিরোধী একটি জনমত তৈরি হয়। Download PhotoCard SHARES রাজনীতি বিষয়: ইসলামীজামায়াত