চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ে মৃত্যুর চেয়ে সুস্থতার হার বেশি

প্রকাশিত: ৪:৩৮ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২৪

বরেন্দ্র অঞ্চল ও পদ্মার চর থেকে শুরু করে বাসা-বাড়িতেও দেখা মিলে বিভিন্ন বিষধর সাপের। তবে এখন সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়িয়েছে চন্দ্রবোড়া সাপ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সাপের বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে পড়াতে আরও বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

সাপ গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চন্দ্রবোড়া সাপে কামড়ালে তার চিকিৎসা আছে এবং সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারলে মৃত্যু ঝুঁকি কমে আসে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। সাপে কাটার দুই ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে আসলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। এটি মোটেও দেশের সবচেয়ে বিষধর সাপ নয়। আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে এটা মারাত্মক প্রথম ৩০ সাপের মধ্যেও নেই। বরং এটির অবস্থান আমাদের দেশের গোখরা সাপের পরে। আর এই সাপের কামড়ে মৃত্যুর চেয়ে সুস্থতার হার বরং বেশি।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, গোখরা সাপ কামড়ালে চিকিৎসা না নিলে গড়ে ৮ ঘণ্টা পর, কেউটে সাপের ক্ষেত্রে গড়ে ১৮ ঘণ্টা পর ও চন্দ্রবোড়ার কামড়ের পর গড়ে ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পরে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। ওঁঝা বা কবিরাজের কাছে নিয়ে গেলে বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তারা এর বিষ বের করতে পারেন না। একমাত্র অ্যান্টিভেনম দিয়ে এর বিষ নিষ্ক্রিয় করা হয়ে থাকে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে অ্যান্টিভেনম। আর এটি পলিভেনম। যা ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে। সব সাপের জন্য এই পলিভেনম কাজ করছে। এর কার্যকারিতাও ৭০ শতাংশ। চন্দ্রবোড়া বা অন্য কোনো সাপ কামড় দিলে দুই ঘণ্টার মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করলে রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা শতভাগ।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে রামেক হাসপাতালে সাপে কাটা রোগী ভর্তি হয় মোট ২১৩ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৬৪ জন। মৃত্যুবরণ করেছেন ৪৯ জন। সুস্থতার হার ৭৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনের ২০ তারিখ পর্যন্ত মোট ৬৩ জন সাপে কাটা রোগী রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৪ জন। মারা গেছেন ৯ জন। সুস্থতার হার ৮৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে রাজশাহীতে রাসেলস ভাইপার কামড়ায় ৫০ জনকে। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৩ জন। সুস্থ হয়েছেন ৩৭ জন। সুস্থতার হার ৭৪ শতাংশ।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. শংকর কুমার বিশাস বলেন, আমাদের এখানে যে অ্যান্টিভেনম তা শুধু চন্দ্রবোড়া সাপের জন্য নয়। বিষধর সাপের জন্যই এই অ্যান্টিভেনম ব্যবহার হয়। হাসপাতালে বর্তমানে দুই হাজারেও বেশি ডোজ অ্যান্টিভেনম আছে। কিছুদিনের মধ্যে আরও অ্যান্টিভেনম চলে আসবে। প্রাথমিকভাবে সাপে কাটা রোগীদের দুই ঘণ্টার মধ্যে নিয়ে আসতে বলা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এর চিকিৎসা করলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়ছে। এর জন্য সচেতনতা প্রয়োজন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু শাহীন চন্দ্রবোড়া সাপ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, ৬০ থেকে ৭০-এর দশকে তানোর, গোদাগাড়ীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে এই সাপের আধিক্য থাকলেও ৮০ দশক থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর ২০১৩ সালে প্রথম রামেক হাসপাতালে এই সাপে কাটা রোগীর দেখা মেলে।

তিনি বলেন, চন্দ্রবোড়া সাপের বিষ হেমোটক্সিন প্রকৃতির। কামড়ের সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহের টিস্যুগুলো দ্রুত ধ্বংস হতে থাকে। কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। ক্ষতস্থানে পচন ধরে। প্রায় ৬০ ভাগ রোগী কিডনিতে সমস্যার কারণে মারা যান। তবে যত দ্রুত সম্ভব এই সাপে কাটার পরপরই অ্যান্টিভেনম নিতে হবে। যদি আমাদের এই অঞ্চলে সাপের ভ্যাকসিন তৈরি হতো তাহলে শতভাগ কাজ করত। মৃত্যুর হারও কমে আসতো।

রোগীদের বড় অংশ ধান ক্ষেতের মাঠে দংশনের শিকার জানিয়ে তিনি বলেন, চন্দ্রবোড়া সাপে কামড়ানো রোগী বাড়ছে। পরিসংখ্যানেই তা স্পষ্ট। ২০২২ সালে রাজশাহী মেডিকেল চন্দ্রবোড়া সাপে কামড়ানো ৩১ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ভর্তি হয়েছিল ৫০ জন।

তিনি আরও জানান, রাজশাহী মেডিকেল সবচেয়ে বেশি রোগী আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে।

বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ভেনম রিসার্চ সেন্টার আছে। তারা সাপের বিষ সংগ্রহ করে অ্যান্টিবডি বানাচ্ছে। তবে এজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশে যে অ্যান্টিভেনমগুলো পাওয়া যাচ্ছে তা ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে। একটি কোম্পানি অ্যান্টিভেনম আমদানি করে দেশে নিয়ে এসে তা বিক্রি করছে। দেশের ফার্মাসিটিক্যালসগুলো যদি এগিয়ে আসে তাহলে দেশেই বানানো সম্ভব। আর দেশে বানালে এর কার্যকারিতা আরও বেশি হবে। সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুহারও কমে আসবে।