দক্ষিণাঞ্চলে এবার তরমুজের বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা ৪০ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশিত: ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০২৫

বিকেল নামতেই তরমুজবোঝাই ট্রলার একের পর এক ভিড়তে শুরু করে মুশুরীকাঠি ঘাটে। তরমুজ নিতে তীরে অপেক্ষা করে শত শত ট্রাক। পাইকারি ক্রেতার সঙ্গে দরদামে কৃষকের বনিবনা হলে ট্রলারের গলুইতে নেমে আসেন শ্রমিক। কোনটিতে পাঁচজন, কোনটিতে ১০ জন। তার বেশিও দরকার পরে কোনো কোনো ট্রলারে। মুহূর্তে কথাবার্তা, গান, হাসি-ঠাট্টায় সরগরম হয়ে ওঠে চারপাশ।

পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার ফেরীঘাট থেকে আমখোলা ইউনিয়ন নদী ধরে হরিদেপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এমন চিত্রে চোখ আটকে যাবে। গ্রীষ্ম মৌসুমে এভাবেই থাকে বলে জানালেন মুশুরিকাঠির ঘাটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা।

‘তয় এই সিজনে মানসের আনাগোনা বেশি। এবার তো তরমুজের ব্যমালা (অধিক) ফলন হইছে। দুপুরের পর থেইকা তরমুজ লোড-আনলোড শুরু হয়। রাইত ৯টা-১০টা বাইজ্জা যায়।’ চায়ের কাপে চিনি দিতে দিতে বলেন তিনি।

গোলাম মোস্তফা আরও বলেন, ‘সিজনাল তরমুজ এহনো ওডে নাই। আগাম তরমুজ আইছে। গ্রেট ওয়ান, ফ্যামিলি, আনন্দ, লাকি, ড্রাগন আরও কি কি নাম কইলো চরের মানসে। অত নাম মনে রাখতে পারি না।’ তারপরই বলে ওঠেন, ‘তরমুজতো তরমুজই। তরমুজ আবার ড্রাগন হইবে কেন? দুনিয়ায় কিচ্ছু বাদ নাই সব জিনিসে হাইব্রিড।’

চা দোকানি মোস্তফার রোজগারও ভালো। তরমুজের মৌসুমে হাজার-বারোশ টাকা লাভ থাকে বলেও আলাপ করতে করতে জানান।

শুধু গলাচিপা নয় বরিশাল বিভাগের প্রায় সবগুলো জেলায় এভাবে গড়ে উঠেছে তরমুজের মোকাম। অনেকে ভালো দামের আশায় তরমুজ নিয়ে আসছেন বরিশাল পোর্ট রোড আড়তে। অনেকে দাদন শোধ করার জন্য বাধ্য হয়ে আসছেন।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চাষি জাকির হোসেন বলেন, পারিবারিকভাবেই আমাদের ব্যাবসা তরমুজ চাষ। পাঁচ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। কিছু দাদন ছিল বিধায় বরিশালে এসেছি। নয়তো ভোলা থেকে পটুয়াখালীর যে কোনো উপজেলায় গিয়া বিক্রি করে দিতাম। ওখানে ভালো পাইকার পাওয়া যায়। এখনো মৌসুমের তরমুজ তোলা শুরু হয়নি। আগাম জাতের তরমুজে বেশ দাম পাচ্ছি। ঝড়-বন্যা না হলে এবার লাভ হবে।

পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালাইয়া থেকে এসেছেন আরেক চাষি শাহ আলম। তিনি বলেন, গত বছর ঝড়-বন্যাছাড়াই তরমুজ গাছ মরে গিয়েছিল। এ বছর গাছ ভালো ছিল, ফলনও ভালো হয়েছে। ৮ হাজার পিস তরমুজ নিয়ে এসেছি। ১৬ থেকে ২৪ হাজার টাকা দামে বিক্রি করেছি। অর্থাৎ আকার অনুসারে প্রতি ১০০ পিস তরমুজ ১৬ থেকে ২৪ হাজার টাকা দামে বিক্রি করেছি।

৪০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৬ হাজার ২০৭ হেক্টর জমিতে চাষ বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশাল। ২০২৩-২৪ মৌসুমে বরিশাল বিভাগে আবাদ হয়েছিল ৪৮ হাজার ৪৭ হেক্টর জমি। চলতি মৌসুমে (২০২৪-২৫) চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ৫৫১ হেক্টর জমিতে। প্রতি হেক্টরে আবাদের হার নির্ণীত হয়েছে ১১২.৪৭ শতাংশ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা এস এম মাহবুব আলম বলেন, এখন যে তরমুজ বাজারে এসেছে এটা আগাম জাতের তরমুজ। মূল লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এই তরমুজের হিসাব আমরা ধরবো না। তবে আগাম এবং মৌসুমের তরমুজ ফলন ভালো হয়েছে। আমরা ধারণা করছি চলতি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজে ৪০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।

তিনি বলেন, তরমুজ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শস্য। খুব স্বল্প সময়ে তরমুজের মৌসুম শেষ হয়ে যায়। এমনকি খেত থেকে তোলার পরে বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। যদি তেমন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হতো তাহলে আরও বাণিজ্যিক সফলতা আসার সম্ভাবনা ছিল।