সুপ্রিম কোর্টে বাজেট বরাদ্দ-বিচারক নিয়োগ চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ প্রকাশিত: ৩:১০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬ সুপ্রিম কোর্টসহ বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত ও যুক্তিসঙ্গত বাজেট বরাদ্দ, জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার, ন্যায্য ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী। জনস্বার্থে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার রেজিস্টার্ড ডাকযোগে ও ই-মেইলে এই নোটিশ পাঠান। লিগ্যাল নোটিশে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিবাদী করা হয়েছে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিক ও আইনজীবী হিসেবে সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব তাদের রয়েছে এবং আদালতের কর্মকর্তা হিসেবে তারা সংবিধান লঙ্ঘন রোধেও শপথবদ্ধ। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা ছাড়া তা কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়। সুপ্রিম কোর্টের জন্য অপর্যাপ্ত বরাদ্দ আইনজীবীরা নোটিশে উল্লেখ করেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুপ্রিম কোর্টের জন্য মাত্র ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২৭০ কোটি টাকা। অথচ দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের তুলনায় এই বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য। নোটিশে মাননীয় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি সমগ্র বিচার বিভাগকে সবচেয়ে অবহেলিত খাত হিসেবে আখ্যায়িত করে জানান, সমগ্র বিচার বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ মাত্র ২২০০ কোটি টাকা। যেখানে শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জন্যই বরাদ্দ ২৫০০ কোটি টাকা এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪,০০০ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ, ১৭ কোটিরও বেশি নাগরিকের ন্যায়বিচারের দায়িত্বে থাকা সমগ্র বিচার বিভাগের বরাদ্দ একটি মাত্র সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের চেয়েও কম, যা আইনমন্ত্রীর নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই রাষ্ট্রের অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, ২২০০ কোটি টাকার বড় অংশই ব্যয় হবে আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে অধস্তন আদালতের বেতন-ভাতা, প্রশাসন, অবকাঠামো এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ভবন নির্মাণ, ই-জুডিশিয়ারি স্বয়ংক্রিয়করণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত সম্পদের ব্যাপ্তি, মামলাজট ও সাংবিধানিক গুরুত্বের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অবহেলার ইতিহাস বিচার বিভাগের প্রতি এই অবহেলা নতুন কোনো ঘটনা নয় উল্লেখ করে নোটিশে বলা হয়, গত দুই দশক ধরে জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে এবং কোনো কোনো বছর সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ শূন্যও ছিল। অথচ, উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে প্রায় ৩৭ লাখ মামলা বিচারাধীন। নোটিশে বলা হয়, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের বোঝা নয় বরং কোর্ট ফি, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক, প্রসেস ফি ও জরিমানার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হয়ে থাকে। তবে, নোটিশে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিচার বিভাগের প্রকৃত মোট রাজস্ব আয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট ও পৃথক সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না, যা নিজেই রাষ্ট্রের অমনোযোগিতার একটি প্রমাণ। এ বিষয়ে একটি পৃথক ও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশেরও দাবি জানানো হয়েছে নোটিশে। পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত চেম্বার, বসার ব্যবস্থা, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, ডিজিটাল ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং লাইব্রেরি সুবিধার তীব্র ঘাটতি রয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষও একই কারণে ভিড়, বিলম্ব ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভুগছেন বলে জানানো হয়। অপর্যাপ্ত বরাদ্দের সরাসরি ফলাফল হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী মামলাজট, বিচারক-মামলার অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনুপাত, আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব এবং মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব সৃষ্টি হচ্ছে বলে নোটিশে বলা হয়, যা বিচারপ্রার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে নোটিশে জানানো হয়, দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি মামলা বিচারাধীন, যা কেবল বিচারিক নয়, একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে জনগণের আস্থা কমছে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি-মামলা অনুপাত নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে প্রায় ৩১ হাজার ১২০টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন ছিল। বর্তমানে আপিল বিভাগে মাত্র ৬ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০৩ জন (৭৭ জন স্থায়ী ও ২৬ জন অতিরিক্ত) বিচারপতি কর্মরত। অর্থাৎ, প্রতিটি বিভাগে গড়ে প্রতি বিচারপতির বিপরীতে ৫০০০-এরও বেশি মামলার বোঝা রয়েছে, যা দ্রুত ও ন্যায্য বিচারের সাংবিধানিক নিশ্চয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে নোটিশে দাবি করা হয়। নোটিশে বলা হয়, রাষ্ট্র নিজেই গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন অধস্তন আদালতে বিচারপতির সংখ্যা প্রায় ২০০০ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৬০০০-এ উন্নীত করার সুপারিশ করেছে। কমিশন আপিল বিভাগে ন্যূনতম ৭ জন বিচারপতি নিশ্চিতকরণ এবং এজন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দেরও সুপারিশ করেছে। এমনকি বাংলাদেশে প্রতি প্রায় ৯৪৪৪৪ জনের বিপরীতে মাত্র ১ জন বিচারপতি রয়েছেন, যা প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম। তবে কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপারিশ জমা দিলেও এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেটের কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশ করা হয়নি বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে অপর্যাপ্ত বেঞ্চ নোটিশে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগে বাণিজ্যিক মামলা নিষ্পত্তির জন্য মাত্র ২টি বেঞ্চ কার্যকর রয়েছে, যার ফলে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা মূল্যমানের বাণিজ্যিক বিরোধ বছরের পর বছর অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে, আপিল বিভাগে ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতি থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৫ জন বিচারপতি কর্মরত। ফলে, একাধিক বেঞ্চ পরিচালনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং মামলার সংখ্যা ১৯৭২ সালের ৪০৫৬ থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৪২০০০-এ পৌঁছেছে। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরকৃত মামলার মাত্র ৩৫ শতাংশ এবং আপিল বিভাগে মাত্র ১৮ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে, যা প্রমাণ করে বর্তমান অবকাঠামোয় মামলাজট ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। আইনজীবীর সংখ্যা ও চাপ নোটিশ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ ভোটার তালিকায় ১১০৯৭ জন আইনজীবী নিবন্ধিত ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যা প্রকৃত সক্রিয় আইনজীবীর সংখ্যার একটি রক্ষণশীল হিসাব মাত্র। এত বিপুল সংখ্যক আইনজীবীকে অপ্রতুল অবকাঠামোর মধ্যেই তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নোটিশে বলা হয়, বিচারপ্রার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুপ্রিম কোর্টের করিডোরে ভিড়ের মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়; এজলাস সংকটের কারণে একই এজলাসে একাধিক বিচারককে পালাক্রমে বসতে হয়। ডিজিটাল মামলা সংরক্ষণাগারের অভাব রয়েছে। এমনকি বিচারিক কর্মকর্তাদের সাধারণ কার্যালয় সরঞ্জামের জন্যও আইন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করতে হয়। নোটিশে বলা হয়েছে, আইনমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, একজন বিচারক সাক্ষ্যগ্রহণের সময় কাগজ শেষ হয়ে গেলে প্রশাসনিক বরাদ্দের অপেক্ষায় বিচারকাজ মুলতবি রাখতে বাধ্য হন। নোটিশে বলা হয়, নোটিশ প্রাপকদের এই অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তা সংবিধানের ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ৩১ (আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার), ৩২ (জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার), ৩৫(৩) (দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার), ২২ (বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ), ৯৪ (সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা), ১১৬ এর ক (বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা), ৪৪ (মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অধিকার) এবং ২১ (সরকারি দায়িত্ব পালনের কর্তব্য) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নোটিশ সংশ্লিষ্টদের প্রতি অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পর্যাপ্ত ও যুক্তিসঙ্গত বাজেট বরাদ্দ; আইনজীবীদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ; মাননীয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে একটি যুক্তিসঙ্গত বাজেট কাঠামো প্রণয়ন; আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগ ও বেঞ্চ গঠন; মামলার পরিমাণ, নিষ্পত্তির হার ও দায়েরের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় বিচারপতি ও বেঞ্চের সংখ্যা নির্ধারণে একটি সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ; এবং বিচার বিভাগের প্রকৃত রাজস্ব আয়ের একটি পৃথক ও স্বচ্ছ বার্ষিক হিসাব প্রকাশের অনুরোধ জানানো হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার ৩ (তিন) দিনের মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা লিখিতভাবে জানানোর জন্যে বলা হয়েছে। অন্যথায় সংবিধানের ৭, ২১, ২২, ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(৩), ৪৪, ৯৪ ও ১১৬ক অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগে জনস্বার্থে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়েরের কথা নোটিশে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। Download PhotoCard SHARES আইন আদালত বিষয়: সুপ্রিম কোর্টে বাজেট বরাদ্দ-বিচারক নিয়োগ চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ