লুটপাটের ব্যাংকগুলোতে খেলাপির বিস্ফোরণ

প্রকাশিত: ৪:৪২ অপরাহ্ণ, জুন ৭, ২০২৬

দেশের ব্যাংক খাতে বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, নানা ছাড় ও লুটপাটের আর্থিক খেসারত এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণের হিসাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে দুই ডজনের মতো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের ৯০ শতাংশেরও বেশি ঋণখেলাপি হয়ে গেছে যা নজিরবিহীন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেসব ব্যাংক বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বিতর্কিত ঋণ অনুমোদন, গোষ্ঠীভিত্তিক অর্থ স্থানান্তর ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল, খেলাপি ঋণের তালিকার শীর্ষেও এখন সেসব ব্যাংকেরই অবস্থান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ব্যাংকের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্র হঠাৎ তৈরি হয়নি, বরং বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের অভাবে একই গোষ্ঠীকে বিপুল ঋণ বিতরণ, পুনঃতফসিলের সুবিধা এবং প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আড়াল করার প্রবণতার ফল। ফলে ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, সুশাসন ও জবাবদিহির সংকট বলে মনে করেন তারা।

সূত্রগুলো বলছে, বিগত আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। নানা ছাড় ও সুবিধা এবং দুর্বল তদারকির মাধ্যমে এসব অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র ওই সময় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রও সামনে আসেনি। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র দেখানো শুরু হয়। বিশেষ করে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, বিসমিল্লাহ, হল-মার্ক, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্টসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং ন্যাশনাল ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনা এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, গত মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। ফলে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি

টাকা। সার্বিক খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ৩২.২৬ শতাংশ। তবে এই হারের চেয়েও উচ্চমাত্রায় রয়েছে প্রায় দুই ডজন ব্যাংকের খেলাপির হার। এ তালিকায় সবার ওপরে আওয়ামী লীগ আমলে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলো। এগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, স্যোশাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। বিতর্কিত ব্যবসায়ী এই গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণ থাকাকালীন ব্যাংকগুলো থেকে নামে-বেনামে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া হয়, যা এখন খেলাপি হয়ে গেছে। এর বাইরে বেক্সিমকো, নাসা, বিসমিল্লাহ, হল-মার্ক, অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্টসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘটিত ঋণ কেলেঙ্কারির ব্যাংকগুলোও উচ্চ খেলাপি ঋণে ধুঁকছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, যেসব ব্যাংকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি ছিল এবং যেখানে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বেশি ছিল, সেসব ব্যাংকেই এখন খেলাপি ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত জামানত ছাড়াই বা অতিমূল্যায়িত সম্পদ দেখিয়ে ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব ঋণ যথাসময়ে আদায় বা শ্রেণিকরণও করা হয়নি। ফলে প্রকৃত ঝুঁকি বছরের পর বছর চাপা ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই ঝুঁকি সামনে আনতে সক্ষম হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষে রয়েছে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ১৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৭.৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটির প্রায় পুরো ঋণ পোর্টফোলিওই এখন খেলাপি। এর পরেই রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণ ৬২ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬০ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের ৯৭.৩৯ শতাংশ। একসময় দ্রুত ঋণ বিতরণের মাধ্যমে ব্যাংকটির আকার বড় হলেও এখন সেই ঋণের বড় অংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই গ্রুপের আরেক ব্যাংক ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট ২৮ হাজার ২ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ২৭ হাজার ১০২ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। খেলাপি ঋণের হার ৯৬.৭৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৯৭ টাকাই খেলাপি। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) মোট ঋণ ৩৮ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের ৭৯.৫৪ শতাংশ। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার এখন ৬৫.৯৭ শতাংশ। ব্যাংকটির মোট ২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা খেলাপি। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ-এর খেলাপি ঋণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাংকটির মোট ঋণ প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের ৫০.৮৮ শতাংশ। তবে পরিমাণের হিসাবে এটিই দেশের সবচেয়ে বড় খেলাপি ঋণের বোঝা বহনকারী ব্যাংক। ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের ৫৬.৭৯ শতাংশ বা ২৪ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে এই ব্যাংক থেকেও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ নিয়ম নীতিকে তোয়াক্কা না করে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয় এবং পরবর্তী সময়ে তা ফেরত আসেনি।

পদ্মা ব্যাংকের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ব্যাংকটির মোট ঋণ ৫ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা হলেও এর মধ্যে ৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা খেলাপি। খেলাপি ঋণের হার ৯০.৬৮ শতাংশ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লাগামহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে এই ব্যাংকের ঋণ বের করে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে মোট ঋণের ৮৪.৪৮ শতাংশ খেলাপি। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৩২ কোটি টাকা। দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূত ঋণ অনুমোদন হয়েছে এই ব্যাংকেও।

এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৬ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৮.৫৮ শতাংশ। আওয়ামী লীগ আমলে এই ব্যাংকটি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএববির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময় প্রভাব খাটিয়ে নিয়মবহির্ভূত ও পারস্পরিক যোগসাজশে এই ব্যাংক থেকেও ঋণ বের করে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৩.৩৬ শতাংশ। অঙ্কের হিসাবে এটি দেশের অন্যতম বড় খেলাপি ঋণধারী বেসরকারি ব্যাংক। আওয়ামী লীগ আমলে এ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল সালমান এফ রহমানের কাছে। তার ক্ষমতাবলে ব্যাংক থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়, যা এখন খেলাপি হয়েছে। এ ছাড়া এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫৪.৯ শতাংশ। ব্যাংকটির মোট ৩৬ হাজার ৬৪ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১৯ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা খেলাপি। এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে বছরের পর বছর ধরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনিয়ম, অস্বচ্ছ ঋণ বিতরণ, জামানত ছাড়া ঋণ প্রদান এবং রাজনৈতিক প্রভাব দায়ী।

রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণ এক লাখ ১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের ৭৩.৯৪ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে এটি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ। এই ব্যাংকটিতে বেক্সিমকো, এস আলম, ক্রিসেন্ট, অ্যাননটেক্সসহ আনও কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটেছে।

এ ছাড়া ঋণ অনিয়মে আলোচিত বেসিক ব্যাংকের মোট ১২ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৮ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের হার ৬৭.৪০ শতাংশ। এর বাইরে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৮.৮৩ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের ৪৩.৩৭ শতাংশ এবং অগ্রণী ব্যাংকের ৩৯.৬০ শতাংশ। যদিও সার্বিক ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হারে এখনও শীর্ষে রয়েছে বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। গত মার্চ শেষে এই ব্যাংকের খেলাপির হার উঠেছে ৯৮.৯৬ শতাংশ।