ঘুমের ভেতর সাপের কামড়ে প্রাণ গেল শিশুর প্রকাশিত: ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬ বাংলাদেশের কৃষির সাফল্য এখন আর কেবল আত্মতুষ্টির বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও তা উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সীমিত জমি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও কৃষিজমির ওপর বাড়তে থাকা চাপের মধ্যেও দেশের কৃষক উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছেন। ধান, সবজি ও মাছের পাশাপাশি ফল উৎপাদনেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একসময় নির্দিষ্ট মৌসুমের অতিথি অনেক ফল এখন প্রায় বছরজুড়ে পাওয়া যায়। আম, কলা, পেঁপে, আনারস ও কাঁঠালের প্রাচুর্য কৃষির এই পরিবর্তিত সক্ষমতারই পরিচয়। এর পেছনে রয়েছে কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী এবং কৃষিতে আত্মনিয়োগকারী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা। তাই ফল উৎপাদনের এই অগ্রগতিকে দেশের কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখতে হবে। তবে প্রশ্ন হলো, শুধু উৎপাদন বাড়িয়েই কি আমরা সন্তুষ্ট থাকব, নাকি উৎপাদিত প্রতিটি ফলের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য নিশ্চিত করব? উৎপাদনে সাফল্য এলেও প্রক্রিয়াজাতকরণে দুর্বলতা সেই অর্জনকে অনেকাংশে ম্লান করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের ফলের সিংহভাগ উৎপাদিত হয় মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। ভরা মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল সরবরাহে চাহিদার সঙ্গে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে দাম কমে যায়, অথচ কৃষকের উৎপাদন খরচ কমে না। ফলে দ্রুত বিক্রি করতে গিয়ে অনেক কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এর চেয়েও বড় সমস্যা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে বিপুল ফল নষ্ট হওয়া। কৃষি ও পোস্টহারভেস্ট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, এই অপচয়ের আর্থিক মূল্য আট হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে সাফল্য অর্জন করলেও তা এখনো পূর্ণ অর্থনৈতিক সাফল্যে পরিণত হয়নি। ভরা মৌসুমে কৃষকের ফল পচে গেলে সেই অর্জন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। তাই উৎপাদনের সাফল্যকে প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতায় রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি। এতে কৃষকের ন্যায্য আয়, উদ্যোক্তার নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা একসঙ্গে বাস্তব রূপ পাবে। জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি শুধু খাদ্য নয়, অর্থনৈতিক সম্পদেরও অপচয়। কৃষকের শ্রম, জমি, পানি, সার, কীটনাশক ও অর্থ বিনিয়োগের পর ফল বাজারে পৌঁছানোর আগে বা অবিক্রীত অবস্থায় নষ্ট হলে ক্ষতির প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে। ভরা মৌসুমে দাম কমে যাওয়া এবং অফ সিজনে বেড়ে যাওয়ার এই বৈপরীত্য দূর করতে ফল দ্রুত বিক্রির বদলে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে সময়ের ব্যবধানকে অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত করতে হবে। এ জন্য কোল্ড চেইন লজিস্টিকস, আধুনিক গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার ঘাটতি দ্রুত দূর করা জরুরি। প্রক্রিয়াজাতকরণ হতে পারে এই সমস্যার কার্যকর সমাধান। তাজা ফলের সংরক্ষণকাল সীমিত হলেও শুকানো বা অন্যভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে তা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। ড্রাইড ফল, ভ্যাকুয়াম ফ্রাইড চিপস, জুস, পাল্প, জ্যাম, জেলি ও অন্যান্য মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে মৌসুমি ফলকে বছরব্যাপী অর্থনৈতিক পণ্যে পরিণত করা সম্ভব। এতে ভরা মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমবে, কৃষক কম দামে ফল বিক্রিতে বাধ্য হবেন না এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল নিশ্চিত হবে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উৎপাদন-পরবর্তী প্রতিটি ধাপ পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। কোল্ড চেইন লজিস্টিকস মেনে পরিবহন, দ্রুত গ্রেডিং ও প্যাকেজিং, উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে উত্তম কৃষি চর্চা বা জিএপির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আকাশপথে কার্গো পরিবহনের খরচ বেশি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় সমুদ্রপথেও ফল পরিবহন সীমিত। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদনের পর নিরাপদ পরিবহন ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। কৃষির পরবর্তী অগ্রগতি তাই মাঠে নয়, মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী করার মধ্যেই নিহিত। বিশ্ববাজারে প্রক্রিয়াজাত ড্রাইড পণ্যের বাড়তি চাহিদা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ইউরোপে এ বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৩৬ শতাংশ এবং উত্তর আমেরিকায় ২০ শতাংশ। আলিবাবার মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে ড্রাইড পণ্যের ক্রেতা প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। অন্য দেশের সাফল্যও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ২০২৪ সালে বুর্কিনা ফাসো চার হাজার টন ড্রাইড আম এবং ঘানা দুই হাজার ৫০০ টন ড্রাইড আম ও আনারস ইউরোপে রপ্তানি করেছে। অথচ বাংলাদেশে আম, কলা, পেঁপে, আনারস ও কাঁঠালের ড্রাইড পণ্যের বাজার প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার, যার কিছু পণ্য আমরা থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ফিলিপিন্স থেকে আমদানি করছি। অর্থাৎ কৃষক কাঁচামাল উৎপাদন করলেও মূল্য সংযোজনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশি উদ্যোক্তাদের হাতে। বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পেলেও বিশ্ববাজারে আমাদের অংশ মাত্র ০.০৩ থেকে ০.২৪ শতাংশ। এই অংশ সামান্য বাড়াতে পারলেও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। তাই ফলকে শুধু পচনশীল কৃষিপণ্য নয়, রপ্তানিযোগ্য শিল্পপণ্য হিসেবে দেখার সময় এসেছে। বিশ্ববাজারের পরিসংখ্যানেই ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার চিত্র স্পষ্ট। বিশ্বজুড়ে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ বাজারের আকার প্রায় চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, অথচ ড্রাইড পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ২৯২তম। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মাত্র ৫৯৪ হাজার মার্কিন ডলারের ড্রাইড পণ্য রপ্তানি করেছে, বিপরীতে আমদানি করেছে ৬.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। ভারত ও মিয়ানমারের তুলনায় আমাদের রপ্তানি প্রায় ১০ গুণ কম। এই ব্যবধান কেবল ব্যবসায়িক ব্যর্থতা নয়, নীতিগত অগ্রাধিকারেরও প্রতিফলন। অথচ কাঁচামাল ও বাজার কোনোটিরই অভাব নেই। বাংলাদেশের ফল বর্তমানে ৪০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে হালাল পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। সঠিক মান নিশ্চিত করতে পারলে এ বাজার আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এজন্য আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মান, প্যাকেজিং, লেবেলিং, ট্রেসেবিলিটি, মান নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ড্রাইড পণ্যের চাহিদা দেশীয় শিল্পের মাধ্যমে পূরণ করা গেলে আমদানি-নির্ভরতা কমবে। অর্থাৎ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প একদিকে ফলের অপচয় কমাবে, অন্যদিকে আমদানি বিকল্প তৈরি ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করবে। দেশীয় গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রটি এ সম্ভাবনার একটি আশাব্যঞ্জক দিক। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ ইতোমধ্যে ২৫ ধরনের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসব প্রযুক্তিতে ক্ষুদ্র ও তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষিত তরুণ-তরুণী ও নারী উদ্যোক্তাদের অনেকে ভ্যাকুয়াম ফ্রাইড চিপস ও ড্রাইড ফল তৈরিতে যুক্ত হয়ে ভালো সাড়াও পাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরির ভিত্তি রয়েছে, এখন প্রয়োজন গবেষণার ফলকে মাঠ ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন বা আরঅ্যান্ডডির মধ্যে শক্তিশালী সংযোগের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক ফল উৎপাদন, উপযোগী প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা এবং বাজারের মানদণ্ড নিয়ে গবেষণা ও বাজার বিশ্লেষণ একসঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। উৎপাদন এলাকায় ছোট ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুললে পরিবহন ব্যয় কমবে, দ্রুত ফল প্রক্রিয়াজাত হবে এবং নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়বে। এভাবে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শুধু শিল্প নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিরও নতুন চালিকাশক্তি হতে পারে। এখন প্রয়োজন বছরব্যাপী একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা। ফলের মৌসুম শুরু হওয়ার পর তৎপর না হয়ে বছরের শুরু থেকেই উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানির পরিকল্পনা করতে হবে। কৃষিবিদ, পোস্টহারভেস্ট প্রযুক্তিবিদ, খাদ্য প্রযুক্তিবিদ, বাজার বিশ্লেষক, রপ্তানি বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা ও কৃষককে নিয়ে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলে কোন মৌসুমে কত ফল উৎপাদিত হবে, কতটা তাজা বাজারজাত ও কতটা প্রক্রিয়াজাত করা হবে, তার আগাম হিসাব রাখতে হবে। কৃষককে মূল্যশৃঙ্খলের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে প্রযুক্তি ও বাজার তথ্যের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুললে কৃষক নিশ্চিত বাজার পাবেন, শিল্প পাবে মানসম্মত কাঁচামাল। আট হাজার কোটি টাকারও বেশি ফল অপচয় রোধ, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার দেশীয় ড্রাইড পণ্যের বাজার দেশীয় শিল্পের আওতায় আনা এবং ৪০টিরও বেশি দেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যকে এখন বাস্তব পরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে। বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে সাফল্য অর্জন করলেও তা এখনো পূর্ণ অর্থনৈতিক সাফল্যে পরিণত হয়নি। ভরা মৌসুমে কৃষকের ফল পচে গেলে সেই অর্জন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। তাই উৎপাদনের সাফল্যকে প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতায় রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি। এতে কৃষকের ন্যায্য আয়, উদ্যোক্তার নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা একসঙ্গে বাস্তব রূপ পাবে। লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। rssarker69@gmail.com এইচআর/এএসএম Download PhotoCard SHARES মতামত বিষয়: ঘুমের ভেতর সাপের কামড়ে প্রাণ গেল শিশুর