অস্থির সময়ে বইয়ের কাছে আশ্রয় খোঁজেন যারা

প্রকাশিত: ৩:১৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬

বই অবসরের সঙ্গী। কিন্তু এখন তা হয়ে উঠেছে মনোযোগের প্রতিদ্বন্দ্বী। যে প্রজন্মের হাত থেকে বই সরিয়ে নিতে চায় স্ক্রিন, সেই প্রজন্মই আবার বইয়ের পাতায় খুঁজছে নিজেকে। একদিকে দ্রুতগতির ডিজিটাল বিনোদন, অস্থির মনোযোগ ও ব্যস্ত জীবনের চাপ; অন্যদিকে নীরবে জেগে থাকা পাঠের আকাঙ্ক্ষা। বইপড়ার অভ্যাস কমছে, এমন আশঙ্কার মাঝেও পাঠচক্র, বইমেলা, অনলাইন বুক কমিউনিটি ও ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসে দেখা মিলছে নতুন পাঠকের। পাঠের নেশা, সংকট ও পুনর্জাগরণ নিয়ে শিক্ষার্থীরা মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তাদের মনোভাবগুলো তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মুহিবুল হাসান রাফি—

অস্থির সময়ে বইয়ের কাছে আশ্রয়

ব্যস্ততা, অনিশ্চয়তা ও নানা উদ্বেগে আজকের জীবন ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত টানাপোড়েন থেকে সামাজিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে মন হারাচ্ছে স্বস্তির জায়গা। এমন সময়ে বই হতে পারে নীরব অথচ নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। বই শুধু জ্ঞানের ভান্ডার নয়; এটি মানুষকে নিজের ভেতর ফিরিয়ে আনে, ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেয়। গল্প, উপন্যাস, কবিতা কিংবা ভ্রমণকাহিনির পাতায় কিছুক্ষণ ডুবে গেলে দৈনন্দিন চাপ থেকে মন পায় সাময়িক মুক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম তথ্যস্রোতে যখন মনোযোগ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে; বই তখন মনকে স্থির হতে শেখায়। বাড়ায় ধৈর্য, গভীর করে চিন্তা, সমৃদ্ধ করে অনুভব। তাই অস্থির সময়ে বইয়ের কাছে ফেরা কেবল অবসর কাটানো নয়; এটি নিজের সঙ্গে সংযোগেরও এক শান্ত পথ। ব্যস্ত জীবনে বই হয়ে ওঠে নীরব বন্ধু, চিন্তার সঙ্গী ও প্রশান্তির ঠিকানা।

আফিয়া আলম, শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

হারানো পাঠের প্রত্যাবর্তন

একসময় নতুন বইয়ের মলাট খুললেই কাগজ ও ছাপার কালির গন্ধে জেগে উঠত পাঠের আনন্দ। পাতায় আঙুল বোলানো, প্রিয় লাইন পড়তে গিয়ে থেমে যাওয়া কিংবা রাত গভীর পর্যন্ত গল্পের ভেতর ডুবে থাকা ছিল এক প্রজন্মের অভ্যাস। এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন, নোটিফিকেশন ও ক্ষণস্থায়ী রিলস। বইয়ের তাক নীরব, স্ক্রলিংয়ের গতি অবিরাম। অথচ বই শুধু জ্ঞান দেয় না; গভীর মনোযোগ, কল্পনা, চিন্তা ও আত্মঅন্বেষণের দরজা খুলে দেয়। প্রযুক্তি তাই শত্রু নয়, প্রয়োজন ভারসাম্যের। ছোটবেলা থেকেই শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া, পরিবারে পাঠের পরিবেশ তৈরি এবং বিশেষ দিনে বই উপহার দেওয়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা জরুরি। প্রযুক্তি থাকুক, স্ক্রিনও থাকুক। তবে ফিরুক বইয়ের পাতায় মন দেওয়ার অভ্যাস। হারানো পাঠের প্রত্যাবর্তনেই গড়ে উঠুক মননশীল প্রজন্ম।

তিথি দাস, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ, সরকারি ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল।

স্ক্রিনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে পাঠ

একসময় অবসরের নীরব সঙ্গী ছিল বই; এখন সেই জায়গায় বসেছে স্ক্রিন। বইয়ের পাতা উল্টানোর বদলে আঙুল ছুটছে একের পর এক স্ক্রলে। কয়েক সেকেন্ডের কনটেন্টে অভ্যস্ত চোখ দীর্ঘ লেখা দেখলেই ক্লান্ত হয়, ধৈর্য হারায় মন। ফলে শুধু পাঠের সময়ই কমছে না, কমছে গভীরভাবে পড়া, ভাবা ও প্রশ্ন করার অভ্যাসও। তবে সংকটের নাম প্রযুক্তি নয়; সংকট আমাদের ব্যবহারে। যে স্ক্রিন মনোযোগ কেড়ে নেয়, সেই স্ক্রিনেই আবার খুলে যেতে পারে অসংখ্য বই, গবেষণা ও জ্ঞানের দরজা। তাই লড়াইটা বই বনাম প্রযুক্তির নয়, অমনোযোগ বনাম মননের। পাঠাভ্যাস ফেরানোর শুরু হতে পারে খুব ছোট একটি সিদ্ধান্তে। স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে প্রতিদিন কিছুক্ষণ বইয়ের পাতায় চোখ রাখা। কারণ পাঠ হারালে শুধু বই হারায় না, হারায় চিন্তার গভীরতাও।

জান্নাতুল ফেরদাউস রিতা, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বই থেকে জীবনের পাঠ

স্ক্রিনের ঝলকে যখন বইয়ের পাতা ম্লান, তখন হারিয়ে যাচ্ছে শুধু পাঠাভ্যাস নয়, গভীরভাবে ভাবার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাও। বই কাগজে বাঁধা কিছু শব্দ নয়; এটি মানুষকে ভেতর থেকে নির্মাণের নীরব কারিগর। একটি বই শেষ করার ধৈর্য মনোযোগকে দীর্ঘ করে, গল্পের চরিত্রের সংকট শেখায় সিদ্ধান্তের মূল্য, ইতিহাস শেখায় ভুল থেকে ফিরে আসতে, আর সাহিত্য শেখায় অন্যের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে। দ্রুত স্ক্রলের সময়ে বই তাই নিছক অবসর বিনোদন নয়; এটি মননের ব্যায়াম, বিবেকের শাণ এবং মানবিকতার পাঠশালা। পরীক্ষার ফল কিংবা পেশাগত সাফল্যের বাইরে বই মানুষকে শেখায় কীভাবে আরও সংবেদনশীল, সহনশীল ও চিন্তাশীল হওয়া যায়। তাই আলোকিত প্রজন্মের স্বপ্ন যদি সত্যিই থাকে, তবে স্ক্রিনের ভিড় পেরিয়ে ফিরতে হবে বইয়ের পাতায়।

জান্নাতুল নাঈম মনিকা, শিক্ষার্থী, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মননের খোঁজে বই পাঠ

বইপড়া শুধু তথ্য আহরণ নয়; এটি চিন্তার জানালা খুলে দেয়, মানুষকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করতে শেখায়। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন কিংবা সাহিত্য—বিষয়ভেদে প্রতিটি বই জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি কল্পনা, সৃজনশীলতা ও মানবিক বোধকে সমৃদ্ধ করে। অন্যের জীবন, সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনার সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে বই মানুষকে সহমর্মী করে তোলে। আর ‘মনন’ মানে কেবল জ্ঞান নয়, গভীর চিন্তা, উপলব্ধি, বিশ্লেষণ ও আত্মজিজ্ঞাসার সক্ষমতা। তাই বই পাঠের প্রকৃত সার্থকতা শুধু পড়ায় নয়; পড়া বিষয় নিয়ে ভাবা, আলোচনা করা এবং জীবনে তার ইতিবাচক প্রয়োগে। বই যখন চিন্তার অভ্যাস তৈরি করে; তখন পাঠক শুধু জ্ঞানী নয়, সচেতন ও মানবিক মানুষ হয়ে ওঠে।

শাম্মী তুলতুল, কবি ও কথাসাহিত্যিক।

বইয়ের কাছে সময়ের জবাব

সময় বদলায়, বদলায় মানুষের অবসরও। একসময় দিনের ক্লান্তি থামত বইয়ের পাতায়; এখন তা আটকে থাকে মুঠোফোনের পর্দায়। দ্রুত বদলে যাওয়া ছবি, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও আর অবিরাম স্ক্রল আমাদের চোখ ব্যস্ত রাখে, কিন্তু মনকে কতটা সমৃদ্ধ করে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। বইয়ের শক্তি ঠিক এখানেই। বই আমাদের থামায়, গভীরে নিয়ে যায়, ভাবতে শেখায়। একটি চরিত্রের জীবনের ভেতর দিয়ে আমরা কখনো নিজেকে আবিষ্কার করি, কখনো অন্যের কষ্টকে অনুভব করি। তথ্যের এই বিস্ফোরণের যুগে তাই সংকট তথ্যের নয়, মনোযোগের। স্ক্রিন আমাদের জানায় কী ঘটছে; বই শেখায় কেন ঘটছে। প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, মানুষের মনন গঠনে বইয়ের বিকল্প নেই। তাই প্রতিদিন স্ক্রিন থেকে কিছুটা দূরে সরে বইয়ের কাছে ফিরতে হবে। কারণ বইপড়া মানে শুধু পৃষ্ঠা শেষ করা নয়, নিজের ভেতরের অন্ধকারে একটি আলো জ্বালানো।

শারমিন উদ্দিন, শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

বইয়ের সঙ্গে একাকী আলাপ

বই আমার কাছে শুধু বই নয়; বন্ধু, মেন্টর, কখনো ভ্রমণসঙ্গী। আনন্দ, বিষণ্নতা কিংবা একাকিত্বে যখন চারপাশ নীরব; তখন একটি থ্রিলার বা গোয়েন্দা কাহিনি আমাকে নিয়ে যায় অন্য এক ভুবনে। বইয়ের সঙ্গে আমার সখ্য শৈশবেই; ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ ও ‘আরব্য উপন্যাস’ দিয়ে শুরু, কৈশোরে হুমায়ূন আহমেদ, এরপর বিচিত্র লেখক ও ঘরানার সঙ্গে পরিচয়। ফিকশন বাড়ায় কল্পনার ডানা, শাণিত করে ভাষা; নন-ফিকশন খুলে দেয় জ্ঞানের জানালা। আমি বইয়ের ব্যাপারে সর্বভুক তবে হুমায়ূন আহমেদ, থ্রিলার ও ইতিহাসের বইয়ের প্রতি টান বেশি। একটি ভালো বই শেষ করার পর যে তৃপ্তি, তা পাঠকই বোঝেন। বইয়ের পাতায় ঘুরি মানুষের মন, সমাজ ও বহির্জগতের অলিগলিতে। তাই বই যার সঙ্গী, তার একাকিত্বও কখনো নিঃসঙ্গ নয়। বই আমার কাছে আবেগ, ভালোবাসা আর আজীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু।

অনন্যা অনি, শিক্ষার্থী, হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা।