এল নিনোর প্রকোপে শুকিয়ে গেছে নদী, চরম বিপাকে ইন্দোনেশিয়ার পাম চাষিরা প্রকাশিত: ৫:৫২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২৬ প্যাসিফিক মহাসাগরের উপরিভাগের পানি অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার ফলে সৃষ্ট শক্তিশালী সুপার এল নিনোর প্রভাবে চরম খরা দেখা দিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়ায়। বিশেষ করে দেশটির পশ্চিম কালিমন্তন প্রদেশের প্রধান পরিবহন ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘কাপুয়াস নদী’র পানি শুকিয়ে চরম সংকট তৈরি হয়েছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় পাম তেল খালাস ও পরিবহন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে কারখানাগুলোর মজুতাগারে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ক্ষুদ্র পাম চাষিদের কাছ থেকে কাঁচা ফল কেনা একপ্রকার বন্ধ করে দিয়েছে প্রক্রিয়াজাতকরণ কলগুলো। ৩২ বছর বয়সী পাম চাষি সুপেন্দি চলতি মাসের শুরুর দিকে নিজের ও আশপাশের খামার থেকে সংগ্রহ করা ৭ মেট্রিক টন কাঁচা পাম ফলের থোকা নিয়ে পশ্চিম কালিমন্তানের সংগাউ শহরের ‘মাল্টি প্রিমা এনতাকাই’ মিলের সামনে এসে পৌঁছান। ফল খালাস করার আশায় দীর্ঘ চার দিন ধরে তিনি সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু চার দিন অপেক্ষার পর তাকে জানানো হয় যে কারখানার সব মজুতাগার কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে, তাই নতুন করে কোনো ফল কেনা সম্ভব নয়। হতাশ হয়ে ফেরত যাওয়া সুপেন্দি টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, কারখানা থেকে ফল গ্রহণ করা হয়নি এবং তারা এখন এগুলো কীভাবে বিক্রি করবেন তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সুপেন্দির এই দুর্দশা মূলত পশ্চিম কালিমন্তানের হাজার হাজার ক্ষুদ্র চাষির বর্তমান বাস্তব চিত্রকে তুলে ধরে, যারা বর্তমানে গাছের পাম ফল পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ আমেরিকা সংলগ্ন অঞ্চলের পানি অতিরিক্ত গরম হওয়ার কারণে সৃষ্ট এল নিনো সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তীব্র তাপদাহ ও খরা নিয়ে আসে। তবে চলতি বছরের এ জলবায়ু কাঠামোর তীব্রতা এতটাই বেশি যে ইন্দোনেশিয়ার নদী ও কূয়োগুলো সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। এর ফলে পশ্চিম কালিমন্তন এবং সুমাত্রা দ্বীপের বনাঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলকে শ্বাসরুদ্ধকর ধোঁয়াশায় ঢেকে দিয়েছে। এই বিষাক্ত ধোঁয়াশা স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে পাশ্ববর্তী দেশ মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার মোট পাম তেল উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশই আসে পশ্চিম কালিমন্তন থেকে। কিন্তু এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট এই চরম গোলযোগের কারণে বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে পুরো ইন্দোনেশীয় বোর্নিও অঞ্চল জুড়ে পাম তেলের উৎপাদন ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম এই ১১৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ কাপুয়াস নদীটি পশ্চিম কালিমন্তানের মোট পাম তেল উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ বহনে ভূমিকা রাখে বলে ইন্দোনেশিয়ান পাম অয়েল অ্যাসোসিয়েশনের (গাপকি) তথ্যে উঠে এসেছে। নদীর পানি অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে যাওয়ায় তলদেশের বালুচরগুলো জেগে উঠেছে। এর ফলে নদীর বিভিন্ন স্থানে ধাতু বহনকারী বড় বড় বার্জ ও টাগবোটগুলো চড়ায় আটকে আটকা পড়ে রয়েছে। বিকল্প হিসেবে সড়কপথে সরবরাহের চেষ্টা করা হলেও সেটির সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। কল মালিকরা জানিয়েছেন যে একটি ট্রাক নদীপথের বার্জের তুলনায় অনেক কম পণ্য পরিবহন করতে পারে, তাছাড়া বাজারে পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রাকও সহজলভ্য নয়। স্থানীয় কৃষকদের মতে, ২০১৫ এবং ২০১৮ সালের এল নিনোর সময়ও অনুরূপ খরা দেখা দিয়েছিল, তবে তা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র এক মাসের মতো। কিন্তু এ বছর কাপুয়াস নদীর পানি স্মরণকালের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে এবং এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ইতিমধ্যেই টানা দুই মাস অতিক্রম করেছে। এদিকে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে যে স্বাভাবিক সময়ের অক্টোবরের পরিবর্তে এবার বৃষ্টিপাত শুরু হতে নভেম্বর পর্যন্ত বিলম্ব হতে পারে। বৃষ্টি পিছিয়ে যাওয়ায় নদীগুলোর পানি ফিরে পেতে দেরি হবে, যা গত ১১ বছরের মধ্যে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং স্বস্তি পাওয়ার পথকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। পরিবহন সংকটের ফলে সৃষ্ট সার্বিক উৎপাদন ঘাটতি নিয়ে গাপকির পশ্চিম কালিমন্তন শাখার প্রধান আরিস সুপ্রাতমান জানান, এই প্রদেশের ৫০টি পাম তেল মিলের মধ্যে ১৩টি সরাসরি পরিবহন ব্যবস্থার বিপর্যয়ে পড়েছে, যা ওই অঞ্চলের মোট প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। পরিবহন জট ও সরবরাহে বাধার কারণে আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে প্রদেশটি থেকে পাম তেলের সরবরাহ প্রায় ১১ শতাংশ কমে যাবে বলে তিনি প্রাক্কলন করেছেন। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন যে শিপমেন্ট বা চালান বিলম্বিত হওয়ায় যখনই মিলগুলোর তেল রাখার ডাঙ্কগুলো পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা নিরুপায় হয়ে নিজেদের উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে গাছের ফল পরিপক্ক হওয়ার গতি ধীর হয়ে যাওয়ায় গাপকি জাতীয়ভাবে ২০২৬ সালের পাম তেল উৎপাদনের পূর্বানুমানও ২.৯ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। কৃষক সুপেন্দিকে ফিরিয়ে দেওয়া মাল্টি প্রিমা এনতাকাই মিলের ৪৪ বছর বয়সী ব্যবস্থাপক দিয়েন কুরনিয়াওয়ান জানান, গত জুলাই মাসেও তাদের কারখানাটি ৩০ হাজার টন কাঁচা ফল প্রক্রিয়াজাত করেছিল, যা সেপ্টেম্বর মাসে নেমে মাত্র ১০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। ১ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, তাদের কারখানায় বর্তমানে ৮২০০ টন অপরিশোধিত পাম তেল মজুত রয়েছে, যেখানে মিলটির মোট সংরক্ষণ ক্ষমতা ৮৫০০ টন। পরিস্থিতি বর্ণনা করে দিয়েন জানান যে স্বাভাবিক সময়ে নদীপথে যেখানে মাত্র চার দিনে তারা ২,০০০ টন তেল পাঠাতে পারেন, সেখানে বর্তমানে ট্রাক ব্যবহার করে দিনে সর্বোচ্চ ১০০ টন পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। সড়কপথের এই পরিবহন শুধু ধীরগতিরই নয়, নদীপথের তুলনায় এর খরচও প্রায় তিন গুণ বেশি। একদিকে ফল বিক্রি না হওয়া এবং অন্যদিকে আয়ের মুখ না দেখার কারণে ক্ষুদ্র চাষিরা এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ক্ষুদ্র পাম চাষিদের সংগঠন আপকাসিন্দো-র পশ্চিম কালিমন্তন শাখার প্রধান ইন্দ্র রুস্তান্দী জানান, দীর্ঘ দিন ধরে ফল বিক্রি করতে না পেরে কৃষকরা দৈনন্দিন খরচ বাঁচাতে নিজেদের বাগানের সারের ব্যবহার প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে পাম গাছগুলোর স্বাভাবিক পরিচর্যা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংগাউয়ের ৬৩ বছর বয়সী অপর এক ক্ষুদ্র চাষি রহমত উইয়োনো তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন যে গত দুই মাস ধরে তিনি নিজের উৎপাদিত ফল বিক্রি করতে চরম লড়াই করছেন। অনেক সময় নিজের নিয়মিত মিল বন্ধ থাকায় টানা ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে অন্য মিলে গিয়েছেন, যেখানে প্রতি কেজি ফলের থোকার দাম দেওয়া হয়েছে মাত্র ২,৬৫০ রুপিয়া (প্রায় ০.১৫ ডলার)। অথচ তার নিয়মিত মিলে তিনি প্রতি কেজির জন্য ৩৪০০ রুপিয়া করে পেতেন। কিছুটা আক্ষেপের সুরেই তিনি জানান যে তাদের অনেক বন্ধু গত দুই মাস ধরে কোনো ফলই তুলতে বা বিক্রি করতে পারেননি। ফলে জীবনধারণ ও পরিবারের দৈনিক খরচের জোগান দিতে বাধ্য হয়ে অনেকেই এখন স্থানীয়ভাবে তৈরি কেক ও ডোনাট বিক্রি করার মতো বিকল্প পেশা বেছে নিয়েছেন। Download PhotoCard SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: এল নিনোর প্রকোপে শুকিয়ে গেছে নদীচরম বিপাকে ইন্দোনেশিয়ার পাম চাষিরা