ইরান যুদ্ধের জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ ধাক্কা এখনও বাকি: কাতার

প্রকাশিত: ৫:৫৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২৬

ইরানের যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখনও আসেনি বলে সতর্ক করেছেন কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি।

আগামী দিন ও মাসগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এর আরও গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

সোমবার দোহায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে কাতারের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বেও থাকা আল থানি বলেন, জ্বালানি খাতের সংকট এখনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উপসাগরীয় অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব এবং জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

আল থানি বলেন, “জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা এখনও সংকটের চূড়ায় পৌঁছাইনি।”

আগামী দিন ও মাসগুলোতে এর আরও প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে তেহরানের পাল্টা আঞ্চলিক হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবহনে ব্যবহৃত হয় এই নৌপথ। ফলে সেখানে যেকোনও বিঘ্ন বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

গত মার্চে কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে ইরানের হামলায় বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব স্থাপনা মেরামত করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

হামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে আল থানি বলেন, “আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম।” তবে ওই ঘটনার পর ইরানের সঙ্গে এ বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এই হামলা থেকে শিক্ষা নিয়ে কাতার নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করছে বলে জানান উপপ্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, অপ্রত্যাশিত যেকোনো হামলা থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখাই এখন অন্যতম অগ্রাধিকার।

হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক আরোপের বিরোধিতা
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কোনও ধরনের ট্রানজিট ফি বা চলাচল শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করেছেন আল থানি। তিনি বলেন, এই নৌপথ দিয়ে যাতায়াতের জন্য কোনও শুল্ক আরোপ করা উচিত নয়।

তার মতে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদেরও এর মূল্য দিতে হবে।

ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে কাতার
যুদ্ধ ও হামলার পরও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেনি কাতার। আল থানি বলেন, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

যুদ্ধের আগে ইরানের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক ছিল আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত- এমন মন্তব্য করে তিনি দুই দেশের যৌথ সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে টেকসই সমাধানের জন্য আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংলাপ প্রয়োজন বলে মনে করেন কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী। এক্ষেত্রে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) সদস্যদেশগুলোর পাশাপাশি পাকিস্তান ও তুরস্ককে যুক্ত করার এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আল থানি বলেন, “আমাদের আস্থার ভিত্তিতে এগোতে হবে।”

ভবিষ্যতে সংঘাত এড়াতে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারেরও পরামর্শ দেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্স ও জার্মানির কথা উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর দেশ দুটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নত করেছে।

তিনি বলেন, “ইরান আমাদের প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে কীভাবে বসবাস করা যায়, সেই পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।”

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার
কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তার দাবি, গত তিন থেকে চার দশকে যৌথ অভিজ্ঞতা ও সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার ফলে ৯০ শতাংশের বেশি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের অংশীদার দেশগুলোর সেনাসদস্যদের অবস্থানস্থল আল উদেইদ বিমানঘাঁটির উন্নয়নকাজও অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। চলমান সংঘাতের সময় ইরান এই ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। মার্চের শুরুর দিকে একটি হামলার সময় দুটি ইরানি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছিল কাতার।

এছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন আল থানি। তবে সম্ভাব্য অংশীদার দেশগুলোর নাম প্রকাশ করেননি তিনি।

কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে উল্লেখ করেন কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “মধ্যস্থতা করার অর্থ এই নয় যে নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য যেকোনও পদক্ষেপ নিতে আমরা প্রস্তুত থাকব না।” সূত্র: আল-জাজিরা