আগুনে রহস্যের ধোঁয়া প্রকাশিত: ১২:৫১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩, ২০২৪ ‘দোকানে কাজ করছিলাম। হঠাৎ বিকট আওয়াজ শুনে বাইরে এসে দেখি গ্যারেজের পেছন দিকে থাকা দুটি বাসে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে আগুন। এত দ্রুত আগুন ছড়াতে পারে- এটা না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না! খানিক পর ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের মতো শব্দ করে বাসের এক একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হচ্ছে। মনে হচ্ছিল কেয়ামত নাইম্মা আইছে। রাত ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে গ্যারেজের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। খানিকবাদে টিন দিয়ে ঘেরা সীমানা প্রাচীরও ভেঙে ফেলে। প্রায় এক ঘণ্টা লাগে আগুন নিভতে; ততক্ষণে সব বাস পুইড়া সারা।’ গতকাল মঙ্গলবার দুুপুরে একনাগাড়ে কথাগুলো বলছিলেন মো. রিমন শেখ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধার্মিকপাড়ার (মিনি কক্সবাজার) মোতালেব খান চত্বরে ‘বাইক ডক্টর’ নামে মোটরসাইকেল সার্ভিসিংয়ের দোকানের মালিক তিনি। গত সোমবার রাতে রহস্যজনক আগুনে এই দোকানের পাশেই অবস্থিত লন্ডন এক্সপ্রেসের বাসের ডিপোতে রাখা বিলাসবহুল ১৪টি ভলবো বাস পুড়ে যায়। এখন সেই ডিপোতে দাঁড়িয়ে আছে পোড়া বাসগুলোর কঙ্কাল। এদিকে ঈদের আগে একসঙ্গে এতগুলো বাস পোড়ার ঘটনাটি নাশকতা নাকি স্রেফ দুর্ঘটনা, তা গতকাল রাত পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি র্যাব, পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। যদিও সোমবার রাতে লাগা এই আগুনকে রহস্যময় বলছে পুলিশ। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যও অভিন্ন। তারা বলছেন, ঘটনার সময় গ্যারেজটি অন্ধকার ও তালাবদ্ধ ছিল। সেখানে কোনো মানুষ ছিলেন না। ঘটনাটিকে রহস্যজনক আখ্যা দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন বলেছেন, সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। আগুনের সূত্রপাত জানার চেষ্টা চলছে। ঘটনাটি নাশকতা কিনা তা খতিয়ে দেখছে র্যাব, পুলিশ ও সিআইডিও। এরই অংশ হিসেবে গতকাল পোড়া সব বাসের নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট। সবার সন্দেহ যখন নাশকতা- সেই সময়ে লন্ডন এক্সপ্রেস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে- কোম্পানির মালিক মো. নরুল ইসলাম থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন বলে তারা সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না। কোম্পানির পক্ষে সোমবার গভীর রাতে অগ্নিকা-ের ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন কোম্পানির ডেপুটি ডাইরেক্টর (ডিডি) মো. নুরুল ইসলাম। রহস্যজনক এই অগ্নিকা-ের পরপরই গ্যারেজের নিরাপত্তা প্রহরী নাজমুল ইসলামকে হেফাজতে নেয় যাত্রাবাড়ী থানাপুলিশ। যদিও গতকাল রাতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে অগ্নিকা-ের বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। এদিকে ধার্মিকপাড়ায় লন্ডন এক্সপ্রেসের ডিপোতে অগ্নি দুর্ঘটনায় ১৪টি বাস পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিনকে প্রধান করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। লন্ডন এক্সপ্রেস কোম্পানির ডিডি নুরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, পুড়ে যাওয়া প্রতিটি বাসের মূল্য আড়াই কোটি টাকা করে। এক্ষেত্রে আমাদের মোট ৩৫ কোটি টাকার বাস ভস্মীভূত হয়। এ ছাড়া ২ কোটি টাকার খুচরা যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ঈদের আগে এতগুলো বাস পুড়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন তিনিও। লন্ডন এক্সপ্রেসের গ্যারেজে ১৪টি ভলবো বাসে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক অপারেশন মো. ওহিদুল হক মামুন। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈনও বলেন, ঘটনাটি স্বাভাবিক নাকি নাশকতা, তা খুঁজতে র্যাবের গোয়েন্দারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। যদিও সেগুলোর কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো নাশকতার সন্দেহ করে আমাদের কাছে অভিযোগ করেননি। তারপরেও আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছে। এটা স্বাভাবিক ঘটনা নাকি নাশকতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমাদের গোয়েন্দারা ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, তারা কোনো সন্দেহ করলে সেটাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে। জানা গেছে, আনুমানিক ৭ মাস আগে যাত্রাবাড়ী থানাধীন কোনাপাড়া-বাইগদিয়া সড়কের পাশে মিনি কক্সবাজার খ্যাত এলাকায় গ্যারেজ ভাড়া নেয় লন্ডন এক্সপ্রেস কর্তৃপক্ষ। মাসিক ৬০ হাজার টাকা চুক্তিতে মাতুয়াইল দক্ষিণপাড়া এলাকার হাইস উদ্দিন ভূঁইয়ার কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়ে নিজের খরচে গ্যারেজ নির্মাণ করে তারা। এই গ্যারেজে কোম্পানির গাড়িগুলো মেরামত ও পার্কিং করে রাখা হয়। পুড়ে যাওয়া ১৪টি বাসও এখানে রাখা হয়েছিল মেরামতের উদ্দেশ্যে যেগুলোর জন্য ২ কোটি টাকার যন্ত্রাংশও আনা হয়েছিল। তবে গ্যারেজে কোনো অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বাসগুলোর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গ্যারেজের পেছন থেকে প্রথমে আগুনের সূত্রপাত হয়। বাতাসের বেগ বেশি থাকায় ১০ মিনিটের মধ্যে সবকটি বাসে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় গাড়িগুলোর ট্রায়ার, এসি সিলিন্ডার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আশপাশে কম্পনের সৃষ্টি হয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস টিম আসার আগেই গাড়িগুলো পুড়ে ভস্মীভূত হয়। পরে পর্যায়ক্রমে ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে ১ ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ভয়ে-আতঙ্কে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত গ্যারেজের আশপাশের অনেক দোকান খোলেনি। স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি ঝড়ের কবলে পড়ে গ্যারেজের পেছনের টিনের তৈরি বাউন্ডারির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গত সোমবার দিনব্যাপী ওই গ্যারেজের মেরামত কাজ করেন শ্রমিকরা। প্রধান ফটকে ওয়েলডিংয়ের কাজও করা হয়েছিল। গ্যারেজের পেছনে নিম্নমানের ইলেকট্রিকস তার দিয়ে কাজ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশও গ্যারেজের পেছন দিকে নিম্নমানের তার পড়ে থাকতে দেখেছে। পুলিশ ও লন্ডন এক্সপ্রেস কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা বৈদ্যুতিক কোনো গোলযোগ থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ঘটনাটি নাশকতা না দুর্ঘটনা? এমন প্রশ্নের জবাবে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে ১৪টি পোড়া বাসের নমুনা সংগ্রহ করে যাত্রাবাড়ী থানায় দেওয়া হয়েছে। তারা মহাখালীতে কেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠাবে। পরে কেমিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে বিস্তারিত জানা যাবে। যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক অপারেশন মো. ওহিদুল হক মামুন বলেন, প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সোমবার রাত থেকেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কাজ করেছি। আমাদের তদন্ত চলছে। আগুন SHARES জাতীয় বিষয়: আগুনধোঁয়ারহস্য