গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নে চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের গুরুত্ব

প্রকাশিত: ৪:২৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২৪

চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো চীন সফরে গেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে সবশেষ জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের পর কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের পর পঞ্চম মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। তবে ফলাফল ঘোষণার আগে পশ্চিমা কয়েকটি দেশ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে চীন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে এবং দেশটির নির্বাচনে বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। তবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত তুলনামূলক একটু দেরিতেই তার অবস্থান পরিষ্কার করে।

গেল ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছি, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার বিষয়।’ বাংলাদেশের জন্য এটিকে সরাসরি সমর্থন বলে মনে হয়নি।

পরবর্তীতে ভারতীয় গণমাধ্যম অবশ্য শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে কোন দেশকে বেছে নেন সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল। তবে শেখ হাসিনা প্রথমে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে ভারতের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদান করেন এবং পরে আবারও আলাদা রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত যান।

আর দুই দফায় শেখ হাসিনার এই ভারত সফর দেশটির গণমাধ্যমকে আনন্দিত করে। তারা বিশ্বাস করে যে, এক মাসের মধ্যে হাসিনার দুবার ভারত সফর দুই দেশের মধ্যে অটুট বন্ধুত্ব প্রদর্শন করেছে। এটাও অনস্বীকার্য যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহ্যগত এই বন্ধন দুই দেশের মধ্যে আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

তবে শেখ হাসিনার পঞ্চম মেয়াদ এবং আজকের বাংলাদেশ অতীত থেকে অনেক আলাদা। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ দারিদ্র ও দুর্বলতাকে সম্পূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। জাতীয় শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার পাশপাশি বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য দেয়।

এমনকি বাংলাদেশকে বর্তমানে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা হয়। দেশটি এ অঞ্চলের আকাঙ্খা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি যেমন বিবেচনায় রেখেছে, ঠিক তেমনভাবেই ভূ-রাজনৈতিক খেলার চেয়ে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতেও তারা  বেশি মনোযোগী।

 সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের বৈদেশিক বিষয়গুলো মোকাবিলায় শেখ হাসিনার বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দেখেছে। একইসঙ্গে তারা এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সুযোগে আস্থা রেখেছে। বিশ্বশক্তিগুলো ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ সুসম্পর্কও বজায় রেখেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে চীন সবসময় বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতি তাদের সমর্থন দিয়ে এসেছে। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের দ্রুত বিকাশের মূল ভিত্তি হলো, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের যেকোন কৌশলগত ইস্যুতে তাদের ক্রমাগত প্রশংসা।

২০২৩ সালের আগস্টে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের সময় চীন, তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় তাদের পরিষ্কার অবস্থানের কথা জানিয়েছিল। এছাড়াও, বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে বাংলাদেশের প্রতি দেশটির সমর্থন থাকবে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও চীন সাহায্য করবে বলে মত প্রকাশ করেছিল। একইসঙ্গে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবেও চীন বাংলাদেশের পাশে আছে বলেও জানান দিয়েছিলেন শি জিনপিং।

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ-চীন সুদৃঢ় সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এসময় তিনি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক বিষয় ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা দ্রুততার সঙ্গে বিকশিত হয়েছে। টানা ১৩ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে যেখানে ছিল ৩৩০ কোটি ডলার, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে বেড়ে দাঁড়িয়ে তা হয় ২ হাজার কোটি ডলার।

এদিকে বাংলাদেশ ২০১৬ সালে চীন-প্রস্তাবিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগদানের পর থেকেই চীন দেশটিতে ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেয়ছে বহুমুখী মাত্রা। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ছাড়াও দুই দেশ কৃষি, মৎস্য, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও ত্রাণ, সামুদ্রিক বিষয়, মানবিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয় ও সহযোগিতা করা।