‘রিপোর্ট প্রকাশ হলেও তো ভাগ্য বদলায় না’ সাংবাদিক দেখে আক্ষেপ ফারজানার

প্রকাশিত: ২:৪৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬

সৈয়দপুর ঢেলাপীড় হাটের পাশেই উত্তরা আবাসনকেন্দ্র। যেখানে গৃহহীন মানুষের বাস। ছোট্ট দুটি কক্ষের বাড়িতে থাকেন শাহজাদা আশরাফি ও ফারজানা বেগম দম্পতি। সাধারণ সব মানুষের মতোই তাদেরও স্বপ্ন ছিল বিয়ের পর সন্তান হবে। সেই সন্তান একদিন বড় হয়ে তাদের সব অভাব অনটন দূর করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায় একে একে জন্ম নেওয়া চার প্রতিবন্ধী সন্তান। তবুও ভেঙে পড়েননি এ দম্পতি। স্বপ্ন পূরণের আশায় নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে অতি যত্নে লালন পালন করছেন তাদের।

শাহজাদা পেশায় ভ্যান চালক। ফারজানা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। চার প্রতিবন্ধী সন্তানের মধ্যে তিন কন্যা শাহানা বেগম (২২), শাহানাজ বেগম (২০), মমতা বেগম ( ১৭) ও ছেলে আব্দুল কাদির (১৫)। একমাত্র রাজিব ( ১২) নামের এক ছেলে সুস্থ। প্রতিবন্ধী চার সন্তানের হাত-পা অস্বাভাবিক এবং চলাফেরা সহজে করতে পারে না। এমন কী অন্যের সাহায্য ছাড়া খাওয়া-দাওয়া ও নিত্যনৈমিত্তিক কাজও করতে পারে না। প্রতিবন্ধী এই চার সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে শাহজাদা ও ফারজানা দম্পতির। দারিদ্রতার কারণে তাদের চিকিৎসা করাতে পারছেন না তারা।

সরেজমিনে আবাসনকেন্দ্রের এ ঘর-ও ঘর ঘুরে ফারজানার কাছে গেলে দেখা যায়, খুড়ির চুলায় ছোট্ট হাঁড়িতে ভাত রান্না করছেন তিনি। দেখে মনে হয়েছে মাত্র দু’জন মানুষ পেট ভরে খেতে পারবে। কিন্তু না, এই দু’জন মানুষের খাওয়ার মতো রান্না করা ভাত খাবে তার পরিবারের সাতজন মানুষ। তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। কারণ এর আগেও তার প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে সাংবাদিকরা। এতে কিছুই জুটেনি তাদের ভাগ্যে।

ফারজানা বলেন, বড় মেয়ে শাহানার জন্মের সময়ই তার দুটি পা বাঁকা ও চিকন ছিল। তখন তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য পরবর্তীকালে যোগাযোগ করতে বলা হয়। কিন্তু অভাবের সংসারে আর চিকিৎসকের কাছে যাননি। পরে শাহানার মতো বাকী তিন সন্তানও একই ধরনের শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়। তারা যত বড় হতে থাকে, তাদের শারীরিক সমস্যা আরও প্রকট হতে থাকে। প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অনেক কষ্টে তাদের লালন পালন করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আগে শহরের পুরাতনবাবুপাড়ায় ভাড়ায় থাকতাম। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর ১৬ বছর ধরে স্বামী সন্তানদের নিয়ে তার নামে বরাদ্দকৃত আবাসনের বাড়িতে থাকি। প্রতিবন্ধী সন্তানদের দেখাশোনা করতে হয়, আবার বয়সও বেড়ে যাওয়ায় ওদের বাবা ঠিকভাবে আয় রোজগার করতে পারেন না। এনজিও, স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আমাদের মৃত্যুর পর তাদের জীবন কীভাবে কাটবে জানি না।

প্রতিবন্ধী শাহানা বেগম বলেন, মায়ের বয়স হয়েছে। আমাদের টানা হেঁচড়া করতে তার কষ্ট হয়। বাবার কষ্ট সহ্য করতে পারি না। তাদের কষ্ট দেখে মাঝে মাঝে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা হয়। সরকার যদি আমাদের কোনো ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে তাদের কষ্ট কমে যেত।

প্রতিবেশী আরমান হোসেন ও সুমি আক্তার জানান, প্রতিবন্ধী চার সন্তান নিয়ে বিপাকে আছেন শাহজাদা ও ফারজানা দম্পতি। অভাব-অনটনে দিন পার করছেন তারা। অনেক সময় না খেয়েও দিন কাটছে তাদের। বড় মেয়ে শাহানা সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া-লেখা করেছে। তার প্রতিবন্ধী কোটায় কোনো চাকরির ব্যবস্থা করলে ভালো হতো।

বিজ্ঞাপন

শাহজাদা আশরাফি বলেন, ‘আমি অসহায় পিতার মতো সন্তানদের জন্য কিছু করতে পারছি না। এদের নিয়ে খুব কষ্টের জীবন পার করছি। এখন তো ঠিক মতো ভ্যানও চালাতে পারি না। মাঝে মধ্যে অন্যের সাহায্যে এক বেলা কোনো রকম খাবার জুটে।’

এ নিয়ে কথা হয় সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাহ ফাতেহা তাকমিলার সঙ্গে। তিনি বলেন, কোনো মা-বাবা তার প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে কষ্টে আছেন, এমন তথ্য জানা নেই। তারা যদি আবেদন করেন, তাহলে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে পারব। প্রয়োজনে তাদের চিকিৎসা করানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।