বাড়তি আমদানিতেও সিলিন্ডার গ্যাসে সংকট প্রকাশিত: ৪:৩২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২৬ গত বছর একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশেরও বেশি আমদানি বাড়লেও বাজারে বোতলজাত এলপিজির সংকট কাটছে না। পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি থাকায় ভোক্তাপর্যায়ে বেড়েছে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার। পাশাপাশি রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাত। ভারত মহাসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানি করা এলপিজির চালান আসা বিলম্বিত হওয়ায় বাজার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিযোগ রয়েছে, সরবরাহে ঘাটতি থাকার সুযোগে ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটররা ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৫০-২০০ টাকা বেশিতে বিক্রি করছেন। জানা যায়, আমাদের দেশে গৃহস্থালি বাদেও শিল্প-কারখানা ও যানবাহনে ন্যাচারাল (প্রাকৃতিক) ও পেট্রোলিয়াম দুই ধরনের গ্যাস ব্যবহার করা হয়। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি (লিকুফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) পাইপলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্প, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, চা-বাগান, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও গৃহস্থালিতে সরবরাহ করা হয়। পুরো কর্মযজ্ঞটি সম্পাদন করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। স্বাভাবিক সময়ে দেশি উৎস ও আমদানির মাধ্যমে পেট্রোবাংলা সরবরাহ দেয় তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। বর্তমানে ২২-২৩শ ঘনফুট সরবরাহ দেওয়ায় সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও চলছে গ্যাসের জন্য হাহাকার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা নিয়ন্ত্রণাধীন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুই হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করার সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। এর মধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দুই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ- ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) থেকে নিয়মিতভাবে সাড়ে ৯শ থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। কিন্তু গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে ওই টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সারাদেশে পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। পরে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি মেরামত করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহে বিপত্তির কারণে ভাসমান টার্মিনালগুলো দিয়ে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে সারাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়। বাধাগ্রস্ত হয় শত শত শিল্প-কারখানার উৎপাদন। গৃহস্থালিতে পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় ২০১৫ সালের পর থেকে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়িতে সিলিন্ডারে এলপিজি ব্যবহার হয়ে আসছে। পাশাপাশি যেসব ভোক্তা পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করে আসছেন, নিয়মিত লাইন গ্যাস না পেয়ে তারাও বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করছেন। এতে হঠাৎ করে ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এলপিজি ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এ বাড়তি চাপ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধামরাহ থেকে এলপিজি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বড় আমদানিকারকদের হাতেও এলপিজি নেই। জাহাজ না আসায় এখন আমরা কোনো প্রোডাক্ট পাচ্ছি না। কারণ আমাদের তেমন স্টোরেজ থাকে না।-চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এলপিজি ব্যবসায় উদ্যোক্তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। আমরা ফ্র্যাঞ্চাইজিরা বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে, যাদের তিন হাজার টন স্টোরেজের টার্মিনাল আছে, তাদের কাছ থেকে নিয়ে বোটলিং করে বাজারজাত করি।’ আগে ওমান, দুবাই, কাতার থেকে এলপিজি আসতো জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন সেগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। সম্প্রতি ভারতের ধামরাহ বন্দরে এলপিজি স্টোরেজ করেছে বড় বড় সাপ্লায়ার। ধামরাহ থেকে বাংলাদেশে বেশিরভাগ এলপিজি আসছে।’ তিনি বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধামরাহ থেকে এলপিজি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বড় আমদানিকারকদের হাতেও এলপিজি নেই। জাহাজ না আসায় এখন আমরা কোনো প্রোডাক্ট পাচ্ছি না। কারণ আমাদের তেমন স্টোরেজ থাকে না।’ সান গ্যাস লিমিটেডের এরিয়া হেড একরামুল হক জুয়েল জাগো নিউজকে বলেন, ‘এলপিজি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। সমুদ্রে নাকি প্রচুর ঢেউ। যে কারণে জাহাজ আসতে পারছে না।’ এখন জাহাজ আসতে না পারায় আমরাও সরবরাহ দিতে পারছি না। আগে সবার কাছে গ্যাস সহজলভ্য ছিল। এখন কমবেশি সবার সংকট রয়েছে। এখন মূল আমদানিকারক কিংবা বোটলাররা দাম বাড়াচ্ছে না। বাজারে সরবরাহ কম থাকার সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটর।-সান গ্যাস লিমিটেডের এরিয়া হেড একরামুল হক জুয়েল তিনি বলেন, ‘ভারতের ধামরাহ বন্দরে বড় ট্যাংকার জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে লোড-আনলোড হয়। এখন জাহাজ আসতে না পারায় আমরাও সরবরাহ দিতে পারছি না। আগে সবার কাছে গ্যাস সহজলভ্য ছিল। এখন কমবেশি সবার সংকট রয়েছে। এখন মূল আমদানিকারক কিংবা বোটলাররা দাম বাড়াচ্ছে না। বাজারে সরবরাহ কম থাকার সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটর।’ তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘বর্তমানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ দাম ১৫৯৮ টাকা। কিন্তু কিছু ডিলার ১৭০০-১৭৫০ টাকায় বিক্রি করছে।’ গত ২ আগস্ট বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। আগের মাসে ছিল ১ হাজার ৫২৮ টাকা। এতে এ মাসে প্রতি সিলিন্ডারে ৭০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজিএল থেকে সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারণের মূল ভিত্তি হলো সৌদি আরামকো ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের চুক্তিমূল্য বা সৌদি সিপি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এই সৌদি সিপির ওপর ভিত্তি করে দেশের বাজারে এলপিজির ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য সমন্বয় করে। সৌদি আরামকোর ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে প্রোপেন ছিল প্রতিটন ৫৮০ ডলার এবং বিউটেন ৬০০ ডলার। আগস্ট মাসে প্রতিটনে ৪০ ডলার করে বেড়েছে। আগস্ট মাসে সৌদি সিপি ছিল প্রোপেন ৬২০ ডলার এবং বিউটেন ৬৪০ ডলার। বিইআরসির নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি উদ্যোক্তারা এলপিজিতে ৩৫ শতাংশ প্রোপেন এবং ৬৫ শতাংশ বিউটেনের মিশ্রণ করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি ২০২৬ সালে ২৫ শতাংশের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত এলপিজির উপাদান বিউটেন ও প্রোপেন আমদানি হয় ৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৫৬ টন। ২০২৬ সালের একই সময়ে আমদানি করা হয়েছে ১১ লাখ ৪১ হাজার ৭৮৪ টন। এতে আগের বছরের তুলনায় একই সময়ে ৩ লাখ ৬ হাজার ৫২৮ টন বেশি এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ১ জুলাই থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৫৩ দিনে আমদানি করা হয়েছে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ১২৩ টন এলপিজি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৫ হাজার ৪৫৩ টন আমদানি করেছে বিএম এনার্জি, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৯ হাজার ৮৮১ টন আমদানি করেছে যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ ৪৬ হাজার ২৭ টন আমদানি করেছে ইউনাইটেড আইগ্যাস। এছাড়াও ওমেরা পেট্রোলিয়াম ৩৬ হাজার ৪০৫ টন, মেঘনা ফ্রেশ এলপি ৩৪ হাজার ১০৭ টন, সান গ্যাস ৩১ হাজার ৩৪৫ টন, পেট্রোম্যাক্স ২৭ হাজার ৪০৪ টন, ডেল্টা ১৫ হাজার ১ টন, টিএমএসএস ১১ হাজার ৭৫৪ টন, সেনা কল্যাণ সংস্থা (এসকেএস) ৭ হাজার ৫০২ টন, জেএমআই ৬ হাজার ৭০১ টন এবং বসুন্ধরা গ্রুপ ৬ হাজার ৬৫১ টন এলপিজি আমদানি করেছে। এখনো সংকট নেই। তবে ভারত মহাসাগরে সাইক্লোন পরিস্থিতির কারণে আমাদের জাহাজ আসতে পারছে না। আমাদের একটি জাহাজ ২০ আগস্ট আসার কথা ছিল। সেটি আসবে ২৫ তারিখ। প্রায় সব আমদানিকারকের একই অবস্থা। তবে আপাতত সরবরাহে ঘাটতি নেই।-বিএম এনার্জির নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান বিএম এনার্জির নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখনো সংকট নেই। তবে ভারত মহাসাগরে সাইক্লোন পরিস্থিতির কারণে আমাদের জাহাজ আসতে পারছে না। আমাদের একটি জাহাজ ২০ আগস্ট আসার কথা ছিল। সেটি আসবে ২৫ তারিখ। প্রায় সব আমদানিকারকের একই অবস্থা। তবে আপাতত সরবরাহে ঘাটতি নেই।’ যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজারে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। একটি জাহাজ আসছে। এতে কিছুটা লাঘব হবে বলে আশা করা যায়। জাহাজটিতে ৩-৪ আমদানিকারকের ২৪ হাজার টনের মতো এলপিজি রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রোডাক্ট লোড হতে বিলম্ব হচ্ছে। এতে শিডিউল অনুযায়ী জাহাজ আসছে না। এজন্য সাপ্লাই চেইনে কিছুটা সংকট হয়েছে।’ বাংলাদেশে এলপিজি খাতের উদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (লোয়াব) সভাপতি ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্টোরেজ ও সরবরাহে কোনো সমস্যা নেই। পাইপলাইনের গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় অনেক ভোক্তা এখন এলপিজি ব্যবহার করছে। আমাদের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। কারণ আমরা কমিটমেন্ট রক্ষা করি। আশা করি সামনেও কোনো সংকট থাকবে না।’ SHARES অর্থনীতি বিষয়: বাড়তি আমদানিতবাড়তি আমদানিতেও সিলিন্ডার গ্যাসে সংকটসিলিন্ডার গ্যাসে সংকট