প্রতিবাদের ভাষা অশ্লীল হবে কেন?

প্রকাশিত: ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, এ ধরনের আচরণ কোনো সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না। সংসদে ভিন্নমত, তর্ক-বিতর্ক, হইচই থাকবে, কিন্তু অকথ্য গালাগালি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

সংসদে নিজের মতামত প্রকাশের পূর্ণ ক্ষমতা আছে একজন সংসদ সদস্যের, আছে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ। একজন সংসদ সদস্য যেহেতু জনপ্রতিনিধি, তাই কথা বলার সময় তাঁদের মাননীয় সংসদ সদস্য বলে সম্বোধন করা হয়। এমনকি স্পিকার পর্যন্ত সেভাবেই কথা বলেন ও সম্বোধন করেন।

সেই সংসদে যখন একজন সংসদ সদস্যকে মত প্রকাশের দায়ে অকথ্য ভাষায় গালাগালির শিকার হতে হয়, তখন বুঝতে হবে সব ক্ষেত্রেই আমাদের সংস্কৃতির মান নিম্নমুখী। অশ্লীল গালাগালি এখন গৃহ ও রাজপথ থেকে সংসদে পৌঁছে গেছে।

বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হিংস্র ও অশ্লীল ভাষার প্রচার একদিকে যেমন বাংলা ভাষাকে অসম্মান করছে, অন্যদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করছে। নোংরা ভাষা রাজনীতিকে নোংরা করে, বিভাজন সৃষ্টি করে এবং মানুষের মূল্যবোধ নষ্ট করে। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব ভাষা সন্ত্রাস ও ভাষা ব্যবহারে অশ্লীলতার হাত থেকে মুক্ত হতে চাই।

ভাব, ভালোবাসা, রাগ, অভিমান, ক্ষোভ—সবকিছু প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। ব্যক্তিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে আমরা অনেকেই এখন যে ভাষা ব্যবহার করছি, সেই ভাষার গুণগত মান ক্রমশ নিচের দিকে নামছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক স্লোগান, দলের অভ্যন্তরীণ বক্তৃতা এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত হানার জন্য যেভাবে ভাষার ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে ভাষার সৌন্দর্য ও শালীনতা নেই বললেই চলে। সুস্থ সমালোচনার জায়গায় ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুৎসিত ইঙ্গিত এবং গালিগালাজ যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

একটা সময় যে শব্দ বা বাক্যকে আমরা সমাজের নিচু মানুষের ব্যবহৃত ভাষা বলে ভাবতাম, তাই এখন শোভা পাচ্ছে আমাদের এক শ্রেণির ছাত্রছাত্রী ও তরুণ নেতাদের মুখে, মিছিলে, দুই পক্ষের কোন্দলে, স্লোগানে, এমনকি রাজনৈতিক আড্ডায়।

কলেজছাত্র সিফাত আবদুল্লাহ তাঁর বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে লাইভ ভিডিও প্রকাশ করেছেন কিছুদিন আগে, সেই ভিডিওর ভাষা এতটাই অশ্লীল ও অশ্রাব্য ছিল, যা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করাটাই একধরনের অপরাধ বলে মনে হয়।
সিফাত সেখানে এই কদর্য ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারের বিরুদ্ধে। যে শব্দ প্রয়োগ করে অন্য যে কাউকে গালি দেওয়াটা অপরাধ, সেখানে তিনি এই ভাষা ব্যবহার করেছেন সরকারপ্রধানের উদ্দেশ্যে।

অত্যন্ত অশালীন ও কটূক্তিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে সমালোচনা করার অধিকার কারও নাই, থাকা উচিতও নয়। এ ঘটনায় পুলিশ সিফাতকে গ্রেফতার করার পর কেউ কেউ বলছেন, প্রতিবাদ করাটা তাঁর অধিকার। পুলিশ কেন তাঁকে আটক করবে? প্রতিবাদ করে সিফাত কোনো অন্যায় করেননি।

অবশ্যই প্রতিবাদ করাটা মানুষের অধিকার। কোনো ইস্যুতে কেউ যদি বিক্ষুব্ধ হন, তিনি বা তাঁরা প্রতিবাদ করতেই পারেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা অশ্লীল হতে হবে কেন? প্রকাশ্যে কেউ কারও বিরুদ্ধে এত অশ্লীল মন্তব্য করতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না।

সিফাতের ভিডিও দেখে মনে হলো, ও যেন ইচ্ছা করেই প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারের উদ্দেশ্যে বাজে কথা বলছেন। এ ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রতিবাদ, স্লোগান এবং সামাজিক মাধ্যমে অশ্লীল ভাষার ব্যবহার নিয়ে।

এই আলোচনা উঠেছিল গত দুই-আড়াই বছর আগেই, যখন এ দেশের তরুণ-তরুণীদের একটা অংশ বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে স্লোগান রচনা করতে শুরু করে। তারা তাদের দাবি আদায়ের জন্য অসম্ভব নোংরা ও অর্থহীন বাক্য ব্যবহার করতে থাকে। সংগ্রামের ভাষাকে দেওয়া হলো এক অশ্লীল রূপ।

আমরা কি ভুলে গেছি যে গালি এবং সমালোচনা, বিশেষ করে রাজনৈতিক সমালোচনা, এক জিনিস নয়। রাজনৈতিক সমালোচনা করাটা জনগণের অধিকার, কিন্তু গালি দেওয়াটা নয়। এমনকি অন্যান্য ক্ষেত্রেও কারও অধিকার নেই তার অধীনস্থ কাউকে বাজে গালিগালাজ করে অপমান করার। সন্তানকেও গালি দেওয়াটা এখন অপরাধের পর্যায়েই পড়ে।

প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে অশ্লীল গালিগালাজের মাত্রাটা যেন লাগামছাড়া হয়ে গেছে। শুধু বিরক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রেই নয়, সব ক্ষেত্রেই। প্রতিবাদ বা অন্যান্য বার্তা প্রচারের জন্য খুব শক্তিশালী একটি মাধ্যম হচ্ছে দেয়াল লিখন ও চিকা মারা। অথচ ৫ আগস্টের পর দেয়াল লিখনগুলোও কেমন যেন বদলে গিয়েছিল।

আন্দোলনের ইস্যুগুলো কাজে লাগিয়ে কেউ যখন অশ্লীল স্লোগান প্রতিবাদের অস্ত্র বানায়, তখন তা আন্দোলনের নৈতিক মানকে খর্ব করে। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে চালু হয়েছে অশালীনতার চর্চা। সবচেয়ে বড় শঙ্কা, এই প্রবণতা কি সমাজে অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে? যে শব্দগুলো একসময় মানুষ এড়িয়ে চলত, কদর্য বলে মনে করত, সেই শব্দই এখন কিছু শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে গ্রহণীয় হতে চলেছে।

এর আগেও বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম হয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলন ছিল খুব বড় একটি আন্দোলন, অথচ সেই সময়ের সৃজনশীল স্লোগানে ছিল দাবি আদায়ের কথা।

আর ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী অন্যান্য আন্দোলনের স্লোগান, পোস্টার, দেয়ালচিত্র ছিল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের হাতিয়ার। বড় বড় কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা তখন স্লোগান লিখতেন, পোস্টার আঁকতেন। স্লোগানগুলো শুধু রাজনৈতিক দাবি ছিল না, ছিল মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামী মনোভাবের বার্তা।

এখন কথায়, লেখায় বা যে কোনো ক্ষেত্রে ভাষা প্রয়োগের ভেতর ঢুকেছে অশ্লীলতা। কোনো কারণ ছাড়াই বা তুচ্ছ কারণে অনলাইন ও অফলাইনে মানুষকে বাজে কথা বলা, অশ্লীল ইঙ্গিত করা ও অশ্লীল কাজ করে অপমান করতে একবারও ভাবছি না। এও একধরনের সন্ত্রাস, ভাষা সন্ত্রাস।

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে ভাষা ও আধেয় ব্যবহারের কোনো নীতি-নৈতিকতা নেই। যে কেউ যে কোনো ধরনের ম্যাটার আপলোড করতে পারেন। শ্লীল-অশ্লীল ভাষা বা ছবি ব্যবহারের ব্যাপারে নেই কোনো বিধিনিষেধ। সামাজিক মাধ্যমের এই যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে কুরুচিপূর্ণ ভাষার বিস্তার বেশি ঘটছে।

কারও কারও মধ্যে এভাবেই সস্তা জনপ্রিয়তা ও ভিউ পাওয়ার মানসিকতা লক্ষ করা যায়। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি লাইক, কমেন্ট বা ‘ভিউ’ পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রল, রিল, ভিডিও বা বিনোদনের নামে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করছে।

ফেক আইডি বা ছদ্মনাম ব্যবহার করে চলছে সাইবার বুলিং। যে কেউ অন্যকে আক্রমণাত্মক বা অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে পারে এবং করছে। কারণ এতে সরাসরি ধরা পড়ার ভয় থাকে না।

যুবসমাজ যখন ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অশ্লীলতাকে বেছে নেয়, শিশুরাও তখন সেইসব ভাষাকেই গ্রহণ করতে শেখে। মতবিরোধ হলে, যুক্তি দিয়ে কথা না বলে, অপর পক্ষকে বাজে ভাষা ব্যবহার করে মানসিকভাবে আঘাত বা অপমান করার ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে।

পত্রপত্রিকার বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নিউজ বা মতামত কলামের নিচে যেসব মন্তব্য করা হয়, তা দেখলে অবাক হতে হয়। বিশ্বাস করা যায় না, কোনো পড়াশোনা জানা মানুষ এত অশ্লীল মন্তব্য করতে পারে। মন্তব্যগুলো নিছক গালাগালি নয়, নারীর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মা-বোনকে নিয়ে কুৎসিত তুলনা।

শুধু গণমাধ্যমে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে নয়, অশ্লীলতার যে ঢেউ সামাজিকমাধ্যম ও মিছিলে ছড়িয়ে পড়েছে, তার প্রায় পুরোটাই নারীদেহকে কেন্দ্র করে ও নারীবিদ্বেষী। এই অপসংস্কৃতি থেকে আমাদের মুক্তি কবে, কীভাবে হবে জানি না। তবে জাতিগতভাবে যে আমরা ডুবে যাচ্ছি, তা স্পষ্ট।

যখন সমাজে ভাষা প্রয়োগের অশ্লীলতা, অন্যকে অপমান করার প্রবণতা, জীবনযাপনে বিলাসিতা, দুর্নীতি ও আদর্শের অভাব দেখা দেয়, তখন বুঝতে হবে এটি সমাজের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সমাজে যখন এমন অশ্লীল ভাষার ব্যবহার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন নারী নিজ থেকেই পিছিয়ে যেতে শুরু করেন। জুলাই আন্দোলনের পর নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে নারীদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্বাধীনতায় নেতিবাচক প্রভাব ও নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে।

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী প্রথম সারির নারীরা স্বীকার করেছেন যে, অনলাইন ও অফলাইনে নারীদের লক্ষ্য করে ট্রল, গালাগালি এবং সাইবার বুলিং বেড়েছে। সেই নারী নেতৃত্বের বড় একটি অংশ রাজপথ, সংগঠন, এমনকি জনপরিসর থেকেও অনেকটা সরে গেছেন; কিংবা নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

অশ্লীল ভাষা শুধুমাত্র বক্তৃতা বা স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি সমাজে সহিংস মনোভাব ও বিভাজনের কারণও হচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং দলীয় সংঘর্ষ তীব্র হচ্ছে।

বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হিংস্র ও অশ্লীল ভাষার প্রচার একদিকে যেমন বাংলা ভাষাকে অসম্মান করছে, অন্যদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করছে। নোংরা ভাষা রাজনীতিকে নোংরা করে, বিভাজন সৃষ্টি করে এবং মানুষের মূল্যবোধ নষ্ট করে। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব ভাষা সন্ত্রাস ও ভাষা ব্যবহারে অশ্লীলতার হাত থেকে মুক্ত হতে চাই।