যুক্তরাজ্য বনাম সোভিয়েত • স্নায়ুযুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অনন্য দৃষ্টান্ত ‘দ্য ক্যামব্রিজ ফাইভ’! প্রকাশিত: ৫:০৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ কিম ফিলবি, গাই বার্জেস, ডোনাল্ড ম্যাকলিন, অ্যান্থনি ব্লান্ট ও জন কেয়ার্নক্রস; পাঁচজনই ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে কেউ হয়েছিলেন কূটনীতিক, কেউ গোয়েন্দা কর্মকর্তা, আবার কেউ শিল্প-ইতিহাসের খ্যাতিমান গবেষক। কাজ করেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং গোয়েন্দা সংস্থা MI5 ও MI6-এর হয়ে। কিন্তু আসোলে তারা ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের নিযুক্ত শীর্ষ গুপ্তচর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পরবর্তী শীতল যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যুক্তরাজ্যের গোপন সব নথি সোভিয়েত গোয়েন্দাদের কাছে পাচার করায় চৌকস এই স্প্যাই রিং-কে ‘দ্য ক্যামব্রিজ ফাইভ’ নামে ডাকা হয়। গুপ্তচরবৃত্তিকে তারা এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যা ইতিহাসে এক বিষ্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপণ করেছে। যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা MI5-এর ভাষায়, তারা ছিলেন সোভিয়েত গোয়েন্দাদের নিয়োগ করা সবচেয়ে সফল ব্রিটিশ এজেন্টদের একটি দল। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পথচলা শুরু ১৯৩০এর দশক। ইউরোপে তখন ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছে; অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এমন সময় যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু তরুণ বামপন্থী ও কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এই মনোভাবকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগায় সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দারা। MI5-এর প্রকাশিত ইতিহাস অনুযায়ী, সোভিয়েত গোয়েন্দারা মেধাবী তরুণ কমিউনিস্ট বা কমিউনিজম-সমর্থকদের বেছে নিয়ে তাদের প্রথমে প্রকাশ্য রাজনৈতিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যেতে উৎসাহিত করত। এর প্রধান কারণ-তাদেরকে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করানো। ক্যামব্রিজ ফাইভ ছিল এই কৌশলের সবচেয়ে সফল উদাহরণ। তবে ‘ফাইভ’ নামটি শুনে তাদের একটি একক, সুসংগঠিত গুপ্তচর দলের মতো মনে হলেও বাস্তবে তারা সবসময় একসঙ্গে কাজ করতেন না। ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল কিন্তু প্রত্যেকে অনেকটা স্বাধীনভাবে সোভিয়েত গোয়েন্দাদের হয়ে কাজ করেছেন। পাঁচজনের পরিচিতি কিম ফিলবি: পাঁচজনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত ফিলবি যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা MI6-এর হয়ে কাজ করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উচ্চপর্যায়ের গোপন তথ্যের নাগাল পান। ১৯৯০ সালে কিম ফিলবিকে স্মরণ করে প্রকাশিত সোভিয়েত ডাকটিকিট। সূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স তার গোয়েন্দা পরিচয় দীর্ঘদিন গোপন ছিল। পরে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যান। গাই বার্জেস: তিনি বিবিসি, পররাষ্ট্র দপ্তর এবং MI6-সহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সোভিয়েতদের কাছে পৌঁছে দেন। ১৯৬৮ সালে তোলা গাই বার্জেসের ছবি। সূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স ১৯৫১ সালে ঘটনা জানাজানি হওয়ার আগেই ডোনাল্ড ম্যাকলিনের সঙ্গে ব্রিটেন থেকে পালিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে যান। ডোনাল্ড ম্যাকলিন: ব্রিটিশ কূটনীতিক হিসেবে তার হাতে ছিল গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় তথ্য। তার মাধ্যমে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক আলোচনার সংবেদনশীল তথ্য মস্কোতে পৌঁছে যেত। ১৯৬৮ সালে তোলা কূটনীতিক ও সোভিয়েত গুপ্তচর ডোনাল্ড ম্যাকলিনের ছবি। সূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা তথ্যের সূত্র ধরে তার ওপর সন্দেহ ঘনীভূত হলে ১৯৫১ সালে গাই বার্জেসের সঙ্গে তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান। মূলত মদ্যপ ম্যাকলিনকে রক্ষা করতেই গাই বার্জেস তাকে নিয়ে ইউক্রেন হয়ে সোভিয়েন ইউনিয়নে চলে যান। অ্যান্থনি ব্লান্ট: অন্যদের তুলনায় তার জীবন ছিল আরও বিস্ময়কর। তিনি ছিলেন খ্যাতিমান শিল্প-ইতিহাসবিদ এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের শিল্পকর্মের তত্ত্বাবধায়ক—Surveyor of the King’s Pictures, পরে Surveyor of the Queen’s Pictures। স্যার অ্যান্থনি ব্লান্ট—শিল্প-ইতিহাসবিদ ও সোভিয়েত গুপ্তচর। সূত্র: এমপিআর নিউজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি MI5-এ কাজ করতেন এবং সেই সময়ও সোভিয়েতদের কাছে গোপন তথ্য সরবরাহ করেন। তবে, অন্যদের গুপ্তচর বৃত্তির তথ্য প্রকাশ্যে আসলেও এক চুক্তির মাধ্যমে তার তথ্য গোপন রাখে ব্রিটিশ রাজ পরিবার। পরে আশির দশকে ম্যার্গারেট থ্যাচার তাকে গুপ্তচর হিসেবে সামনে নিয়ে আসেন। এরপর নাইটহুড প্রত্যাহার করা হয়। জন কেয়ার্নক্রস: তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর, ট্রেজারি, Bletchley Park-এর Government Code and Cypher School এবং MI6-এ কাজ করেন। ফলে, ব্রিটিশ কূটনীতি ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য তার নাগালে ছিল। ১৯৬৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, ১৯৩৬ সালে সোভিয়েত গোয়েন্দারা তাকে নিয়োগ করেছিল। ক্যামব্রিজ গুপ্তচর চক্রের পঞ্চম সদস্য জন কেয়ার্নক্রস। সূত্র: ক্যামব্রিজ নিউজ ক্যামব্রিজ ফাইভের কর্মকাণ্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্যামব্রিজ ফাইভের কর্মকাণ্ড আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গোয়েন্দা সংস্থা MI5-এর ইতিহাসে বলা হয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে নয় বরং যুক্তরাজ্যের মিত্র ও পশ্চিমা শক্তির অভ্যন্তরীণ তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এই এজেন্টরা মস্কোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছিল। অ্যান্থনি ব্লান্টের মাধ্যমে সোভিয়েতরা বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য পায়। তিনি ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তাকেও সাব-এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। MI5-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৩ সালে সোভিয়েত গোয়েন্দা সদর দপ্তর এত ভালো মানের তথ্য পেয়ে সন্দেহ করেছিল—এটি হয়তো যুক্তরাজ্যের পরিচালিত কোনো ‘ডাবল ক্রস’ অভিযান। পরে তারা নিশ্চিত হয় যে, তথ্যগুলো সত্যিই ব্রিটিশ ব্যবস্থার ভেতর থেকে আসছে। ১৯৫১: ভাঙনের শুরু ক্যামব্রিজ ফাইভের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসার পথে সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ১৯৫১ সালে। ডোনাল্ড ম্যাকলিনের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়তে থাকে। এরপর গাই বার্জেস তাকে সতর্ক করেন। দুজনই যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত মস্কোয় পৌঁছান। তাদের পালানোর ঘটনায় ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র সন্দেহ তৈরি হয়। ফিলবিও তখন সন্দেহের আওতায় আসেন। ফিলবির পলায়ন ফিলবি দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ১৯৫১ সালের পর তার ওপর সন্দেহ তৈরি হলেও তিনি তা সামাল দিতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৩ সালে তিনি বৈরুতে নিখোঁজ হন এবং পরে তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নে দেখা গেছে। ফিলবির পলায়ন ক্যামব্রিজ ফাইভ কেলেঙ্কারিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক শোরগোলের সৃষ্ঠি করে। কারণ একজন ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা কীভাবে এত বছর ধরে সোভিয়েত এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে পেরেছিলেন-এ প্রশ্ন যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করে। ব্লান্টের স্বীকারোক্তি অ্যান্থনি ব্লান্টের ঘটনা ছিল ভিন্ন। ১৯৬৪ সালে তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি স্বীকার করেন যে, ব্ল্যান্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন। বিনিময়ে তকে তখন বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি এবং তার পরিচয় গোপন রাখা হয়। তিনি আরও বহু বছর যুক্তরাহ্যে রাজপরিবারের শিল্পসম্পদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কীভাবে দশকের পর দশক ধরাছোয়ার বাইরে? ক্যামব্রিজ ফাইভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল তাদের সামাজিক ও শিক্ষাগত অবস্থান। তারা ব্রিটিশ সমাজের প্রভাবশালী ও অভিজাত বৃত্তে চলাফেরা করতেন। ফলে তাদের ওপর সন্দেহ তৈরি হয়নি। তাছাড়া প্রত্যেকে আলাদা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। কেউ কূটনীতিতে, কেউ গোয়েন্দা সংস্থায়, কেউ সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে, আবার কেউ রাজপরিবারের শিল্পসম্পদের দায়িত্বে ছিলেন। এই বিচ্ছিন্ন অবস্থান তাদের কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে। নতুন নথিতে পুরোনো রহস্যের নতুন তথ্য ক্যামব্রিজ ফাইভ নিয়ে গবেষণা এখনও শেষ হয়নি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভস ১০০টির বেশি MI5 নথি প্রকাশ করে, যার মধ্যে ফিলবি, ব্লান্ট ও কেয়ার্নক্রসের জিজ্ঞাসাবাদ, নজরদারি প্রতিবেদন, টেলিফোনে আড়িপাতা তথ্য ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ নথি রয়েছে। ক্যামব্রিজ ফাইভ শুধু পাঁচজন গুপ্তচরের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে একটি গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপত্তা-ব্যর্থতা, আদর্শগত রাজনীতির প্রভাব এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুপ্রবেশের ইতিহাস। ১৯৩০-এর দশকে ক্যামব্রিজের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হওয়া রাজনৈতিক যোগাযোগ কীভাবে কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রনীতি, গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও সামরিক তথ্যের কেন্দ্রে পৌঁছে যায়-ক্যামব্রিজ ফাইভ তারই এক বিরল উদাহরণ। ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভসের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশকের শুরু নাগাদ এই পাঁচজন যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক এখনও চলমান। Download PhotoCard SHARES ফিচার বিষয়: যুক্তরাজ্য বনাম সোভিয়েত • স্নায়ুযুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অনন্য দৃষ্টান্ত ‘দ্য ক্যামব্রিজ ফাইভ’!