অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে জর্জিয়ার ঐতিহাসিক কাঠের মসজিদগুলো প্রকাশিত: ৩:৩৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬ দক্ষিণ-পশ্চিম জর্জিয়ার তুরস্ক সীমান্তবর্তী স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র আদজারা। অর্থোডক্স খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ জর্জিয়ায় আদজারা কিছুটা ব্যতিক্রমী অঞ্চল। প্রতিবেশী আর্মেনিয়ার পর ককেশাসের এই দেশটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কয়েক দশকে অর্থোডক্স চার্চ জর্জিয়ার জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৮২ শতাংশ মানুষ এই ধর্মের অনুসারী। তবে চার শতাব্দী আগে আদজারায় উসমানীয় সাম্রাজ্যের সময় ইসলামের আগমন ঘটে। এখনো অঞ্চলটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মুসলিম। আদজারার পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে আছে ৫০টিরও বেশি ঐতিহাসিক কাঠের মসজিদ। ১৮১৭ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে এসব মসজিদ নির্মিত হয়। কিন্তু একের পর এক ঐতিহাসিক কাঠের মসজিদগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। কয়েকটি এখনো ভালোভাবে সংরক্ষিত এবং নিয়মিত নামাজ আদায়ের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে অনেক মসজিদ জরুরি সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছ। দেশটির উপেক্ষিত ইসলামী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশ সংরক্ষণে কাজ করছেন স্থানীয় অধিকারকর্মীরা। আদজারার ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর একটি গুলেবি মসজিদ। চারপাশে ক্ষয়ের ছাপ থাকলেও মসজিদটির নির্মাণশৈলী এখনো চোখে পড়ে। অলংকৃত অভ্যন্তরের বিবর্ণ লাল-নীল রং এবং মিম্বরে খোদাই করা সূক্ষ্ম নকশা সেই কারুকার্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। অধিকারকর্মীদের মতে, এসব মসজিদের প্রতি অবহেলা জর্জিয়ায় মুসলিমদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করার বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরে। তরুণ অধিকারকর্মী লিয়া দেকানাদজে বলেন, আমার হৃদয় ভেঙে যায় এটা ভেবে যে, আমার জীবদ্দশাতেই হয়তো গুলেবি মসজিদ হারিয়ে যাওয়া দেখতে হবে। পাঁচ বছর আগে তিনি প্রথম গুলেবি মসজিদে এসেছিলেন। এত অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মসজিদটির চোখে পড়ার মতো অবনতি লক্ষ্য করেছেন। একসময় প্রাণবন্ত ফিরোজা রঙের দরজাটি এখন প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতায় বিবর্ণ হয়ে গেছে। আদজারার পাহাড়ি ছোট শহর খুলোতে নিজের কার্যালয়ে এক কাপ চায়ের সঙ্গে স্থানীয় মুফতি আসলান আবাশিদজে দ্য নিউ আরবকে এ অঞ্চলের ইতিহাসের নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সে সময় উসমানীয়দের প্রভাব থাকলেও মানুষ পরিবার নিয়ে বসবাস করত। এসব উপাসনালয় বা মসজিদ স্থানীয় জনগণের অর্থ ও সম্পদ দিয়েই নির্মিত হয়েছিল। বনভূমিতে সমৃদ্ধ পাহাড়ি এলাকায় সহজলভ্য কাঠ দিয়ে এসব মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। এগুলোর নকশায় ওই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ির বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। ফলে মসজিদগুলো আদজারার নিজস্ব স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি স্বতন্ত্র চরিত্র পেয়েছে। সোভিয়েত শাসনের শুরুর দিকে মসজিদ নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩০-এর দশকে ধর্মের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অভিযান জোরদার হলে ধর্মীয় স্থাপনাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি অনেক মসজিদের মিনারও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। মুফতি আবাশিদজে বলেন, এগুলো দোকান বা গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। অভ্যন্তরের নকশা আংশিকভাবে নষ্ট হলেও স্থাপনাগুলো ব্যবহারযোগ্য থাকায় মূল কাঠামো সংরক্ষিত ছিল। হুমকির মুখে ঐতিহ্য সোভিয়েত যুগের অবসানের পর কয়েকটি মসজিদে আবার ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু হয়। উদাহরণ হিসেবে খুলো এলাকার অন্যতম বড় গ্রাম ঘোরজোমি মসজিদের কথা বলা যায়। এটি স্থানীয় মুসলিমদের কেন্দ্রস্থল। যত্নে রাখা মসজিদটির ভেতরের অংশ যেন নানা রঙের ক্যালেইডোস্কোপ। তবে সোভিয়েত আমলের দমন-পীড়নে টিকে থাকা অনেক মসজিদ এখন অবহেলা ও অর্থ সংকটের মুখোমুখি। খুলো থেকে আসা গবেষক জিওর্গি রিঝভাদজে বলেন, এই মসজিদগুলো খুব দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। কাঠের তৈরি হওয়ায় এসব মসজিদ আবহাওয়ার প্রভাবে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আদজারার তুষারময় শীত ও আর্দ্র গ্রীষ্ম এসব স্থাপনার ওপর বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনে। অনেক মসজিদের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও পুরোনো হয়ে গেছে। এতে আরও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত বছর আগুনে ধ্বংস হয়েছে দুটি মসজিদ। আগুন লাগার সঠিক কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। তবে অন্তত একটি মসজিদের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। সংস্কারের ব্যয় অনেক বেশি। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পক্ষে এসব খরচ বহন করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। পাহাড়ধস ও সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের কারণে অনেক গ্রামে জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে। জীবিকার সন্ধানে অনেকে আঞ্চলিক রাজধানী বাতুমিতে চলে যাচ্ছেন। জনসংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সম্পদ ও অর্থের পরিমাণও কমছে। গত বছর আগুনে পুড়ে যাওয়া সাতিসখুরি মসজিদটি পুনর্নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া আরও দুটি মসজিদের সংস্কারকাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। তবে রিঝভাদজে ও দেকানাদজে দীর্ঘদিন ধরে কাজের ধীরগতিতে হতাশ। মহামারির সময় তারা ওই অঞ্চলের একদল বন্ধুকে নিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় একটি বেসরকারি সংস্থা গড়ে তোলেন। সলিডারিটি কমিউনিটি নামে পরিচিত সংগঠনটি ইসলামী ঐতিহ্যের বিভিন্ন স্থাপনার মানচিত্র তৈরি করে, সেগুলোর অবস্থা যাচাই করতে জরিপ চালায় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে স্থানীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। রিঝভাদজে বলেন, আমাদের প্রচারণার আগে এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু লেখা হয়নি। রাজধানী তিবিলিসিতে বসবাসকারী মানুষদের অনেকেই এই অঞ্চলের অনন্য স্থাপত্য ঐতিহ্য সম্পর্কে খুব কম জানতেন, এমনকি অনেকের কোনো ধারণাই ছিল না। সংগঠনটির আরও বড় একটি লক্ষ্য ছিল—জর্জিয়ায় ইতিহাস বলার ধরন এবং জাতীয় ইতিহাসে কার বয়ান স্থান পাবে, তা পরিবর্তন করা। দেকানাদজে বলেন, ইসলামকে বিদেশি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মানুষ ইসলামকে প্রায় আজারবাইজান বা চেচনিয়া থেকে জর্জিয়ায় আসা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। অথচ আদজারার জর্জিয়ান মুসলিমদের প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। আরও ক্ষতিকর বিষয় হলো, দেশটির একটি ছোট কিন্তু সোচ্চার উগ্র জাতীয়তাবাদী অংশ এমন বয়ান প্রচার করে, যেখানে একই সঙ্গে মুসলিম ও জর্জিয়ান হওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়, এমনকি সরাসরি তা অস্বীকারও করা হয়। রিঝভাদজের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও একই সমস্যা রয়েছে। জর্জিয়ার সংবিধানে ধর্মীয় বহুত্ববাদ স্বীকৃত হলেও সরকারগুলোর এ বিষয়ে সম্পৃক্ততা এখনো খুবই সীমিত। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত এটি সংখ্যালঘুদের প্রতি সরকারের নীতির বড় একটি সমস্যা। বিশেষ করে জর্জিয়ান মুসলিমদের ক্ষেত্রে। কারণ জর্জিয়ার ইতিহাসে জর্জিয়ান মুসলিমরা যে সংস্কৃতি ও অবদান রেখেছেন, তা তুলে ধরতে সরকার বিশেষ কিছু করে না। প্রান্তিক অবস্থানে মুসলিমরা ইতিবাচক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বয়ান না থাকায় আধুনিক জর্জিয়ায় মুসলিমরা এবং তাদের নানা সমস্যা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। দ্য নিউ আরব যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের সবার কাছেই একটি উদাহরণ বিশেষভাবে উঠে এসেছে। সেটি হলো আদজারার আঞ্চলিক রাজধানী এবং জর্জিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বাতুমি। সেখানে মুসল্লিদের প্রায়ই রাস্তায় নামাজ পড়তে হয়। শহরটিতে মাত্র একটি মসজিদ রয়েছে। শহরের জনসংখ্যার তুলনায় এর ধারণক্ষমতা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য হওয়ায় শহরটিতে মসজিদের প্রয়োজন আরও বেশি। নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। গত বছর ধর্মীয় বহুত্ববাদের পক্ষে কাজ করা সলিডারিটি কমিউনিটির কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। জর্জিয়া রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত হওয়ার পর তারা তাদের কার্যক্রম স্থগিত করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আলোচনা স্থগিত রাখার সরকারের ঘোষণা থেকে জর্জিয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে প্রতিদিন বিক্ষোভ চলছে। এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক জনসমাগমের বিক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। তবে এর আগেই বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী সংগঠনগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপের লক্ষ্যে আনা ফরেন এজেন্ট আইনের কারণে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সরকারের দাবি, এসব আইন জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে করা হয়েছে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এগুলোকে নাগরিক সমাজের ওপর দমন-পীড়ন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আইনগুলো বারবার আরও কঠোর করা হয়েছে। ফলে অনেক নাগরিক সংগঠন তাদের কার্যক্রম চালাতে পারছে না। বিদেশি অর্থায়নের সুযোগ না থাকা এবং ফরেন এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে এর সঙ্গে যুক্ত সামাজিক কলঙ্ক ও বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে অনিচ্ছুক হওয়ায় সলিডারিটি কমিউনিটিকেও তাদের কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়েছে। উচ্চভূমির গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করা একমাত্র বেসরকারি সংস্থা ছিল এটি। গুলেবি মসজিদ থেকে নেমে যাওয়া দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটার সময় দেকানাদজে বলেন, আমরা যখন তাদের পক্ষে কথা বলেছি, তখন মসজিদগুলো জনপরিসরের আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু এখন দেশে চলমান অত্যন্ত কঠিন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এগুলো নিয়ে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে এগুলো মানুষ ভুলে যাবে—এ নিয়ে আমি সত্যিই ভয় পাচ্ছি। গুলেবি মসজিদ বহুদিন ধরে আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। বর্তমানে গ্রামটির অধিকাংশ বাসিন্দাই খ্রিস্টান। তবে দেকানাদজে মনে করেন, বর্তমানে এসব ভবন কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি বিবেচ্য নয়। এগুলো স্থানীয় সম্প্রদায় এবং পুরো দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত। দেকানাদজে বলেন, এসব মসজিদ আমাকে মুগ্ধ করে। কারণ এখানে আমি মানুষের সম্মিলিত শ্রমের নিদর্শন দেখতে পাই। আমি এটাও জানি, এসব মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না; বরং সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে একত্রিত হতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি বলেন, এসব সামষ্টিক ঐতিহ্যের প্রতি উদাসীনতাই আমার হৃদয় ভেঙে দেয় এবং হতাশ করে। একজন মুসলিম হিসেবে নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়ে উদ্বিগ্ন একজন মানুষ হিসেবে বিষয়টি আমাকে কষ্ট দেয়। এই অঞ্চল হয়তো আগের মতো সরাসরি দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে না। কিন্তু অবহেলাও কম ক্ষতিকর নয়। আর বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এসব স্থাপনা বাস্তবে সংরক্ষণ এবং জর্জিয়ায় মুসলিম ঐতিহ্য ও জীবন্ত সংস্কৃতিকে তুলে ধরে এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক বয়ান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও কাজ করার সুযোগ—দুটিই এখন কমে যাচ্ছে। Download PhotoCard SHARES ইসলাম বিষয়: অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে জর্জিয়ার ঐতিহাসিক কাঠের মসজিদগুলো