ছাগলের রাখালের আবিষ্কৃত কফি একসময় মুসলিমদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ

প্রকাশিত: ৪:২৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২৬

সকালের ঘুমঘুম চোখে এক কাপ গরম কফি। ধোঁয়া ওঠা সেই কাপ হাতে নিলেই যেন ব্যস্ত দিনটা একটু সহজ হয়ে আসে। কিন্তু এই পরিচিত পানীয়টির ইতিহাস মোটেও সোজাসাপ্টা নয়। কফির জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত ইথিওপিয়ার পাহাড় থেকে শুরু করে ইয়েমেনের সুফি সাধকদের রাতজাগা প্রার্থনা, মক্কার নিষেধাজ্ঞা, আবার সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া কফির ইতিহাসে আছে কিংবদন্তি, ধর্মীয় বিতর্ক, রাজনীতি এবং বাণিজ্যের দীর্ঘ গল্প। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, যে মুসলিম সমাজ কফিকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল, সেই সমাজেরই কিছু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ একসময় এই পানীয়কে নিষিদ্ধ করেছিলেন।

ছাগলের রাখাল কি সত্যিই কফি আবিষ্কার করেছিলেন?

প্রথমে আসি কফির আবিষ্কার নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটির কেন্দ্রে আছেন ইথিওপিয়ার এক ছাগলপালক কালদির ঘটনায়। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, তিনি লক্ষ্য করেন, তার ছাগলগুলো একটি নির্দিষ্ট গাছের লাল ফল খাওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে এবং রাতে ঘুমাচ্ছে না। বিষয়টি তিনি স্থানীয় সন্ন্যাসীদের জানান। পরে সেই ফলের বীজ থেকে পানীয় তৈরি করে তারা দীর্ঘসময় জেগে প্রার্থনা করতে পারতেন এমন গল্পই ছড়িয়ে পড়ে।

‘এক মুসলিম রাখাল কফি আবিষ্কার করেছিলেন’ এটি লোককথা বা কিংবদন্তি হিসেবে বিবেচিত

‘এক মুসলিম রাখাল কফি আবিষ্কার করেছিলেন’ এটি লোককথা বা কিংবদন্তি হিসেবে বিবেচিত

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আছে। কালদি সত্যিই কফি আবিষ্কার করেছিলেন এমন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এটি লোককথা বা কিংবদন্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এমনকি কালদি মুসলিম ছিলেন এমন দাবিরও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বরং ইথিওপিয়াকে কফি আরবিকার প্রাকৃতিক আবাসভূমি বা জন্মভূমি হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ ‘এক মুসলিম রাখাল কফি আবিষ্কার করেছিলেন’ এই পরিচিত গল্পটি ইতিহাস হিসেবে লেখা ঠিক হবে না।

কফির আসল উত্থান ইয়েমেনে

কফি গাছের উৎপত্তি ইথিওপিয়ায় হলেও কফিকে পানীয় হিসেবে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ইয়েমেনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে ইয়েমেনে কফির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সুফি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো রাতভর জিকির, প্রার্থনা ও ধর্মীয় অধ্যয়নের সময় জেগে থাকতে কফি পান করতেন। ধীরে ধীরে কফি শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পানীয় থাকেনি। এটি সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। ইয়েমেন থেকে কফি পৌঁছে যায় মক্কা, কায়রোসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে মক্কা ও কায়রোতে কফি সংস্কৃতির বিকাশের প্রমাণ পাওয়া যায়।

তারপরই এলো নিষেধাজ্ঞা!

কফি জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বিতর্ক। প্রশ্ন ওঠে কফি কি ইসলামী আইনে বৈধ, নাকি এর উত্তেজক প্রভাব একে নিষিদ্ধ পানীয়ের পর্যায়ে ফেলে? ১৫১১ সালে মক্কায় এই বিতর্ক বড় আকার নেয়। সে সময় মক্কার বাজার ও জনজীবন তদারকির দায়িত্বে ছিলেন খাইর বেগ। তিনি কফিকে ঘিরে মানুষের জমায়েত এবং এর সম্ভাব্য সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় পণ্ডিত ও চিকিৎসকদের নিয়ে আলোচনা হয় এবং কফির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মক্কায় কফি বিক্রি ও পান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

 ধীরে ধীরে কফি শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পানীয় থাকেনি, এটি সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে

ধীরে ধীরে কফি শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পানীয় থাকেনি, এটি সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে

তবে এটিকে ‘মুসলিমদের জন্য কফি নিষিদ্ধ হয়েছিল’ বলে পুরো মুসলিম সমাজের ওপর সাধারণীকরণ করা ঠিক নয়। এটি ছিল নির্দিষ্ট সময় ও অঞ্চলে ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা। ইসলামি দুনিয়ার বিভিন্ন আলেমের মধ্যে কফি নিয়ে মতভেদও ছিল।

কেন কফিকে এত ভয়? এর পেছনে শুধু কফির স্বাদ বা ক্যাফেইন ছিল না। তখন কফি খাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছিল নতুন ধরনের সামাজিক আড্ডা-যাকে এখনকার ভাষায় বলা যেতে পারে কফিহাউস। সেখানে মানুষ গল্প করত, খেলাধুলা করত, আলোচনা করত। ফলে কফিহাউস অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক কথাবার্তার জায়গায় পরিণত হচ্ছিল।

কফির উত্তেজক প্রভাবকে কেউ কেউ মদের সঙ্গে তুলনা করতেন। আবার কফিহাউসে জমায়েত নিয়ে শাসকদের রাজনৈতিক উদ্বেগও তৈরি হয়েছিল। ফলে ধর্মীয় আপত্তির পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক আশঙ্কাও নিষেধাজ্ঞার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। তবে নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। উচ্চতর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে তা প্রত্যাহার করা হয় এবং কফি আবার ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও বিভিন্ন জায়গায় কফি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা ও বিতর্ক দেখা গেছে।

 কফি খাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছিল নতুন ধরনের সামাজিক আড্ডা-যাকে এখনকার ভাষায় বলা যেতে পারে কফিহাউস

কফি খাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছিল নতুন ধরনের সামাজিক আড্ডা-যাকে এখনকার ভাষায় বলা যেতে পারে কফিহাউস

কফির যাত্রা ঠেকানো যায়নি

এরপর কফির যাত্রা থামেনি। বরং মুসলিম বিশ্বের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক, তীর্থযাত্রী ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কফি ছড়িয়ে পড়ে উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে। ষোড়শ শতকে কফি ইয়েমেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপণ্যে পরিণত হয় এবং ইয়েমেনি বন্দর থেকে জেদ্দা ও কায়রোর বাজারে এর সরবরাহ গড়ে ওঠে।

অটোমান সাম্রাজ্যে পৌঁছে কফিহাউস আরও বড় সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পরে ইউরোপেও কফি ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে এটি ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় যে পানীয়কে মুসলিম বিশ্বের কিছু কর্তৃপক্ষ সন্দেহের চোখে দেখেছিল, সেটিই পরে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয় হয়ে দাঁড়ায়।

কফির যাত্রা ঠেকানো যায়নি

কফির যাত্রা ঠেকানো যায়নি

আজ তাই কফির কাপ হাতে নিয়ে শুধু ক্যাফেইনের কথা ভাবলে গল্পের অর্ধেকই জানা হয়। এর ভেতরে আছে ইথিওপিয়ার পাহাড়, ইয়েমেনের সুফি সাধকদের রাতজাগা প্রার্থনা, মক্কার ধর্মীয় বিতর্ক, কফিহাউসের আড্ডা আর শত শত বছরের বাণিজ্যপথ। আর সেই ছাগলপালক কালদি? তিনি ইতিহাসের নিশ্চিত চরিত্র নন, বরং কফির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক মনোমুগ্ধকর কিংবদন্তি। কফির প্রকৃত ইতিহাস হয়তো কোনো এক ব্যক্তির আবিষ্কারের গল্প নয়; বরং এক পানীয় কীভাবে মানুষের ধর্মীয় আচার, সামাজিক জীবন, ব্যবসা ও সংস্কৃতিকে বদলে দিল সেই দীর্ঘ যাত্রার গল্প।