সিগারেটের পিন থেকে ক্যাসিও ঘড়ি তৈরি: চার ভাইয়ের বিশ্বজয়ের গল্প

প্রকাশিত: ৪:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২৬

একটি ছোট ধাতব আংটি। তার ভেতরে সিগারেট আটকে রাখা যায়। আঙুলে পরা অবস্থাতেই সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটুকুও টেনে খাওয়া সম্ভব। আজকের দিনে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানে এই সামান্য আবিষ্কারই বদলে দিয়েছিল একটি পরিবারের ভাগ্য। আর সেই ছোট্ট আবিষ্কারের লাভ থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল এমন এক প্রযুক্তি সাম্রাজ্য যার নাম-ক্যাসিও।

১৯৪৬ সালে টোকিওর মিতাকায় ‘কাশিও সেইসাকুজো’ নামে ছোট একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন তাদাও কাশিও। শুরুতে কারখানাটি মূলত মাইক্রোস্কোপের যন্ত্রাংশ, গিয়ারসহ বিভিন্ন ধাতব পণ্য তৈরি করত। পরে এ ব্যবসায় যুক্ত হন তাদাওয়ের তিন ছোট ভাই তোশিও, কাজুও ও ইউকিও। চার ভাইয়ের প্রত্যেকের দক্ষতা ছিল আলাদা-কেউ ছিলেন উদ্ভাবক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ দক্ষ কারিগর।

সিগারেটের পিন থেকে শুরু

যুদ্ধের পর জাপানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট ছিল। সিগারেটও ছিল মূল্যবান। ফলে, মানুষ সিগারেট যতটা সম্ভব শেষ পর্যন্ত টানতেন। এ সময় তোশিও কাশিও এমন একটি আংটির মতো ধাতব পাইপ উদ্ভাবন করেন, যাতে সিগারেট আটকে রেখে হাত না দিয়েই ধূমপান করা যায়।

তাদাও লেদ মেশিনে সেটি তৈরি করতেন, আর তাদের বাবা শিগেরু গেরু বাজারে গিয়ে বিক্রি করতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ‘ইউবিওয়া পাইপ’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্যাসিওর ইতিহাস অনুযায়ী, এই পণ্য থেকে পাওয়া লাভই পরবর্তী সময়ে নতুন প্রযুক্তি তৈরির মূলধন জোগায়।

অর্থাৎ, আজ যে ক্যাসিওকে আমরা ঘড়ি, ক্যালকুলেটর ও ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির ব্র্যান্ড হিসেবে চিনি, তার বাণিজ্যিক যাত্রার পেছনে ছিল একটি ছোট্ট সিগারেট-ধারক পিন।

সিগারেট থেকে ক্যালকুলেটর

১৯৪৯ সালে টোকিওর গিনজায়-এ একটি ব্যাবসায়িক প্রদর্শনীতে গিয়ে তোশিও ও তাদাও বৈদ্যুতিক ক্যালকুলেটর দেখতে পান। সে সময় ক্যালকুলেটর ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মূলত গিয়ার ও মোটরনির্ভর। চার ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন, তারাও এমন একটি যন্ত্র তৈরি করবেন।

তোশিও ছিলেন মূল চিন্তার কারিগর। ইউকিও প্রকৌশলগত নকশায় কাজ করতেন, আর তাদাও ও কাজুও উৎপাদনের দায়িত্ব নিতেন। কয়েক বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৯৫৪ সালে তারা একটি বৈদ্যুতিক ক্যালকুলেটরের প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। পরে নকশায় বড় পরিবর্তন এনে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ব্যবহৃত রিলে প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নতুন ক্যালকুলেটর তৈরি করা হয়।

১৯৫৭ সালে বাজারে আসে ১৪-এ, ক্যাসিওর প্রথম ছোট আকারের সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ক্যালকুলেটর। একই বছর প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যাসিও কম্পিউটার কোম্পানি। এভাবেই সিগারেটের পিন থেকে পাওয়া মূলধন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পথে পা রাখে।

ক্যালকুলেটর থেকে হাতের কবজিতে ঘড়ি

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে বিশ্বে ঘড়ি শিল্পে বড় পরিবর্তন আসে। এ সময় যান্ত্রিক ঘড়ির পাশাপাশি কোয়ার্টজ ও ডিজিটাল প্রযুক্তি দ্রুত এগোচ্ছিল। অন্যদিকে ক্যাসিও এরই মধ্যে ক্যালকুলেটর তৈরিতে LSI প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করেছে।

ক্যালকুলেটরের প্রযুক্তিকে ঘড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোম্পানির কাছে বিষয়টি ছিল স্বাভাবিক এক নতুন সুযো। ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে বাজারে আসে ক্যাসিওট্রন, ক্যাসিওর প্রথম ডিজিটাল হাতঘড়ি।

ক্যাসিওট্রনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর স্বয়ংক্রিয় ক্যালেন্ডার। ঘড়িটি মাসে কত দিন রয়েছে তা নিজে হিসাব করে তারিখ পরিবর্তন করতে পারত। ক্যাসিওর দাবি অনুযায়ী, এটি ছিল বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল ঘড়ি যাতে স্বয়ংক্রিয় ক্যালেন্ডার ছিল।

এখানেই ক্যাসিওর ঘড়ির দর্শনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে-ঘড়ি শুধু সময় দেখাবে না; বরং সময়ের সঙ্গে মানুষের আরও নানা প্রয়োজন মেটাবে।

কবজির ঘড়ি হয়ে উঠল ‘কম্পিউটার’

এরপর ক্যাসিও ঘড়িকে শুধু সময় দেখানোর যন্ত্র হিসেবে দেখেনি। ১৯৮০ সালে বাজারে আসে ক্যালকুলেটরসমৃদ্ধ ঘড়ি C-80। পরে ফোন নম্বর সংরক্ষণ, ডেটাব্যাংক, অভিধানসহ নানা সুবিধা যুক্ত হতে থাকে ঘড়িতে। ১৯৮৪ সালে ডেটাব্যাংক ঘড়ি ১০টি গ্রুপে ফোন নম্বরসহ তথ্য সংরক্ষণ করতে পারত।

এরপর এলো G-SHOCK

১৯৮৩ সালে ক্যাসিও ঘড়ির ইতিহাসে আরেকটি বড় বাঁক আসে। বাজারে আসে G-SHOCK DW-5000C যা ছিল ধাক্কা-সহনশীল ঘড়ি। সে সময় ঘড়ি শিল্পে পাতলা ও হালকা ঘড়ির দিকে ঝোঁক ছিল। ক্যাসিও তার বিপরীতে তৈরি করল এমন একটি ঘড়ি, যার ধারণাই ছিল প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করা।

শুরুতে G-SHOCK সব বাজারে সমান জনপ্রিয় হয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এর নকশা ও স্থায়িত্ব আলাদা একটি পরিচয় তৈরি করে। পরে এটি ক্যাসিওর অন্যতম সিগনেচার পণ্যে পরিণত হয় এবং ‘শক-রেজিস্ট্যান্ট’ ঘড়ির একটি আলাদা বাজার তৈরি করে।

ক্যাসিওর এই যাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে-এর শুরু কোনো অত্যাধুনিক গবেষণাগারে হয়নি। শুরু হয়েছিল যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের সংকট থেকে জন্ম নেওয়া একটি ছোট্ট প্রয়োজন মেটানোর পণ্য দিয়ে।

১৯৪৬ সালের সেই ‘ইউবিওয়া পাইপ’ ছিল মূলত একটি সিগারেট-ধারক আংটি। কিন্তু এর সাফল্য চার কাশিও ভাইকে নিজেদের পণ্য তৈরির আত্মবিশ্বাস ও মূলধন দেয়। এরপর তারা ক্যালকুলেটর বানিয়েছে, ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিকে ছোট করেছে, সেই প্রযুক্তি ঘড়িতে এনেছে এবং শেষ পর্যন্ত ঘড়িকেই পরিণত করেছে ক্যালকুলেটর, ডেটাব্যাংক ও নানা ডিজিটাল সুবিধার বাহনে।

আজ ক্যাসিওর ঘড়ির দিকে তাকালে তাই শুধু সময় দেখা যায় না, দেখা যায় একটি পরিবারের উদ্ভাবনী যাত্রার দীর্ঘ ইতিহাস।