৩৮৭ কোটির প্রকল্প • কৃষিপণ্য রপ্তানিতে খুলছে সিলেটের দুয়ার প্রকাশিত: ৩:৪০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৬ ৩৮৭ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে ৫ একর ভূমিতে হবে প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজ চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদে বদলে যাবে উৎপাদনের চিত্র যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে সিলেটে উৎপাদিত গোয়ালগাদ্দা শিম ও জারা লেবু। এর বাইরে নাগামরিচও রপ্তানি করছেন কৃষকরা। হাওরের দেশি মাছও যাচ্ছে বিভিন্ন দেশে। এ অঞ্চলে উৎপাদিত আরও অনেক কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনার পেছনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু সমস্যা। সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের পর্যাপ্ত সুবিধা নেই সিলেটে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রপ্তানির সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতি বদলাতে প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেটে আধুনিক প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শলা এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জমিতে এই অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তাব করা হয়েছে। এরই মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি সিলেট থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পে থাকবে এক হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকিং ও গ্রেডিংয়ের সুবিধা, মান যাচাইয়ের জন্য ১০টি পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সম্মেলনকক্ষ এবং বিদেশি ক্রেতাদের থাকার জন্য অতিথি ভবন। এছাড়া পণ্য পরিবহন, লোডিং-আনলোডিং, মান নিয়ন্ত্রণ ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঢাকা ও সিলেটের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করে কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্যাকিং হাউজ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। চলতি সপ্তাহে বিশেষজ্ঞ দলটির সিলেট সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সিলেটের কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট চালু হলেও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় সেই সুবিধা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রপ্তানির সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হবে। সিলেট থেকে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য রপ্তানির অপার সম্ভাবনা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে এ অঞ্চলে উৎপাদিত সাইট্রাস জাতীয় ফল, সবজি ও বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্যের চাহিদা রয়েছে বিভিন্ন দেশে। রপ্তানির এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় অত্যাধুনিক কার্গো কমপ্লেক্স। ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। ঢাকার বাইরে দেশের প্রথম বিমানবন্দর হিসেবে এই ঐতিহাসিক কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু বিমানবন্দরে ‘কোল্ডস্টোরেজ ও প্যাকিং হাউস’ না থাকায় সিলেট থেকে কোনো ধরনের কৃষিপণ্য রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না। কার্গো ফ্লাইটে করে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক বিদেশে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সিলেটে প্যাকিং হাউজ কাম কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরের আদলে সিলেটেও একটি ‘প্যাকিং হাউজ’ স্থাপন করা গেলে এ অঞ্চলে উৎপাদিত শিম, নাগা মরিচ, ফরাস ও শিমের বিচি, কচুমুখী ও লতি, জারা লেবু এবং সাতকরা ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা সম্ভব যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেট থেকে প্রতিনিয়তই প্রচুর পরিমাণে সবজি বিদেশে যাচ্ছে। হাওরের সুস্বাদু মাছও যাচ্ছে দেশের গণ্ডির বাইরে। এ অবস্থায় কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও রপ্তানির অবকাঠামো গড়ে উঠলে কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সিলেটের কৃষিপণ্যের প্রবেশের সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে সিলেটের গোয়ালগাদ্দা শিম, সাতকড়া, জাড়া লেবু, নাগা মরিচ ও কচুর লতিসহ নানা কৃষি পণ্যের রপ্তানি বাড়বে। সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এরকম একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গা বরাদ্দ দিতে কোনো সমস্যা নাই। আপাতত সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শলায় খাসজমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রয়োজনে আরও জমি বরাদ্দ দেওয়া হবে।’ বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেটের কৃষিজ, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা বিশ্বজোড়া। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ নিশ্চিতের পাশাপাশি কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক ড. ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন করাবেন। এতে কৃষকদের জন্য ফসল উৎপাদন ও বিক্রয়ের স্থায়ী বাজার সৃষ্টি হবে।’ তিনি বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শাকসবজি ও ফলমূলের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ড্রাগন ফল, সাতকড়া, তেজপাতা ও নাগা মরিচের উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সিলেটের হাওরের মাছ সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে কোয়ালিটি নিশ্চিতকরণ ও সুন্দর প্যাকিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করা হবে। এছাড়া প্রসেসিং ব্যবস্থা চালু হলে ভবিষ্যতে সিলেটে ডেইরি ও পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে ওঠার পথ সুগম হবে। মাছ, মাংস ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। সিলেটে প্যাকিং হাউজ কাম কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের লক্ষ্যে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিকল্পনা প্রণয়ন বিভাগের অধীনে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের উপপরিচালক জুলিয়া যেসমিন মিলি। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ শেষে খসড়া ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিমানবন্দর সংলগ্ন বড়শালা এলাকায় সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ একর জায়গায় একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে জানিয়ে উপপরিচালক বলেন, কমপ্লেক্সটিতে ১০টি ল্যাব, অফিস ভবন, গ্রেডিং রুম, কোল্ডস্টোরেজ চেম্বার, ট্রেনিং সেন্টার ও বিদেশি ক্রেতাদের থাকার জন্য গেস্ট হাউজসহ নকশার কাজ চলছে। পাশাপাশি সিলেটের হাওরের মাছ রপ্তানির জন্য সার্টিফিকেশন সুবিধা ও একটি সেল সেন্টার যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার শ্যামপুর প্যাকিং হাউজের ভুলত্রুটি বিশ্লেষণ করে সিলেটের প্যাকিং হাউজ আরও আধুনিক ও পরিমার্জন করতে বৃহস্পতিবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে বিশেষজ্ঞ দল সিলেট পরিদর্শন করবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রত্যক্ষভাবে ও পরোক্ষভাবে হাজারও মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে জানান পরিচালক জুলিয়া যেসমিন মিলি। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে পণ্য রপ্তানি করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কন্ট্রাক্ট ফার্মিং (চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ) চালু করা হবে। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে সিলেটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সিলেটে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শ্যামপুরের প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজের আদলে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে সিলেটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে কৃষি উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী নেতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। Download PhotoCard SHARES বিশেষ সংবাদ বিষয়: ৩৮৭ কোটির প্রকল্প • কৃষিপণ্য রপ্তানিতে খুলছে সিলেটের দুয়ার