প্লাস্টিকের ফুলের দাপটে তাজা ফুলের ব্যবসায় টান

প্রকাশিত: ৩:২০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬

বিয়ে-শাদি মানেই তাজা ফুলের মেলা। গায়েহলুদের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বর-কনের দুই বাড়ির সাজসজ্জা, বিয়ের মঞ্চ, গাড়ি কিংবা প্রবেশপথ সাজানো—সবখানেই তাজা ফুলের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানেও ফুলের চাহিদা ছিল বেশ ভালো। তবে সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে সেই চিত্র। কুমিল্লায় দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে তাজা ফুলের বাজার। কমছে বেচাকেনাও।

ব্যবসায়ীদের দাবি, আগের তুলনায় বেচাকেনা নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। এতে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

ব্যবসায়ীদের মতে, বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে প্লাস্টিক ফুলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় তাজা ফুলের চাহিদা কমছে। একবার কিনে বারবার ব্যবহার করা যায় বলে অনুষ্ঠান আয়োজকদের অনেকেই এখন প্লাস্টিক ফুলের দিকে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি ফুলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারাও প্রয়োজনের বাইরে তাজা ফুল কেনেন না।

অন্যদিকে, করোনার পর থেকে দেশে ফুলচাষির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। যে কারণে বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাজা ফুলের ব্যবসায় মন্দাভাব দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী দোকান গুটিয়ে নিয়েছেন। কেউ নিজের ব্যবসা বন্ধ করে অন্যের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও বিদ্যুৎ বিলের মতো নিয়মিত খরচ মেটাতে গিয়ে অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে না পেরে কেউ কেউ ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। দীর্ঘদিনের এই পেশায় টিকে থাকা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

ক্রেতারা বলছেন, গত কয়েক বছরে তাজা ফুলের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। অথচ প্লাস্টিক ফুল তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় এবং ব্যবহারের পর সংরক্ষণ করে আবার কাজে লাগানো যায়। ফলে একই সাজসজ্জার জন্য বারবার টাকা খরচ করার প্রয়োজন পড়ে না। বিশেষ করে বিয়ে, গায়েহলুদ, জন্মদিন কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠানে বাজেটের কথা বিবেচনা করে অনেকেই এখন প্লাস্টিক ফুল বেছে নিচ্ছেন। এই ফুলে বহুমুখী সুবিধা থাকায় একান্ত প্রয়োজন ছাড়া তারা কাঁচা ফুল কেনেন না।

কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড়, বাদুরতলা, পুলিশ লাইন, শাসনগাছা ও পদুয়ার বাজার এলাকার ফুলের দোকান ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিন কাঁচা ফুল মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি দোকানেই দৃষ্টিনন্দন ফুলের তোড়া, ফুলের মালা, ফুলের গহনাসহ বাহারি ফুল দিয়ে পসরা সাজিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। একেক দোকানে মালিক-কর্মচারী মিলিয়ে ২-৫ জন বসে আছেন ক্রেতার অপেক্ষায়। কিছুক্ষণ পর পর দু-একজন ক্রেতা আসছেন। ফুলের দাম শুনে বেশিরভাগ ক্রেতাই না কিনে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই আবার তাজা ফুলের পরিবর্তে প্লাস্টিকের ফুল কিনছেন।

বিজ্ঞাপন

দেবিদ্বারের ব্রাহ্মণখাড়া (মনঘাটা) এলাকা থেকে শহরে এসেছেন রুদ্র মজুমদার। উদ্দেশ্য পূজার জন্য তাজা ফুলের অর্ডার দেবেন। ফুলের দাম বেশি দেখে তিনি প্রতি পিস ২০ টাকা ধরে ৫০ পিস পদ্মফুলের অর্ডার দিয়ে চলে যান।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘তাজা ফুলের দাম অতিরিক্ত। যে কারণে শুধু পদ্মফুলের অর্ডার দিয়েছি। এবারের পূজায় বেশিরভাগই প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে সাজানো হবে। এগুলো সংরক্ষণ করে আবার কাজে লাগানো যায়।’

নগরীর নোয়াগাঁও থেকে দুই বান্ধবী নুসরাত ও তানজিনা তাদের পার্টি অনুষ্ঠানের জন্য ফুল কিনতে আসেন কান্দিপাড়ে। তারা বলেন, ৩৫ টাকা করে ৫০টি গোলাপ এবং ২৫ টাকা করে ৫০টি রজনীগন্ধা নিয়েছি। একটা ফুলের তোড়া ৫০০ টাকা বলেছি, দোকানদার সেটি হাজার টাকার কমে দিচ্ছেন না। অথচ বছর দুয়েক আগেও এর দাম সর্বোচ্চ ৩০০-৪০০ টাকা ছিল।

বিজ্ঞাপন

নুসরাত ও তানজিনা বলেন, ‘দিন দিন ফুলের দাম বাড়ছে। অতি প্রয়োজন ছাড়া আমরা এখন ফুল কিনতে আসি না। তবে প্লাস্টিকের ফুলই ভালো। একবার কিনলে বহুবার ব্যবহার করা যায়।’

আলাপকালে কান্দিরপাড়া জেলা স্কুলের পাশে রেড রোজ ফুল দোকানের মালিক মাহবুবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘২৮ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। আগে প্রতিদিনই বিয়ের অনুষ্ঠানের অর্ডার পেতাম। এখন দুই সপ্তাহে একটাও পাই না। এখন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে যারা কাজ করেন, তারা প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে কাজ সেরে ফেলেন। ফলে আমাদের অর্ডার কমে গেছে। সরকারি-বেসরকারি অফিসের অনুষ্ঠানের কারণে কোনোরকম বেঁচে আছি।’

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের পর একুশে ফেব্রুয়ারিতেও ফুল বিক্রি কমেছে। এই দিনে অন্তত ৭০-৮০টি ফুলের ডালা বিক্রি করতাম। কিন্তু গত দুই বছর অর্ধেকেরও বেশি কমেছে বিক্রি।’

বিজ্ঞাপন

মাহবুবুর রহমানের ভাষ্য, ‘সিঁড়ির নিচে ছোট্ট এই দোকানের ভাড়া ১৫ হাজার টাকা। মাস শেষে কর্মচারীর বেতন ও দোকানভাড়া দিয়ে হাতে তেমন কিছুই থাকে না। জীবনে একটি কাজই শিখেছি। যে কারণে কষ্ট হলেও এই পেশায় পড়ে আছি।’

মালঞ্চ পুষ্পালয়ের মালিক মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘পারিবারিকভাবে গত ২৩ বছর ধরে ফুলের ব্যবসা করছি। বর্তমান সময়ের মতো পরিস্থিতি আর কখনো হয়নি। মাসের ১০ তারিখ চলছে। এখনো কর্মচারী, দোকানভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল দেওয়া হয়নি।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, লাখে তিন হাজার টাকা সুদে টাকা ছেড়েও পাইনি। আগামীকাল আরেকজনের কাছে চেষ্টা করব। আপনার সামনেই লিলি ফুলের তোড়া ৪৫০ টাকা মুলাচ্ছে (দাম দিতে চাচ্ছে)। অথচ এটি তৈরি করতে আমাদের ৮০০ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এই হলো বর্তমান পরিস্থিতি। যতদ্রুত সম্ভব পেশা পরিবর্তন করে বিদেশে চলে যাওয়া চিন্তা করছেন এই ব্যবসায়ী।

সুগন্ধা ইভেন্ট প্ল্যানারের কারিগর মনির হোসেন। ব্যবসায় মন্দা পরিস্থিতি দেখে তিন বছর আগে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রজনীগন্ধা পুষ্পালয় গুটিয়ে এখন অন্যের দোকানে কাজ করেন।

তিনি বলেন, ‘যে কোনো ব্যবসা দিন দিন উন্নত হয়। কিন্তু ফুলের ব্যবসা দিন দিন রসাতলে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা প্লাস্টিকের ফুলের দখলে চলে গেছে বাজার।

কুমিল্লা ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউসুফ। তিনি জানান, আগে যে কোনো উৎসব-অনুষ্ঠানকে ঘিরে যে ফুলের বাজার জমজমাট থাকত, এখন উল্টো ক্রেতাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তাজা ফুলের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, ‘আগে একটি গোলাপ পাঁচ টাকায় কিনে ১০-১৫ টাকা বিক্রি করতাম। এখন ৩০ টাকায় কিনে ৩৫ টাকায় বেচতেও কষ্ট হয়। তাছাড়া বিক্রি করতে না পারলেতো নষ্ট হয়ে যায়। উভয় সংকটে রয়েছি আমরা।’

ব্যবসায়ী মো. ইউসুফ জানান, আগে কুমিল্লায় ২৫-৩০টি ফুলের দোকান ছিল। লাভের পরিমাণও ছিল সন্তোষজনক। এখন দোকান কমে ১০-১২টি হয়েছে। কিন্তু দিন শেষে লাভের খাতা শূন্য। প্লাস্টিকের ফুল আমদানি না কমালে তাজা ফুলের বাজার দিন দিন হারিয়ে যাবে। এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তিনি সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি কামনা করেন।