ডেঙ্গু জ্বর কমে যাওয়ার পরেও দুটি ফেজ থাকে প্রকাশিত: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬ অনেকেই মনে করেন তীব্র জ্বর কমে গেলেই বুঝি মূল বিপদ কেটে গেল। এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টিতেই ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে সবচেয়ে সতর্ক থাকা উচিত। কারন এ সময়েই ডেঙ্গুজনিত জটিলতা হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। ডেঙ্গু জ্বর কমে যাওয়ার পরে দুটি ফেজ আছে। ১. Critical Phase বা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ঃ জ্বর কমে যাওয়ার পর এই ফেজটি শুরু হয় এবং সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এই পর্যায়ে ডেঙ্গু ভাইরাসের কারণে শরীরের রক্তনালীগুলোর দেয়াল অতিমাত্রায় প্রবেশযোগ্য হয়ে সূক্ষ্মভাবে লিক (Capillary Leakage) করা শুরু করতে পারে। এতে করে রক্তচাপ (Blood Pressure) হঠাৎ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে, রক্তের প্লেটলেট কাউন্ট দ্রুত নেমে আসতে পারে, এবং রক্ত ঘন হয়ে যাওয়ার কারণে শরীরের প্রধান অঙ্গগুলোতে রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হতে পারে। এই পর্যায়ে রক্তের তীব্র স্বল্পতা ও ব্লাড প্রেশার ড্রপ করার কারণে যে বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকেই ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’ (Dengue Shock Syndrome) বলা হয়। ভাইরাসের তীব্র ধকল ও ইমিউন সিস্টেমের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার কারণেই রোগী এই সময়ে প্রচণ্ড শরীর ও হাত-পায়ে ক্লান্তি অনুভব করেন। এই ২৪-৪৮ ঘণ্টা রোগীকে সম্পূর্ণ বেড-রেস্টে রাখুন। তীব্র পেটে ব্যথা, অনবরত বমি (২৪ ঘণ্টায় ৩ বারের বেশি), মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ, ত্বকে ছোট ছোট লাল দাগ এবং চরম ক্লান্তি বা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো বিপদচিহ্ন দেখা দেওয়া মাত্র হাসপাতালে নিতে হবে। এই সময়েই চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা (CBC) করে PCV বা হেমাটোক্রিট এবং প্লেটলেট চেক করতে হয়। ২. রিকভারি ফেজ (Recovery Phase) বা সুস্থতার পর্যায়ঃ ক্রিটিকাল ফেজটি নিরাপদে পার হলে রিকোভারি শুরু হয়, যা সাধারণত ২ থেকে ৩ দিন স্থায়ী হয়। এই পর্যায়ে শরীর আবার তার স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে। রক্তনালী থেকে যে প্লাজমা বা তরল বের হয়ে চারপাশের টিস্যুতে জমা হয়েছিল, তা আবার পুনরায় রক্তনালীতে শোষিত (Reabsorbed) হতে শুরু করে। রোগীর হার্ট রেট ও রক্তচাপ স্থিতিশীল হয় এবং বোন ম্যারো (অস্থিমজ্জা) নতুন করে প্লেটলেট তৈরি শুরু করায় প্লেটলেট কাউন্ট নিজে থেকেই বাড়তে থাকে। তবে ভাইরাসের রেখে যাওয়া ধকলের কারণে মাংসপেশি ও জয়েন্টের অবসাদ বা পোস্ট-ডেঙ্গু ক্লান্তি আরও কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে। এই পর্যায়ে রোগীর ক্ষুধা ফিরে আসে, প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিক হয় এবং সারা শরীরে এক ধরণের বিশেষ লালচে দানা বা ‘রিকভারি র্যাশ’ দেখা দেয়, যাতে তীব্র চুলকানি হতে পারে। এটি কিন্তু প্লাজমা রিঅ্যাবজরপশন বা সুস্থতারই লক্ষণ। এই সময়ে রোগীকে জোর করে অতিরিক্ত ফ্লুইড বা স্যালাইন খাওয়ানো যাবে না, কারণ এতে শরীরে ‘ফ্লুইড ওভারলোড’ বা অতিরিক্ত তরল জমার ঝুঁকি থাকে। চুলকানির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া ভাইরাসের ধকল কাটিয়ে উঠতে রোগীকে উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত খাবার (ডিম, মাছ, স্যুপ ইত্যাদি) দিন। যেসব বিষয়ে অবাস্তব বা অযথা চিন্তা করার দরকার নেইঃ নতুন র্যাশ ও চুলকানি দেখে ভয় পাওয়াঃ জ্বর ভালো হওয়ার ৫-৭ দিন পর শরীরে লাল দানা এবং তীব্র চুলকানি দেখে অনেকেই মনে করেন ডেঙ্গু আবার বেড়েছে। এটি নিয়ে একদমই ভয় পাবেন না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘রিকভারি র্যাশ’ যা প্রমাণ করে রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। রিকভারি র্যাশের মাঝে মাঝে সাদা চামড়ার ছোট ছোট দ্বীপের মতো অংশ (White islands in a sea of red) দেখা যায়। একটি স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাস বা বাটি নিয়ে ত্বকের লাল দাগের ওপর শক্ত করে চেপে ধরুন। চাপ দেওয়ার পরও যদি লাল দাগগুলো মিলিয়ে না যায় এবং আগের মতোই স্পষ্ট থাকে, তবে সেটি Petechiae বা রক্তক্ষরণ (খারাপ লক্ষণ)। আর চাপ দেওয়ার সাথে সাথে যদি লালচে ভাবটা সাময়িকভাবে ফ্যাকাশে বা সাদা হয়ে যায় এবং গ্লাস সরালে আবার লাল রঙ ফিরে আসে, তবে তাতে ভয়ের কিছু নেই, এটি আপনার ভালো হওয়ার রিকভারি র্যাশ। দ্রুত পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার তাগিদঃ ডেঙ্গু পরবর্তী শারীরিক ক্লান্তি (Post-Dengue Fatigue) কাটাতে শরীরের অন্তত ২ সপ্তাহ সময় লাগে। এটা স্বাভাবিক। তাই পুরোপুরি ক্লান্তি না যাওয়া পর্যন্ত শরীরকে জোর খাটাবেন না। শুধু প্লেটলেট কাউন্ট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া: প্লাটিলেট একটু কমলেই প্যানিক করবেন না। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেটের চেয়েও অনেক বেশি জরুরি শরীরে তরলের ভারসাম্য ঠিক রাখা। শরীর হাইড্রেটেড না থাকলে রক্তচাপ ধপ করে পড়ে গিয়ে রোগী ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’ এ চলে যেতে পারে, যা অত্যন্ত জীবনঘাতী। তাই রোগীকে শুধু সাধারণ পানি না খাইয়ে প্রচুর পরিমাণে ওরস্যালাইন (ORS), ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও স্যুপ খাওয়ান। এই তরল খাবারগুলোই রক্তনালীতে রক্তের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখে এবং রোগীকে বড় বিপদ থেকে বাঁচায়। অযথা পেঁপে পাতা বা কবিরাজি রস খাওয়ানো: প্লেটলেট দ্রুত বাড়ানোর চক্করে রোগীকে জোর করে পেঁপে পাতার রস বা বিভিন্ন টোটকা খাওয়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলো অনেক সময় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ও বমি বাড়িয়ে রোগীকে আরও পানিশূন্য করে ফেলে। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা: ক্রিটিকাল বা রিকভারি ফেজে শরীর বা মাথা ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল (Paracetamol) ব্যতীত অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন: Ibuprofen, Aspirin, Diclofenac) একদম দেওয়া যাবে না। এগুলো রক্তনালীর লিকিং এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। ডেঙ্গুর জ্বর কমে যাওয়া মানেই যুদ্ধ শেষ নয়, বরং এটি সতর্ক থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আপনার একটু সচেতনতা, সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং বাড়িতে সঠিক উপায়ে তরল খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থাপনাই পারে একজন রোগীকে বড় ধরণের বিপদ থেকে রক্ষা করতে। লেখক : ডাঃ মুশতারী মিমি এমবিবিএস, এমপিএইচ ( ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি ,কানাডা)। Download PhotoCard SHARES স্বাস্থ্য বিষয়: ডেঙ্গু জ্বর কমে যাওয়ার পরেও দুটি ফেজ থাকে