‘স্বর্গের দুয়ার’ যেন ইউরোপের পাহাড়ে, পর্যটকদের পছন্দের ৮ অসাধারণ জাগয়া

প্রকাশিত: ১২:০৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

পাহাড়ের মাথায় মেঘের আনাগোনা, দিগন্তজোড়া উপত্যকা, বরফঢাকা শৃঙ্গ আর নির্জন পথে হাঁটার আনন্দ—পাহাড়ি ভ্রমণের আকর্ষণই আলাদা। ইউরোপের পাহাড়ে এমন অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, অপেক্ষা করে স্থানীয় খাবার, ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম আর অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতাও। জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের ভিড় এড়িয়ে এমনই কিছু গন্তব্যের খোঁজ দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

প্রতিবেদনে পাঠকদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে ইউরোপের পাহাড়ি এলাকার কয়েকটি আকর্ষণীয় ভ্রমণপথ। সুইজারল্যান্ডের কেবল কার থেকে ইতালির আল্পস, লিশটেনস্টাইনের ট্রেকিং রুট থেকে ফ্রান্সের পিরেনিজ—প্রতিটি গন্তব্যেই রয়েছে প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার আলাদা সুযোগ।

ইতালির পাহাড়ে সূর্যাস্ত ও তারাভরা আকাশ

তালিকার সেরা পরামর্শ হিসেবে উঠে এসেছে ইতালির কুরমাইয়রের কাছে অবস্থিত রিফুজিও বের্তোনে। এখান থেকে দেখা যায় ইউরোপের অন্যতম বিখ্যাত পর্বতশৃঙ্গ মঁ ব্লাঁর হিমবাহের অসাধারণ দৃশ্য। পাহাড়ি পথে হাঁটার পাশাপাশি সূর্যাস্তের সময় হিমবাহের ওপর আলো-ছায়ার খেলা উপভোগ করা যায়। রাত নামলে দেখা মেলে তারাভরা আকাশেরও।

এখানকার আকর্ষণ শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্রের খাবার, আন্তরিক পরিবেশ এবং হাঁটার জন্য সুন্দর পথও পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে বিশেষ করে তোলে।

সুইজারল্যান্ডে ফুনিকুলার থেকে কেবল কার

সুইজারল্যান্ডের স্টানস গ্রামে রয়েছে ভ্রমণের এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। প্রথমে পুরোনো কাঠের কামরার ফুনিকুলারে চড়ে পাহাড়ের ওপরের স্টেশনে পৌঁছতে হয়। সেখান থেকে যাত্রা করা যায় দোতলা কেবল কারে। এর উপরের অংশে খোলা পর্যবেক্ষণ ডেক রয়েছে, যেখান থেকে চারপাশের পাহাড় ও লুসার্ন অঞ্চলের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়।

লিশটেনস্টাইনের ‘রুট ৬৬’

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত রুট ৬৬-এর কথা অনেকেই জানেন। তবে ইউরোপের ছোট্ট দেশ লিশটেনস্টাইনেও রয়েছে ‘রুট ৬৬’ নামে পরিচিত একটি পাহাড়ি হাঁটার পথ। এটি একাধিক দিনের ট্রেকিংয়ের জন্য উপযোগী। পথে দেখা মেলে সবুজ উপত্যকা, পাহাড়ি ঢাল এবং ‘থ্রি সিস্টার্স’ নামে পরিচিত ড্রাই শভেস্টার্ন পর্বতাঞ্চলের।

এই পথে হাঁটার অন্যতম আকর্ষণ পাহাড়ি কুটিরে রাত কাটানো এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি খাবারের স্বাদ নেওয়া।

ফ্রান্সের পিরেনিজে ছোট্ট পাহাড়ি শহর

ফ্রান্সের পিরেনিজ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত ল্যুজ-সাঁ-সোভ্যর ছোট্ট একটি শহর। পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্যের পাশাপাশি এখানে রয়েছে স্থানীয় দোকানপাট, খাবার এবং বাইরের নানা ধরনের কার্যকলাপের সুযোগ। সাইকেল, মোটরবাইক, গাড়ি কিংবা পায়ে হেঁটে আশপাশ ঘুরে দেখা যায়।

আয়ারল্যান্ডের পাহাড়ে ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির খোঁজ

আল্পসের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের বদলে তুলনামূলক নিরিবিলি পাহাড়ি পরিবেশ চাইলে আয়ারল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ডোনেগল আকর্ষণীয় গন্তব্য। এখানে এরিগাল পাহাড় বেশ পরিচিত। তবে প্রতিবেদনে মাকিশ পাহাড়ের কথাও বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

পয়জনড গ্লেন ও গ্লেনভি ন্যাশনাল পার্কের আশপাশের ছোট রাস্তা ধরে গাড়ি চালালে বারবার থেমে দৃশ্য উপভোগ করতে ইচ্ছে হবে। পাহাড়, উপত্যকা ও আটলান্টিক উপকূলের সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করা যায়।

ইতালির ডোলোমাইটসে নিরিবিলি ট্রেকিং

ইতালির ডোলোমাইটস পর্বতমালা পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হলেও ব্রেন্তা ডোলোমাইটস তুলনামূলক কম পরিচিত। মূল পর্যটনকেন্দ্রের ভিড় এড়িয়ে পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা পেতে পারেন এখানে। পিনজোলো শহরকে ঘাঁটি করে আশপাশের পাহাড়ি পথে কয়েক দিনের ট্রেকিংয়ের পরিকল্পনা করা যায়।

কিছু পথে রয়েছে ভিয়া ফেরাতা—পাহাড়ের খাড়া অংশে স্থায়ী তার, সিঁড়ি ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থা ব্যবহার করে এগিয়ে যাওয়ার বিশেষ ধরনের রুট। তবে এই ধরনের পথে হাঁটার জন্য যথাযথ সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থা জরুরি।

ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের সীমান্তঘেঁষা পথ

লেক কোমোর পশ্চিম দিকের পাহাড়ে রয়েছে ভিয়া দেই মন্তি লারিয়ানি নামে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ট্রেকিং রুট। এটি চের্নোব্বিও থেকে সোরিকো পর্যন্ত বিস্তৃত। পথটি ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের সীমান্তঘেঁষা অঞ্চল দিয়ে এগিয়েছে।

এই পথে দেখা যায় পাহাড়ি তৃণভূমি, ছোট গ্রাম ও আল্পসের বিস্তৃত দৃশ্য। কোথাও কোথাও পুরোনো সীমান্তপারের চোরাচালানের ইতিহাসের চিহ্নও রয়েছে। থাকার জন্য পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে শুরু করে গ্রামীণ খামারবাড়ি পর্যন্ত নানা ধরনের জায়গা পাওয়া যায়। স্থানীয় খাবার, বিশেষ করে পোলেন্তা ও পিজ্জোকেরির মতো আঞ্চলিক পদ, ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় যোগ করে নতুন স্বাদ।

স্পেনের পিরেনিজে পরিবার নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার

স্পেনের পিরেনিজ পর্বতমালার পাদদেশে ট্রেম্প উপত্যকা পরিবার নিয়ে ছুটি কাটানোর জন্য আকর্ষণীয়। সান্তা এঙ্গ্রাসিয়া গ্রামের কাছাকাছি পাহাড়ের কিনারায় অবস্থিত থাকার জায়গা থেকে উপত্যকার বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। এখানে প্রকৃতির মধ্যে বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি রাফটিং, মাউন্টেন বাইকিং, ক্যানিয়ন কায়াকিং ও স্বচ্ছ পানির হ্রদে সাঁতার কাটার মতো কার্যকলাপের সুযোগ রয়েছে।

অস্ট্রিয়ার পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পিং

অস্ট্রিয়ার লোফার শহরের কাছে অবস্থিত ক্যাম্পিং গ্রুবহফ পাহাড়ের মধ্যে ছুটি কাটানোর আরেকটি বিকল্প। চারপাশে পাহাড়, সাইকেল চালানোর বিস্তৃত পথ এবং হাঁটার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় সুইমিং পুলও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

পাহাড়ে হাঁটা বা সাইকেল চালানোর পর কোনও পাহাড়ি কুটিরে বসে আপেল স্ট্রুডেলের মতো স্থানীয় খাবার উপভোগ করা যায়। তাঁবুতে থাকার পাশাপাশি ভাড়ায় কেবিন নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

পাহাড় ভ্রমণের আগে প্রস্তুতি জরুরি

ইউরোপের পাহাড়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে শুধু গন্তব্যের সৌন্দর্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। আবহাওয়া, যাতায়াতের ব্যবস্থা, পাহাড়ি পথের কঠিনতা, থাকার জায়গা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সম্পর্কে আগেই খোঁজ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ভিয়া ফেরাতা বা দীর্ঘ ট্রেকিংয়ের মতো কার্যকলাপে অভিজ্ঞ গাইড ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ভ্রমণে যেতে চাইলে ভিসা, যাতায়াত, থাকার খরচ এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পরিকল্পনাও আগে থেকে সাজিয়ে নেওয়া ভালো।