সঞ্চয়পত্র থাকলে আয়কর রিটার্নে কী সুবিধা পাওয়া যায়

প্রকাশিত: ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২৬

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার পাশাপাশি আয়কর রিটার্নেও কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কেটে রাখা কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে এ সুবিধা পেতে বিনিয়োগের অর্থ, অর্জিত মুনাফা ও উৎসে কর্তিত করের তথ্য সঠিকভাবে রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলেই যে সব ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়া যাবে কিংবা করের দায় পুরোপুরি মিটে যাবে, বিষয়টি এমন নয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ, মুনাফা ও উৎসে করের তথ্য দেওয়ার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এসব তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে, কোন ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়া যেতে পারে এবং মুনাফার ওপর কেটে রাখা কর কীভাবে সমন্বয় করা যাবে, তা জানা জরুরি।

সঞ্চয়পত্র থাকলে রিটার্নে কী সুবিধা

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের অন্যতম সুবিধা হলো, মুনাফার ওপর আগে কেটে রাখা কর আয়কর রিটার্নে সমন্বয়ের সুযোগ। ফলে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়েছে বলেই সেটিকে সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কর হিসেবে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১০৫ ধারা অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকলে সাধারণভাবে মুনাফার ১০ শতাংশ এবং টিআইএন না থাকলে ১৫ শতাংশ উৎসে কর কাটা হতে পারে।

তবে উৎসে করের হার ও চূড়ান্ত করদায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আইন এবং প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে। উৎসে কর কেটে রাখার পর রিটার্নে মোট করদায় হিসাব করে আগে পরিশোধ করা কর সমন্বয় করা যায়। ফলে করদাতার প্রকৃত করদায় অনুযায়ী অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে, আবার প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সমন্বয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত কর পরিশোধের ঝুঁকিও কমতে পারে।

সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে কর রেয়াত পাওয়া যায়?

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিনিয়োগের পুরো অর্থ করযোগ্য আয় থেকে বাদ দেওয়া হয় না। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতিতে কর রেয়াত হিসাব করা হয়।

এ ক্ষেত্রে কোন ধরনের সঞ্চয়পত্রে কত টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, বিনিয়োগটি সংশ্লিষ্ট করবর্ষে কর রেয়াতযোগ্য কি না এবং করদাতার মোট আয় ও করদায়ের পরিমাণ কত—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

করদাতার করদায় না থাকলে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের আর্থিক সুবিধা নাও পাওয়া যেতে পারে। আবার কর রেয়াত হিসাব করার পর করদায় কমে এলেও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর দিতে হতে পারে।

তাই সঞ্চয়পত্র কেনার আগে কর রেয়াতের সুবিধা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এনবিআরের সংশ্লিষ্ট করবর্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

ই-রিটার্নে সঞ্চয়পত্রের তথ্য যেভাবে দেবেন

সঞ্চয়পত্রের মূল বিনিয়োগ এবং সেখান থেকে অর্জিত মুনাফা রিটার্নের আলাদা অংশে দেখাতে হবে। মূল বিনিয়োগ করদাতার সম্পদ হিসেবে এবং মুনাফা আয় হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।

ই-রিটার্নের ‘অ্যাসেট অ্যান্ড লায়াবিলিটিস’ অংশে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের তথ্য দিতে হবে। অপরদিকে সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া মুনাফা দেখাতে হবে ‘ইনকাম ফ্রম ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসেটস’ অংশে।

অনলাইনে কেনা সঞ্চয়পত্রের তথ্য ই-রিটার্নের ‘ইমপোর্ট ফ্রম এনএসডি’ অপশনের মাধ্যমে আনার সুযোগ রয়েছে। তবে আমদানি করা তথ্য সঠিক কিনা, তা যাচাই করে নিতে হবে। যেসব সঞ্চয়পত্রের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য ম্যানুয়ালি দিতে হতে পারে।

উৎসে কাটা কর সমন্বয় করবেন যেভাবে

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটা হয়ে থাকলে সেই তথ্যও রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে। এ জন্য ই-রিটার্নের ‘ট্যাক্স অ্যান্ড পেমেন্ট’ অংশে গিয়ে ‘আপডেট ট্যাক্স পেমেন্ট স্ট্যাটাস’ অপশন থেকে ‘ই-রিটার্ন লেজার’ খুলতে হবে।

এরপর ‘ক্লেইম সোর্স ট্যাক্স’ অপশনে গিয়ে ‘সঞ্চয়পত্র’ নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। অনলাইনে কেনা সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে ‘ইমপোর্ট ফ্রম এনএসডি’ অপশন ব্যবহার করে তথ্য আনা যেতে পারে।

রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সঞ্চয়পত্রের সনদ, মুনাফার বিবরণ এবং উৎসে কর কর্তনের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। কোনো তথ্য বাদ পড়লে বা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলে কর হিসাবের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ

নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার জন্য তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র একটি পরিচিত বিনিয়োগমাধ্যম। এ সঞ্চয়পত্রে এক লাখ, দুই লাখ, পাঁচ লাখ ও ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের সনদ কেনার সুযোগ রয়েছে। জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘরের মাধ্যমে এটি কেনা ও নগদায়ন করা যায়।

এ সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ তিন বছর। বিনিয়োগের পরিমাণ এবং নগদায়নের সময়ের ওপর মুনাফার হার নির্ভর করে। নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়ন করলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী মুনাফার হার কমে যেতে পারে এবং আগে বেশি মুনাফা দেওয়া হয়ে থাকলে অতিরিক্ত অর্থ মূল টাকা থেকে সমন্বয় করা হতে পারে।

পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মতো কিছু সঞ্চয়পত্র নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য নির্ধারিত হলেও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ও অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

কারা সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন

সঞ্চয়পত্রের ধরন অনুযায়ী ক্রেতার যোগ্যতা ও বিনিয়োগের সীমা আলাদা। সাধারণ সঞ্চয়পত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়।

এ ছাড়া প্রযোজ্য বিধান ও শর্ত অনুযায়ী কিছু স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল, নির্দিষ্ট কৃষি ও খামার কার্যক্রম থেকে আয় করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং অটিস্টিক ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান, দুস্থ ও অনাথ শিশুদের নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রবীণদের নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্রের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানও নির্দিষ্ট সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারে।

বিনিয়োগের সীমা ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক বা যৌথ মালিকানা এবং প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট সঞ্চয়পত্রের সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সতর্কতা

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের তথ্য রিটার্নে দেওয়ার সময় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে—মূল বিনিয়োগের পরিমাণ, অর্জিত মুনাফা এবং উৎসে কর্তিত কর। এই তিনটি তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।

সঞ্চয়পত্রের মূল বিনিয়োগকে সম্পদ হিসেবে এবং মুনাফাকে আয় হিসেবে দেখাতে হবে। মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটা হয়ে থাকলে সেই অর্থের তথ্যও যথাযথভাবে যুক্ত করতে হবে। রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য, সঞ্চয়পত্রের সনদ এবং কর কর্তনের বিবরণ যাচাই করে নেওয়া ভালো।

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ফলে নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার পাশাপাশি উৎসে কাটা কর সমন্বয় এবং শর্তসাপেক্ষে কর রেয়াতের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আইন, বিনিয়োগের ধরন এবং করদাতার আয় ও করদায়ের ওপর। এ কারণে রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং প্রয়োজন হলে কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।