মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ: কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধ প্রকাশিত: ৩:১৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৮, ২০২৪ মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে মস্তিষ্ক। শারীর-বৃত্তীয়ভাবে শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলোর উপর আধিপত্য থাকে এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের। পেশী কার্যকলাপের ধারা বজায় রাখা এবং হরমোন নিঃসরণের মতো কার্যকলাপ নির্ভর করে এর সক্রিয়তার উপর। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এর কার্যকারিতার অসামঞ্জস্যতা বিরূপ প্রভাব ফেলে সারা শরীরের ওপর। এমনি একটি স্বাস্থ্য জটিলতা মস্তিষ্কে রক্তপাত, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে মৃত্যু ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এই রোগের নিরসণকল্পেই আজকের স্বাস্থ্য বিষয়ক নিবন্ধ। চলুন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণ ও লক্ষণসহ এর প্রতিরোধের উপায়গুলো জেনে নেই। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ কী ট্রমা বা বাহ্যিক ভয়াবহ কোন আঘাতের কারণে রক্ত প্যারেনকাইমা বা মস্তিষ্কের টিস্যুগুলোকে উদ্দীপিত করে। এতে করে টিস্যুগুলো ফুলে যায়। এই অবস্থার নাম সেরিব্রাল এডিমা। এ সময় রক্ত জমাট বেধে হেমাটোমার সৃষ্টি করে। ফলে কাছাকাছি অন্যান্য টিস্যুতে চাপ ছড়িয়ে পড়ে মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় রক্ত প্রবাহ হ্রাস করে। এতে করে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। মাথার খুলির মধ্যে সংঘটিত এই ঘটনাকে সামগ্রিক ভাবে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বলা হয়ে থাকে। চিকিৎসা শাস্ত্রে এটি ইন্ট্রাসেরিব্রাল হেমোরেজ (আইসিএইচ), হেমোরেজিক স্ট্রোক বা ব্রেন হেমোরেজ নামে পরিচিত। এই রক্তপাত মাথার খুলির ভেতরে বিভিন্ন স্থানে ঘটতে পারে। যেমন- মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে, মস্তিষ্ক ও একে ঘিরে আচ্ছাদিত ঝিল্লির মধ্যে অথবা ঝিল্লির স্তরগুলোর মধ্যে। মস্তিষ্কে রক্তপাত কাদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সেরিব্রাল রক্তপাত বিশেষ করে পুরুষ এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি ঘটে। আক্রান্তদের প্রায় ৪৪ শতাংশই এক মাসের মধ্যে মারা যায়। ৮৫ বা তদূর্ধ্ব বয়স্কদের আইসিএইচ হওয়ার সম্ভাবনা মধ্যবয়স্কদের তুলনায় ৯ দশমিক ৬ গুণ বেশি। এছাড়া নিয়মিত ধূমপায়ীদেরও মস্তিষ্কেও এমন রক্তপাতের জন্য সহায়ক পরিবেশ বিরাজ করে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণ মাথায় ভয়াবহ আঘাত ৫০ বছরের কম বয়সীদের মস্তিষ্কে রক্তপাতের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল বাহ্যিক আঘাত। সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনা, কোথাও পড়ে যাওয়া, খেলাধুলা সংক্রান্ত আঘাত, বা সহিংসতা বা হামলায় মাথায় গুরুতর আঘাতের সম্ভাবনা থাকে। উচ্চ রক্তচাপ সেরিব্রাল হেমোরেজের ক্ষেত্রে আরও একটি শ্রেণী অনেক ঝুঁকির মধ্যে থাকে। আর সেটি হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ সম্পন্ন ব্যক্তিদের শ্রেণী। অনেক সময় নিয়ে এই অবস্থার উদ্ভব হলেও এটি রক্তনালীর দেয়ালকে ভয়ঙ্কর ভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। রক্ত জমাট বাধা মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাধলে রক্তনালী ভেঙ্গে ভেতরটা রক্তে ভরে গিয়ে ধমনী ব্লক করে দেয়। ফলে রক্ত মস্তিষ্কের বাইরে বেরতে না পেরে রক্তের কোষগুলো ভেঙে মস্তিষ্কের টিস্যুতে ছড়িয়ে পরে। ফলে পর্যাপ্ত অস্কিজেন না পাওয়ায় মস্তিষ্কের টিস্যুগুলো ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অ্যানিউরিজম এটি মূলত রক্তনালীর প্রাচীরের একটি সমস্যা, যেটি হলে প্রাচীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলে যায়। এই ফোলা অংশ ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তপাত ঘটতে পারে, যেটি সরাসরি স্ট্রোকের দিকে নিয়ে যায়। আর্টেরিওভেনাস ম্যালফর্মেশন্স রক্তনালীর এই অবস্থাটি মূলত ধমনী এবং শিরাগুলোর মধ্যকার সংযোগস্থলগুলোতে চিড় ধরাকে বোঝায়। রক্তনালী যতই দুর্বল হতে থাকে মস্তিষ্কের মধ্যে ও তার চারপাশে ততই এই সমস্যাটি বাড়তে থাকে। অ্যামাইলয়েড অ্যাঞ্জিওপ্যাথি এটি মস্তিষ্কের রক্তনালীর দেওয়ালগুলোতে অ্যামাইলয়েড-বিটা প্রোটিন জমা হওয়াকে নির্দেশ করে। এই অস্বাভাবিকতা কখনও কখনও বার্ধক্য এবং উচ্চ রক্তচাপের ফলস্বরূপ ঘটে থাকে। এটি চূড়ান্ত অবস্থায় যাওয়ার আগে অনেক ছোট ছোট হেমোরেজের কারণ হতে পারে, যেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির অলক্ষ্যেই থেকে যায়। . রক্ত-সংক্রান্ত ব্যাধি হিমোফিলিয়া এবং সিকেল সেল অ্যানিমিয়া রোগের কারণে রক্তের প্লেটলেট এবং জমাট বাঁধার মাত্রা হ্রাস পায়। রক্ত পাতলা হয়ে যাওয়াটাও আইসিএইচ-এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যকৃতের রোগ যখন যকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন বিষক্রিয়া রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিষগুলোতে থাকে অ্যামোনিয়া এবং ম্যাঙ্গানিজ, যেগুলো স্নায়ু কোষের ক্ষতি করতে পারে। ব্রেন টিউমার এটি একটি ক্যান্সার যা কতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে নির্দেশ করে। এগুলোর মধ্যে কিছু কিছু থাকে সুপ্ত, যেগুলোকে ম্যালিগন্যান্ট বলা হয়ে থাকে। টিউমার মস্তিষ্কে শুরু হতে পারে, আবার শরীরের অন্য কোথাও শুরু হয়ে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের লক্ষণ স্ট্রোক বা হেমোরেজের লক্ষণগুলো মস্তিষ্কে রক্তপাতের অবস্থান, তীব্রতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর পরিমাণের উপর নির্ভর করে। সামষ্টিক ভাবে লক্ষণীয় উপসর্গগুলো হলো- – আকস্মিক অসহনীয় মাথাব্যথা – হঠাৎ খিঁচুনি হওয়া (পূর্বে খিঁচুনির কোনো রেকর্ড নেই) – বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া – চঞ্চলতা কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঝিমুনি ধরা – চেতনা হ্রাস পাওয়া – সমন্বয় বা ভারসাম্যহীনতা – চোখে দুটো করে দেখা, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, বা দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া – মুখ, ঘাড়, হাত-পা, বিশেষ করে শরীরের কোনো একটি পাশে শিহরণ বা অসাড় হয়ে যাওয়া – আলোর প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা – কথা অস্পষ্ট বা জড়িয়ে যাওয়া, অন্যদের কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া – গিলতে অসুবিধা হওয়া – লিখতে বা পড়তে অসুবিধা হওয়া – শ্বাসকষ্ট হওয়া, হৃদস্পন্দনের মাত্রা অস্বাভাবিক হওয়া – খাবারে স্বাদের অস্বাভাবিক অনুভূতি হওয়া মস্তিষ্কে রক্তপাতের চিকিৎসা এ রকম স্বাস্থ্য জটিলতায় চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোতে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তা হলো: – যথাযথ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের যোগান নিশ্চিত করা – মস্তিষ্কসহ সারা শরীরে ভারসাম্যপূর্ণ রক্তচাপ বজায় রেখে নিরবচ্ছিন্ন রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা – মাথার খুলির ভিতরে রক্তপাতের সম্ভাব্য সব রকম জটিলতা নিরসণ করা যেন পরবর্তীতে তা আরও বিপদের কারণ না হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রক্তপাত বন্ধ, মাথার খুলির ভেতরে চাপ কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সারিয়ে তোলার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। তবে তা অবশ্যই নির্ভর করে রক্তক্ষরণের সুস্পষ্ট অবস্থান এবং তীব্রতার উপর। ওষুধের মাধ্যমে আইসিএইচ চিকিৎসায় যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা হলো: – রক্তচাপ কমানোর জন্য ওষুধ – খিঁচুনি বন্ধ বা প্রতিরোধ করার জন্য অ্যান্টিসিজার ওষুধ – ব্যাথা এবং বমি বমি ভাবের মতো উপসর্গগুলো কমানোর জন্য প্রতিষেধক – রক্ত পাতলা করার কাযকলাপগুলোকে বন্ধ করার প্রতিষেধক – রক্তে শর্করার মাত্রা সঠিক রাখার জন্য ওষুধ চিকিৎসা পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কাটিয়ে উঠতেও প্রয়োজন হয় সুনির্দিষ্ট থেরাপি ও জীবনধারণ পদ্ধতি। এ সময় ওষুধ চালিয়ে যাওয়া পাশাপাশি নিয়মিত শরীরের অবস্থা তদারক করা হয়। ধীরে ধীরে সংযুক্ত করা হয় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করানোর থেরাপি, স্পষ্ট কথা বলার থেরাপি এবং সাইকোথেরাপি। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ প্রতিরোধের উপায় হেমোরেজ স্ট্রোক থেকে রক্ষা পেতে রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের মাত্রার দিকে বিশেষ ভাবে লক্ষ্য দেওয়া উচিত। এর জন্য যে জীবন ধারণে অভ্যস্ত হতে হবে, তার সর্বপ্রথম শর্ত হলো সুষম খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করা। নিত্য নৈমিত্তিক খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে ফল এবং সবজি। কারণ এগুলোতে রয়েছে পটাসিয়াম, ফাইবার, ফোলেট, ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি এর মতো পুষ্টি উপাদান। মিষ্টি ও সাদা আলু, কলা, বাদাম, টমেটো, মটরশুটি, এবং তরমুজের মতো পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার সঠিক রক্তচাপ বজায় রাখতে সাহায্য করবে। ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ পালং শাকও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে অপরিহার্য অবদান রাখে। আপেলে রয়েছে ফাইবার, যা কোলেস্টেরল কমানার জন্য সহায়ক। এর নাশপাতি যোগ করা হলে পাওয়া যাবে কোয়ারসেটিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি রক্ত জমাট বাঁধা, ধমনী শিথিল করতে এবং রক্ত প্রবাহ উন্নত করতে সাহায্য করে। সতর্ক থাকতে হবে লবণ এবং চিনি সমৃদ্ধ খাবারের ক্ষেত্রে। চিনি ও লবণের আধিক্য আইসিএইচের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এ রকম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পাশাপাশি চালিয়ে যেতে হবে নিয়মিত শরীর চর্চা। এই দুটি বিষয় যুগপৎ ভাবে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ধূমপান পরিত্যাগের কোনো বিকল্প নেই। একই সাথে দূরে থাকতে হবে কৃত্রিম ভাবে প্রক্রিয়াজাত ঠান্ডা পানীয়। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্যাভাস ও ব্যায়ামে নিয়ে আসতে হবে পরিমিতি বোধ। শুধু মাথা নয়, পুরো শরীরের নিরাপত্তায় সুরক্ষমুলক নিয়মগুলো মেনে চলা জরুরি। এগুলোর সাথে রাস্তাঘাটে হাটার সময় যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন, যানবাহনে চড়ার সময় সিটবেল্ট ব্যবহার করা, এবং সাবধানে গাড়ি চালানো সম্পৃক্ত। এছাড়া সাইকেল বা মোটরসাইকেল চালানোর সময় সর্বদা হেলমেট পরে নেওয়া জরুরি। SHARES স্বাস্থ্য বিষয়: উচ্চ রক্তচাপরক্তক্ষরণ