‘বয়কট ইন্ডিয়া’ হুজুগ ও বাস্তবতা

প্রকাশিত: ৩:৫৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৬, ২০২৪

আমাদের দেশ এমনিতেই হুজুগের দেশ। ফেসবুক আসার পর এই হুজুগের প্রকোপ অনেকগুণ বেড়েছে। কিছুদিন পর পর একটা করে হুজুগ আসে। ফেসবুকে এই নিয়ে ব্যাপক মাতামাতি হয়। তার পর আরেকটা নতুন ইস্যু আসে। পুরনো হুজুগ ভুলে সবাই আবার নতুন হুজুগে মত্ত হয়। সর্বশেষ ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ‘বয়কট ইন্ডিয়া’ ও ‘ইন্ডিয়া আউট’ হুজুগ। আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যেও এই ইস্যু নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যমেও এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা তর্কবিতর্ক চলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পণ্যসহ দেশটিকে ‘বয়কট’ করা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চলছে। যারা এসব প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত। এর সঙ্গে কয়েকটি ছোটখাটো রাজনৈতিক দলও যুক্ত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশির ভাগ পোস্টদাতা বলছেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভারত অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। এই কারণে তারা ভারতীয় পণ্য বয়কটেরও ডাক দিচ্ছেন।’

নির্বাচন হলো বাংলাদেশে, নির্বাচন করল আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগকে সহায়তা করল নির্বাচন কমিশন, পুলিশ এবং প্রশাসন, সংখ্যায় যত কমই হোক, ভোট দিল দেশের মানুষ, তা হলে তাদের বয়কট না করে কেন ইন্ডিয়াকে বয়কট করতে হবে? তা ছাড়া দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামিয়েছিল আমেরিকা। আমেরিকা কেন নির্বাচন শেখ হাসিনার বিজয়কে রুখতে পারল না? কোথায় তাদের ‘ভিসা নিষেধাজ্ঞা’? নির্বাচনের আগে অনেক হম্বিতম্বি করে নির্বাচনের পর তারা একেবারে চুপচাপ। এ যেন অনেকটা লেজ গুটিয়ে পলায়ন! ‘আওয়ামী লীগের কাছে এই শোচনীয় পরাজয়ের’ জন্য তো বরং আমেরিকাকে সবার আগে বয়কট করা উচিত। বয়কট করা উচিত আমেরিকার তৈরি ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-এক্স-লিংকডিন ইত্যাদি। তা না করে কেবল ভারতের পণ্য, ভারত বর্জন করতে হবে কেন? এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের শুধু ভারত নয়, চীন ও রাশিয়াও কাছাখোলা সমর্থন দিয়েছে। তাদের ব্যাপারে নীরবতা কেন?

আসলে মতলব ছাড়া আমাদের দেশে কোনো হুজুগই ডালপালা বিস্তারের সুযোগ পায় না। যারা ভারত ও ভারতীয় পণ্যের বিরোধিতায় নেমেছেন, তাদেরও বিশেষ মতলব আছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কোনোভাবেই সুবিধা করতে না পেরে তারা এখন নেমেছেন চিরাচরিত ও সহজ পথ ভারত বিরোধিতায়। কিন্তু এতে আদৌ কি কোনো ফায়দা হবে? নাকি প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এবং ঘৃণাকেই কেবল বাড়িয়ে তোলা হবে?

এমনিতেই আমাদের দেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি বেশ জনপ্রিয়। এ দেশের মানুষ ঘুরতে, চিকিৎসা করতে, পড়তে, কেনাকাটা ও ব্যবসা করতে দলে দলে ভারতে যায়। ভারতীয় টিভি চ্যানেল, সিনেমা-ওয়েবসিরিজ দেখে, ভারতীয় গান শোনে, আবার ভারত বিরোধিতায় সমানতালে অংশগ্রহণ করে। এ এক আশ্চর্য মনস্তত্ত্ব!

আমাদের দেশের ভারতবিদ্বেষ বা ভারত বিরোধিতা অনেকটাই রাজনৈতিক। ধর্মীয়ও বটে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি অবশ্য বরাবরই ভারত বিরোধিতাকে উপজীব্য করে রাজনীতি করেছে। এক সময় তারা দেয়ালে দেয়ালে লিখত : বিদেশে আমাদের কোনো প্রভু নেই, বন্ধু আছে। তারা বোঝাতে চাইত, ভারত হলো আওয়ামী লীগের প্রভু; কিন্তু তাদের বন্ধু! যদিও সম্প্রতি অনেক চেষ্টা-তদবির করেও বিএনপির নেতারা ভারতের নেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে পারেনি। মনোরঞ্জনে ব্যর্থ হয়ে তাই তারা এখন আবারও চিরায়ত ভারতবিদ্বেষী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে। এখনো ভারতবিরোধী আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামেনি বটে, কিন্তু বিএনপির সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীরাই ভারতীয় পণ্য বয়কটের আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

ভারত বিরোধিতার পেছনে যে কোনো কারণ নেই, তা নয়। দ্বিপাক্ষিক অনেক বিষয়ই আছে, যা সমালোচনার যোগ্য। তিস্তার পানি বণ্টনে সমস্যা, অসম বাণিজ্য, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি অনেক বিষয়ে ভারতের ভূমিকা মোটেও বন্ধুসুলভ নয়। বরং এসব ব্যাপারে এক ধরনের ‘দাদাগিরি’ লক্ষ করা যায়। যা দেশের মানুষ পছন্দ করে না। কিন্তু এর সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা মিশিয়ে আমাদের দেশে একটা মহল ভারতবিদ্বেষী মনোভাবকে চাঙ্গা করার ব্যাপারে খুবই যত্নশীল। তারা সফলও।

ভারত ও হিন্দুবিদ্বেষ এখন আমাদের সমাজের, বিশেষত যুব সমাজের একটা বড় অংশের, প্রাত্যহিক চেতনার অংশ। ভারতের সর্বনাশ কামনা করার মতো লোক জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ভারতবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক ভাবধারাপুষ্ট মানুষজন এখন সারাক্ষণ যৌক্তিক-ইস্যুগুলোর সঙ্গে অনেক মন গড়া ইস্যু যোগ করে ভারতবিরোধী প্রচারণার পালে হাওয়া দেয়। চায়ের দোকানের আড্ডা কিংবা পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠা অধুনা কিঞ্চিৎ নিষ্প্রভ, এখন রক্ত গরম করতে চাইলে মধ্যরাতে টেলিভিশন চ্যানেল আর অষ্টপ্রহর সোশ্যাল মিডিয়ায় মনোনিবেশ করতে হবে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সেই আসরে দুদণ্ড স্থির হয়ে ভেবে কিছু বলার জো নেই, বিভিন্ন মতামত বিচার করে মধ্যবর্তী কোনো অবস্থান নেওয়ার উপায় নেই, হয় তুমি ভারতীয়দের গালাগাল করো, না হলে তুমি দেশদ্রোহী, হয় তুমি ভারতকে শত্রু বলে মনে করো নচেৎ তুমি ভারতের দালাল। এই বুদ্ধিহীন আত্মরতিকে আর যা-ই হোক, রাজনীতি বলে না, সুস্থতাও বলে না।

অথচ সুস্থ রাজনীতির অনুশীলন এখন খুব দরকারি। ভারতের অনেক নীতি, বিশেষ করে সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা ও অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টন প্রশ্নে ভারতীয় সরকারের নীতি বাস্তবিকই আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী। এজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরও অনেক বেশি কূটনৈতিক উদ্যোগ দরকার। উভয় দেশের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিরও দরকার আছে। কিন্তু গালাগাল-চিৎকার আর ঘৃণা-বিদ্বেষ দিয়ে এই বিপদের মোকাবিলা করা যাবে না, বরং তাতে জটিলতা বাড়বে। বাড়ছেও।

দেশে ভারতবিরোধী চেতনা বিস্তারের পেছনে ধর্ম একটা বড় কারণ। পাকিস্তানকে এখনো বাংলাদেশের যত মানুষ বন্ধু ভাবে, তার মূল কারণ ধর্ম। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের ঘটানো গণহত্যা, নিপীড়ন তাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখার কারণেও তারা ভারতকে অপছন্দ করে। চীন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকলেও এ বিষয়ে তাদের কোনো ক্ষোভ দেখা যায় না। তাদের যুক্তি, এখন তো চীন বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি করছে না। চীন সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। পরে মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে কোনো সমালোচনা নেই।

স্বাধীনতার সময় থেকেই আমাদের দেশে ভারতবিরোধী প্রচারণা দানা বাধতে থাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যরা যাওয়ার সময় সবকিছু নিয়ে গেছে, এই প্রচারণা এতটা তীব্র ছিল যে, তা মানুষের মনে স্থায়ী আসন করে নেয়। যদিও পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর কিছু অস্ত্র ছাড়া ভারত অন্য কোনো সম্পদ বাংলাদেশ থেকে নিয়ে গেছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ভারত যে এত দ্রুত নিজেদের সৈন্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিল, তা খুব একটা আলোচনায় আসে না।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এ দেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি তীব্র হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকরণের জন্য ভারতবিরোধিতা পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হয়েছিল। বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের ভুল নীতি এবং সেই কঠিন সময়ের আওয়ামী লীগের দুর্বল রাজনীতির সুযোগ নিয়ে তারা সফলও হয়। বঙ্গবন্ধু-আওয়ামী লীগের প্যারালাল জিয়াউর রহমান-বিএনপি দাঁড়িয়ে যায়।

বিএনপি মনোভাবাপন্ন প্রায় সব মানুষ বিশ্বাস করেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে ভারতের সায় ছিল। এসব ভিত্তিহীন অনুমাননির্ভর অভিযোগ বিশ্বাস করার মতো মানুষ দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাদেরই সর্বশেষ কর্মসূচি হচ্ছে ‘বয়কট ইন্ডিয়া।’ যদিও ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলনে ভারতবিদ্বেষকে তীব্র করা ছাড়া আর কোনো ফায়দা মিলবে বলে মনে হয় না। যে পণ্য সস্তায় ও সহজে পাওয়া যায়, সেটা মানুষ কিনবেই। সেটা ভারত থেকেই আসুক, আর ইসরাইল থেকেই আসুক। প্রচারণা চালিয়ে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেটা বন্ধ করা যাবে না। বরং এতে ধর্মীয় বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া হবে। যারা ভারত বিরোধিতায় মগ্ন, তারা আসলে ধর্মীয় বিভাজনকেও বাড়িয়ে তুলতে চাইছেন।

এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ভারত আমাদের সবচেয়ে বৃহৎ প্রতিবেশী, বাণিজ্য থেকে জাতীয় নিরাপত্তা, নদীর পানি থেকে পেঁয়াজ, অনেক ব্যাপারেই এই দেশটির ওপর আমাদের নির্ভরশীল থাকতে হয়। ফলে সমতার সম্পর্ক নিয়ে যত কথাই বলি না কেন, ভারতের ইতিবাচক মনোভাবের ওপর আমাদের অনেকটাই নির্ভরশীল হতে হয়। বাংলাদেশ ও ভারত ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ, কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক সমতার ভিত্তিতে স্থাপিত হয়নি। বস্তুত এই দুই দেশের আয়তন ও প্রভাবের মধ্যে ফারাক এত বিপুল যে, চট করেই অর্থপূর্ণ সমতা আশা করা কঠিন। দুই রাষ্ট্রই পারস্পরিক স্বার্থের সর্বোচ্চ উপযোগ গ্রহণের নীতিতে চালিত হতে হয়। এতে করে ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সব সময় বঞ্চনার পাত্রটিকেই বহন করতে হয়। তবে যুদ্ধ করে, বয়কট করে এ সমস্যার কোনো সমাধানে উপনীত হওয়া যাবে না। সমস্যা সমাধানে লাগসই কূটনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।