সন্তানদের সাফল্য স্বীকৃতি • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে প্রধানমন্ত্রীর অনন্য উদ্যোগ

প্রকাশিত: ৪:৪৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

কোনো দেশের প্রকৃত শক্তি ও সমৃদ্ধি কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের উচ্চ সূচক কিংবা বিশাল ভৌত অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কতটা সম্মানজনক স্থান দখল করবে, তা নির্ভর করে সেই দেশের তরুণ প্রজন্মের নৈতিকতা, মানবসম্পদের গুণগত মান এবং জ্ঞানার্জনের গভীরতার ওপর। সম্প্রতি সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১৩৩টি দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে বাংলাদেশের চারজন তরুণ হাফেজ ও হাফেজা যে অভূতপূর্ব গৌরব বয়ে এনেছেন, তা কেবল ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত সাফল্যের উদযাপনে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁদের এই বিশ্বমঞ্চের বিজয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবর্ধনা জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, তা আমাদের দেশের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার জন্য এক নতুন যুগের বার্তা বহন করে।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, দেশের সন্তানরা তাঁদের মেধা, পরিশ্রম ও যোগ্যতা দিয়ে ভালো যা কিছুই অর্জন করুক না কেন, সরকার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সেই অর্জনকে স্বীকৃতি দেবে এবং মূল্যায়ন করবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ছেলেরা ও মেয়েরা যেন নিজেদের, দেশের এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষের জন্য গৌরব ও সম্মান বয়ে আনতে পারে, রাষ্ট্র তার পুরো শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে তাঁদের পাশে থাকবে। এই বক্তব্যটির তাৎপর্য অনেক গভীরে প্রোথিত।

এর পেছনে রয়েছে এক বিরাট সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শন—সমাজে ভালো কাজকে দৃশ্যমান করা, অন্যায়ের বিপরীতে সুন্দরের চর্চাকে উৎসাহিত করা, মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং বিপথগামী তরুণ প্রজন্মের সামনে নতুন আশার আলো জ্বালানো। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো শিক্ষার অপরিহার্যতা বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, “If a man neglects education, he walks lame to the end of his life”—অর্থাৎ, যদি কোনো মানুষ শিক্ষাকে অবহেলা করে, তবে সে সারা জীবন খোঁড়া হয়েই বেঁচে থাকে। আজকের বাংলাদেশে তরুণদের মেধা ও শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের এই উদ্যোগ মূলত পুরো জাতিকে সেই মানসিক পঙ্গুত্ব থেকে বের করে আনারই এক সাহসী প্রয়াস।

এখানে একটি মৌলিক সত্য আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। একজন তরুণ যখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন, তখন সেই অর্জন আর একক ব্যক্তির থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক সার্বজনীন জাতীয় গৌরব। তিনি একজন গণিতবিদ হতে পারেন, একজন চিকিৎসাবিদ, প্রকৌশলী, ক্রীড়াবিদ, খুদে বিজ্ঞানী, কোনো অনন্য উদ্যোক্তা, শিল্পী কিংবা আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ—বিশ্বমঞ্চে যখন তাঁর মাথায় জয়ের মুকুট ওঠে, তখন একই সঙ্গে বিশ্বদরবারে উচ্চারিত হয় বাংলাদেশের নাম।

ফলে রাষ্ট্র যখন তার এই যোগ্য সন্তানকে সংবর্ধিত করে, তখন কেবল একজন ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হয় না; বরং গোটা সমাজকে এই বার্তা দেওয়া হয় যে, রাষ্ট্র সততা, মেধা ও শ্রমের মর্যাদা দিতে জানে। বিখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী জন ডিউই বলেছিলেন, “Education is not preparation for life; education is life itself”—অর্থাৎ শিক্ষা জীবনের কেবল কোনো প্রস্তুতি নয়; শিক্ষাই হলো জীবন। তরুণদের প্রতিটি বৈশ্বিক সাফল্যকে রাষ্ট্র যখন জীবনের প্রধান অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন তা অন্য লাখ লাখ তরুণের মনে নতুন কিছু করার স্বপ্নের বীজ বপন করে।

অথচ আমাদের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটের দিকে চোখ রাখলে এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও আতঙ্কের দৃশ্য ভেসে ওঠে। পুরো সমাজ যেন আজ এক মারাত্মক ‘নৈতিকতার দুর্ভিক্ষে’ আক্রান্ত। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শহরের অলিগলিতে আজ গড়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’। উঠতি বয়সের তরুণরা, যাদের হাতে থাকার কথা ছিল বই, খেলাধুলার সরঞ্জাম বা গবেষণার কাজ, তারা আজ তুচ্ছ কারণে রক্তক্ষয়ী সহিংসতা, অস্ত্রবাজি এবং জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের অশুভ ছায়া দেশের যুবসমাজকে এক গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

নীতি-নৈতিকতা ও সুশিক্ষার অনুপস্থিতিতে তরুণদের একটি বড় অংশ রাতারাতি ধনকুবের হওয়ার লোভে জড়িয়ে পড়ছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও জমি দখলের মতো অপরাধে। বহু শতাব্দী পূর্বে প্রাচীন রোমান দার্শনিক সিসারো লিখেছিলেন, “The good of the people is the chief law”—অর্থাৎ, জনগণের কল্যাণই হলো রাষ্ট্রের প্রধান আইন। কিন্তু যখন দেশের তরুণ শক্তিই অপরাধের সাগরে নিমজ্জিত হয়, তখন সেখানে জনগণের কল্যাণ বা রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই সামাজিক অবক্ষয় ও নীতিহীনতার শিকড় কিন্তু একদিনে গজায়নি। বিগত স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার আমলে পরিকল্পিতভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। মানহীন পরীক্ষা পদ্ধতি, দলীয়করণ এবং নীতিশিক্ষার বিসর্জন দিয়ে একটি মেধাহীন ও মেরুদণ্ডহীন প্রজন্ম তৈরির অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের হিসাবে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মোট তরুণদের প্রায় অর্ধেকই অত্যন্ত নিম্নমজুরির কাজ বা অনানুষ্ঠানিক শ্রমে নিয়োজিত ছিল। এই চিত্রটি প্রমাণ করে যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের সঠিক দক্ষতা ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কতটা ব্যর্থ হয়েছিল।

শিক্ষার এই শোচনীয় রূপ আরও স্পষ্ট হয় সাম্প্রতিক কিছু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিসংখ্যানে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের ‘লার্নিং পভার্টি ব্রিফ’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি শেষ করতে যাওয়া প্রায় ৫১ শতাংশ শিশু তাদের বয়স অনুযায়ী একটি সহজ লেখা পড়ে বোঝার মতো মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ MICS 2025-এর অতি সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পড়ার এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনার দক্ষতা রয়েছে।

আরও শঙ্কার বিষয় হলো, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার হার ৮৩.৭ শতাংশ হলেও নিম্ন মাধ্যমিকে তা কমে দাঁড়ায় ৬৯.৩ শতাংশে এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় অতিক্রম করতে করতে তা মাত্র ৪৩.৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষার আলো থেকে মাঝপথেই ছিটকে পড়ছে। এই পরিসংখ্যান আমাদের কড়া নাড়ে এবং এক নির্জলা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—শুধু বহুতল বিদ্যালয় ভবন তৈরি করা বা শিশুদের স্কুলে নাম লেখানোই শিক্ষা নয়; আসল শিক্ষা হলো শেখা, অর্জন করা এবং তা জীবনচর্চায় নামানো।

ঠিক এই জায়গাতেই শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা ও মানবতাবোধের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। শিক্ষা বলতে আমরা যদি কেবল জিপিএ-৫ পাওয়া, সনদ অর্জন করা কিংবা কোনো মতে একটি ভালো চাকরি বাগানো বুঝি, তবে সেই শিক্ষা হবে চরমভাবে অসম্পূর্ণ এবং সমাজের জন্য বিপজ্জনক। চরিত্রহীন বা নৈতিকতাহীন শিক্ষার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “Knowledge without character is a sin”—অর্থাৎ, চরিত্রহীন জ্ঞান বা নীতিহীন শিক্ষা হলো এক ধরনের মহাপাপ। প্রকৃত শিক্ষা কেবল মানুষকে ডিগ্রি দেয় না; তা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তিবাদী করে তোলে, অন্যের অধিকার ও মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শেখায়, নিজের নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য উপলব্ধি করায় এবং ভুল থেকে শিখে একজন ভালো মানুষ হতে সাহায্য করে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর (UNESCO) শিক্ষা-দর্শনও এই বিষয়টির ওপরই সর্বাধিক জোর দেয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG 4.7) অধীনে জাতিসংঘ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে টেকসই উন্নয়ন, মৌলিক মানবাধিকার, শান্তি, অহিংসা, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ইউনেস্কো মনে করে, শিক্ষা কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; শিক্ষা হলো এমন মূল্যবোধ, মানসিকতা, দক্ষতা ও আচরণের সমষ্টি, যা একটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। অতএব, একজন বিশ্বমানের নাগরিক হওয়া মানে কেবল অনর্গল বিদেশি ভাষায় কথা বলা বা প্রযুক্তির ডিভাইস ব্যবহার করতে পারা নয়। বিশ্বমানের নাগরিক হলেন তিনি, যিনি একাধারে জ্ঞানী, প্রযুক্তিতে দক্ষ, সহনশীল, নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং নিজ দেশের পাশাপাশি পুরো পৃথিবীর কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ।

বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডির ভেতরে আটকে নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার মহান জননেতা নেলসন ম্যান্ডেলা শিক্ষার চিরন্তন শক্তি সম্পর্কে বলেছিলেন, “Education is the most powerful weapon which you can use to change the world”—অর্থাৎ, পৃথিবীটাকে বদলে দেওয়ার জন্য শিক্ষাই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী মারণাস্ত্র। আমাদের তরুণদের আজ সেই সুশিক্ষার মারণাস্ত্রে সজ্জিত করতে হবে। মাদক, সন্ত্রাসী গ্যাং-কালচার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির গ্রাস থেকে তাদের ফিরিয়ে এনে উদ্ভাবন, গবেষণা, জ্ঞান ও মূল্যবোধের আলোয় বিকশিত করতে না পারলে বাংলাদেশ কখনো তার স্বপ্নের সোনার বাংলা বা উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর হতে পারবে না।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই রূপকল্প নিঃসন্দেহে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর আনবে। অপরাধী ও অপরাধের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতা বা জেল-জরিমানা যথেষ্ট নয়; বরং সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে হলে ভালো কাজের ইতিবাচক স্বীকৃতি বা ‘পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট’ অত্যন্ত জরুরি। যখন দেশের লাখ লাখ তরুণ দেখতে পাবে যে, অপরাধ ও ক্ষমতার মোহের চেয়ে মেধা, ধর্মীয় শিক্ষা, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও সততার পথ ধরে অর্জিত সাফল্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ সম্মানিত হচ্ছে, তখন তারা অপরাধের অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে আসতে অনুপ্রাণিত হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সন্তানদের শুভ ও গঠনমূলক অর্জনকে রাষ্ট্রের অবস্থান থেকে পুরস্কৃত করার যে ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ভঙ্গুর নৈতিকতাকে নতুন করে পুনর্গঠন করবে। এই কল্যাণকর চিন্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনই বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবমুখী চালিকাশক্তি—এ বিষয়ে আমাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।