আমরা কি মানুষ, নাকি বায়োলজিকাল গার্বেজ?

প্রকাশিত: ১২:৪১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬

সকাল হতেই নিভৃতে যতনে সুইডিশ মালারেনের অপূর্ব রূপের মহিমায় শরতের আগমন দেখতে দেখতে মনে হলো, এত বড় এই মহাকাশের চারদিকে কী আছে, আর কী নেই, তা নিয়ে পৃথিবীর মানুষ কত কিছুই না ভাবছে! কোথায় এর শেষ, আদৌ কোনো শেষ আছে কি না, কত কোটি কোটি নক্ষত্র, কত গ্রহ, কত অজানা জগত! মানুষ আজ মহাকাশের গভীরে তাকাচ্ছে, দূরবর্তী গ্রহের সন্ধান করছে, এমন সব বিষয় জানার চেষ্টা করছে, যার কথা হয়তো একসময় কল্পনাও করা যেত না।

আমি ভাবছি, এই বিশাল মহাকাশের কোনো এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে জীবনের এতগুলো বছর পার করে দিলাম। স্রষ্টার সৃষ্টি কত বিশাল, কত বিচিত্র, কত সুন্দর, কত অজানা। অথচ তার কতটুকুই বা দেখা হলো? কতটুকুই বা জানা হলো?

জীবনের বড় একটি সময় কেটে গেল মানুষের তৈরি সমস্যার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে। সংসার, দায়িত্ব, অর্থ, কাজ, সাফল্য, ব্যর্থতা, সম্পর্ক, সমাজ, রাষ্ট্র, একটির পর একটি ঢেউ এসে জীবনকে ব্যস্ত রেখেছে। কখনো মনে হয়নি, একটু থামি, মাথাটা ওপরে তুলি, দেখি, আমি আসলে কোথায় আছি।

জীবনের এই প্রান্তে এসে তাই কখনো কখনো প্রশ্ন জাগে, আমি কি সত্যিই জীবনকে দেখেছি, নাকি শুধু জীবনের সমস্যাগুলোই দেখে গেছি? হয়তো প্রশ্নটি শুধু আমার নয়। হয়তো আমাদের অনেকেরই।

আমরা মানুষ জাতি। এই অসীম মহাকাশের একটি ছোট্ট গ্রহে আমাদের বসবাস। আমাদের চারপাশে স্রষ্টার সৃষ্টি, অথচ আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য এমন এক পৃথিবী তৈরি করেছি, যেখানে অনেক সময় আমরা যেন একটি দুর্গন্ধময় ডাস্টবিনের মধ্যে পড়ে আছি। সেই ডাস্টবিনের আবর্জনা আমাদেরই তৈরি, লোভ, দুর্নীতি, হিংসা, অবিচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, যুদ্ধ, প্রতারণা, বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, অন্যের প্রতি অবিশ্বাস এবং সীমাহীন ভোগের আকাঙ্ক্ষা।

দুর্গন্ধটা এত বেশি যে আমরা অনেক সময় আকাশের নির্মলতা অনুভব করার সুযোগই পাই না। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, আমরা সেই দুর্গন্ধের সঙ্গে বসবাস করতেও শিখে যাচ্ছি।

কোনো সমাজে একটি অন্যায় দীর্ঘদিন চলতে থাকলে একসময় সেটি আর অস্বাভাবিক বলে মনে হয় না। দুর্নীতি নিয়ে আমরা কথা বলি, অবিচার নিয়ে কথা বলি, অনিয়ম নিয়ে কথা বলি, রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে কথা বলি, সামাজিক অবিশ্বাস নিয়ে কথা বলি। কিন্তু কথা বলতে বলতে এমন একটি জায়গায় পৌঁছে যাই, যেখানে সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করাটাই যেন সমস্যার সমাধানের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।

তখন একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন, আমরা কি সত্যিই সমস্যার সমাধান চাই, নাকি সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে গেছি?

কারণ কোনো সমস্যাকে দীর্ঘদিন সহ্য করতে করতে মানুষ শুধু সমস্যার সঙ্গে অভ্যস্ত হয় না, একসময় নিজের ভেতরেও তার জায়গা করে দেয়। তখন অন্যায় দেখে বিস্মিত হই না, অনিয়ম দেখে প্রশ্ন করি না, মিথ্যা শুনে থেমে যাই না। বরং ভাবি, এটাই তো স্বাভাবিক। এখানেই বিপদটা সবচেয়ে গভীর।

আরও পড়ুন

মোবাইলের পর্দায় হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের শৈশব

একটি জাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো শুধু দুর্নীতি নয়, শুধু অবিচার নয়, শুধু রাজনৈতিক বিভাজনও নয়। আরও বড় সমস্যা হতে পারে, অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার মানসিকতা।

যে সমাজ অন্যায় দেখে অভ্যস্ত হয়ে যায়, সেখানে অন্যায়কে আর অন্যায় বলে কে? আমরা প্রায়ই বলি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে হবে। কিন্তু আমরা তাদের জন্য কী রেখে যাচ্ছি?

বাড়ি, জমি, সম্পত্তি, টাকা-পয়সা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি আমরা কি তাদের এমন একটি পৃথিবীও দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে তারা প্রশ্ন করতে শিখবে? অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখবে? প্রকৃতিকে ভালোবাসবে? অন্য মানুষের প্রতি সম্মান দেখাবে? নাকি আমরা তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি আমাদের ভয়, আমাদের বিভাজন, আমাদের পক্ষপাত এবং অন্যায় মেনে নেওয়ার অভ্যাস?

শিশুরা শুধু আমাদের কথা শুনে শেখে না। তারা আমাদের আচরণ দেখে শেখে।

আমরা পৃথিবীকে যেভাবে দেখি, তারাও ধীরে ধীরে সেভাবেই দেখতে শেখে। আমরা কোন অন্যায়ের সামনে চুপ থাকি, কোন মিথ্যাকে সুবিধার জন্য মেনে নিই, কোন মানুষকে তার পরিচয়ের কারণে ছোট করি, কোন বিষয়ে সত্য জানার পরও মুখ ফিরিয়ে নিই, এসবই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এক ধরনের শিক্ষা হয়ে যায়।

তাহলে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য উত্তরাধিকার কী? টাকা-পয়সা, সম্পত্তি বা প্রযুক্তি নয়, বরং চিন্তার ধরন।

মানুষের জ্ঞান বাড়ছে। প্রযুক্তি বাড়ছে। তথ্যের পরিমাণ বাড়ছে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ করা যাচ্ছে। মানুষ মহাকাশে যাচ্ছে, নতুন গ্রহের সন্ধান করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি একই সঙ্গে নিজেকে প্রশ্ন করার ক্ষমতাটাও বাড়াচ্ছি? কারণ জ্ঞান আর প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়। তথ্য আর উপলব্ধিও এক নয়।

মানুষ মহাকাশের রহস্য বুঝতে চায়, কিন্তু নিজের ভেতরের অন্ধকার বুঝতে অনেক সময় অনিচ্ছুক। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও শক্তিশালী করছি, কিন্তু নিজের বিবেককে কতটা সচল রাখছি? আমরা মানুষের মধ্যে যোগাযোগের অসংখ্য মাধ্যম তৈরি করেছি, কিন্তু মানুষে মানুষে বিশ্বাস কতটা বাড়াতে পেরেছি?

হয়তো মানুষের জীবনে সবচেয়ে বিপজ্জনক অনুপস্থিতি সময়ের নয়, অর্থের নয়, শিক্ষারও নয়, বিবেকের উপস্থিতির।

বিবেক যখন জেগে থাকে, তখন মানুষ নিজের সুবিধার বিরুদ্ধেও সত্যকে দেখতে পারে। নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে অস্বস্তি বোধ করে। কিন্তু বিবেক যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন মানুষ অনেক কিছু জানার পরও কিছু না জানার মতো আচরণ করতে পারে।

তখন ডাস্টবিনের দুর্গন্ধও আর দুর্গন্ধ মনে হয় না।

আমরা মানুষ। পথভ্রষ্ট হতে পারি, ভুল করতে পারি, নিজেদের তৈরি আবর্জনার মধ্যে পড়ে যেতে পারি। কিন্তু সেই অবস্থাকে মেনে নেওয়াই কি আমাদের দায়িত্বের শেষ? নিশ্চয়ই নয়। মানুষ সৃষ্টি হয়েছে শুধু সহ্য করার জন্য নয়, চিন্তা করার জন্যও; শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, নিজের ভুল বুঝে ফিরে আসার জন্যও।

অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া, দুর্নীতির সঙ্গে বসবাস করা, বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে রাখা এবং তারপর সবকিছুকে নিয়তি বলে চালিয়ে দেওয়া, এভাবে কি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? যদি আমরা জানি যে আমরা ভুল পথে আছি, তাহলে ফিরে আসার চেষ্টাটুকুও কি আমাদের দায়িত্ব নয়?

আমরা হয়তো সেই জায়গাতেই পৌঁছে যাচ্ছি।

স্রষ্টার সৃষ্টি কত সুন্দর, তা নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের শেষ নেই। কিন্তু নিজেদের তৈরি পৃথিবীর আবর্জনা পরিষ্কার করার দায়িত্বটি আমরা অন্য কারও হাতে তুলে দিতে চাই।

মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা নতুন পৃথিবীর সন্ধান করছি। অথচ যে পৃথিবীতে আমরা এখন বাস করছি, সেটিকে বাসযোগ্য রাখার দায়িত্ব কতটা পালন করছি?
প্রশ্নটি তাই শুধু মহাকাশ নিয়ে নয়। প্রশ্নটি মানুষকে নিয়ে, আমাদের নিয়ে। আমরা কোথায় যেতে চাই, তার আগে হয়তো জানতে হবে, আমরা এখন কোথায় পড়ে আছি?

হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় অভিযাত্রা এখনো মহাকাশে শুরু হয়নি। শুরু হতে পারে নিজের ভেতর থেকে। নিজের তৈরি আবর্জনা সরিয়ে, নিজের বিবেককে জাগিয়ে, নিজের চারপাশটাকে একটু পরিষ্কার করে, মাথাটা একবার ওপরে তুলে তাকিয়ে দেখা, এই অসীম সৃষ্টির মধ্যে আমরা আসলে কত বড় একটি সুযোগ পেয়েছি বেঁচে থাকার।

মহাকাশ কত বড়, তা হয়তো মানুষ একদিন আরও ভালোভাবে জানতে পারবে। কিন্তু তার আগে আমাদের একটি ছোট প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা দরকার, আমরা কি সত্যিই মানুষ হয়ে বেঁচে আছি, নাকি শুধু একটি জীবন্ত দেহ হিসেবে পৃথিবীর ডাস্টবিনে পড়ে আছি?

রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com

এমআরএম