‘জীবনের বড় ভুল সিদ্ধান্ত প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে বাড়ি চলে আসা’

প্রকাশিত: ৩:১২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬

‘মা, প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে’—দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, অভাব আর অপেক্ষার পর মাকে এই কথাটিই জানিয়েছিলেন রাহুল দাস। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো বদলে যাবে পরিবারের ভাগ্য। শেষ হবে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা। কিন্তু নিয়োগপত্র বিতরণের দিন সেই আনন্দই পরিণত হয়েছে হতাশায়। সব ধাপ পেরিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও শেষ মুহূর্তে নিয়োগপত্র পাননি তিনি।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, মাকে এখনো সেই খবরটি জানাতে পারেননি রাহুল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি লিখেন, ‘যে মুখ দিয়ে মাকে বলছিলাম মা প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে, সেই মুখ দিয়ে এখন মাকে কীভাবে বলব, মা ভেরিফিকেশনে আটকাই দিছে।’

রাহুল দাস কবি নজরুল সরকারি কলেজের ১৭-১৮ সেশনের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটের বানিয়াচংয়ে। পড়াশোনা শেষে দীর্ঘদিন এলাকায় থেকেই চাকরির জন্য চেষ্টা করছিলেন তিনি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পর মনে করেছিলেন, দীর্ঘ বেকারত্বের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু নিয়োগপত্র না পাওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তিনি।

নিজের ফেসবুক পোস্টে রাহুল লিখেন, ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক’ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণিকক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই সময়ে হাওরে মাছ ধরে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির চেষ্টা করতে হচ্ছে।’

তিনি আরও লিখেন, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন বেকার বসে থাকার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হয়েছে। তার ভাষায়, সৃষ্টিকর্তা সহায় থাকলে হয়তো এই চাকরি দিয়ে সারাজীবন কাটাতে হবে না, তবে দীর্ঘদিন ধরে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অপেক্ষায় না রেখে এই মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটানো প্রয়োজন।

রাহুলের নিয়োগপত্র না পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন বন্ধু, সহপাঠী ও পরিচিতজনেরা। তারা পুলিশ ও এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাহুলসহ নিয়োগবঞ্চিতদের দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কানজিল রায় জীবন তার ফেসবুক পোস্টে রাহুলের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, রাহুলকে ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’ প্রক্রিয়ার কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তার ভাষ্য, ব্যক্তিগতভাবে রাহুলকে চেনেন এবং তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সাক্ষী তিনি।

কানজিল রায় জীবন লিখেন, রাহুলের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন তরুণ বহু বাধা পেরিয়ে নিজের মেধা ও পরিশ্রমে সরকারি চাকরিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার মতে, ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার কারণে এমন প্রার্থীদের নিয়োগ আটকে দেওয়া হলে তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাহুলের সহপাঠী ও পরিচিত সজল দাসও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেন, রাহুলকে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের গেজেট থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি তাকে বিস্মিত করেছে। তার দাবি, তারা একসঙ্গে রিডিং রুমে বহু রাত পড়াশোনা করেছেন এবং রাহুল অত্যন্ত পরিশ্রমী। কী ধরনের তদন্তের ভিত্তিতে তার চাকরি আটকে দেওয়া হলো, সেটিও জানতে চান তিনি।

আরেক পরিচিত পঙ্কজ দাস লিখেন, ঢাকায় কয়েক দিন রাহুলের সঙ্গে থাকার সময় তিনি নিজ চোখে দেখেছেন, রাহুল সারারাত পড়াশোনা করতেন এবং সকালে টিউশনি করতে বেরিয়ে যেতেন। তার প্রশ্ন, এমন একজন পরিশ্রমী মানুষের চাকরি কেন বাদ পড়বে?

বিষ্ণু রায়ও রাহুলের পরিশ্রমের কথা তুলে ধরে তার নিয়োগ আটকে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, প্রথম বর্ষ থেকেই হলের রিডিং রুমে রাহুলকে নিয়মিত পড়াশোনা করতে দেখেছেন।

এদিকে নাসিম নামে আরেকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, পুলিশ ও এনএসআই ভেরিফিকেশনের কারণে যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তিনি নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানান।

রাহুলের কষ্টের গল্প ছুঁয়ে গেছে আরও অনেককে। লিমন হালদার নামে একজন হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে লিখেছেন, একদিন তার দাদা রুবেল ভোরে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছিলেন, হাওরের বাঁধ ভেঙে তাঁদের সব ফসল তলিয়ে গেছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাওর অঞ্চলের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে কতটা অশ্রু ও ঘাম বিসর্জন দিতে হয়, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন।

একদিকে দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, অন্যদিকে পরিবারের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে সরকারি চাকরির নিয়োগপত্রটি রাহুলের কাছে শুধু একটি চাকরি ছিল না; ছিল বহু বছরের সংগ্রামের পর পাওয়া একটি আশার নাম। সেই আশার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও এখন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন অনিশ্চয়তার সামনে।

তবে রাহুলের নিয়োগ কেন আটকে গেছে, ভেরিফিকেশনে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে কিংবা কোন কারণে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।