প্রাথমিক শিক্ষা: স্যার, আবার কবে আসবেন?

প্রকাশিত: ৪:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২৬

গুরুদাস ঢালী

সুন্দরবন উপকুলের একটি গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি। শিশুরা প্রথম শ্রেণি থেকেই চার-পাঁচজন শিক্ষককে দেখছে। কোন স্যার কোন কথাটা কীভাবে বলবেন, কোন আপা কখন বোর্ডে কী লিখবেন, তা তাদের প্রায় মুখস্থ। একদিন পাশের গ্রামের বিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষক এসে গণিতের ক্লাস নিলেন। তিনি ভগ্নাংশ বোঝালেন রুটি ভাগ করে, গল্প বলে, শিশুদের দলে ভাগ করে। ঘণ্টা শেষে শিশুরা জিজ্ঞেস করল, স্যার, আবার কবে আসবেন?

বিজ্ঞাপন

এই ছোট্ট প্রশ্নটির মধ্যে লুকিয়ে আছে শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি পুরনো সত্য। শিশু শেখার মধ্যে বৈচিত্র্য চায়, নতুন কণ্ঠ, নতুন কৌশল, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি চায়। অথচ আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন শিশু পাঁচ বছর প্রায় একই শিক্ষকদের একই ধরনের শিক্ষণের মধ্যে বড় হয়।

এই লেখার প্রস্তাব সরল

নিয়ম করে, পরিকল্পনা মেনে উপজেলার বা পাশ্ববর্তী বিদ্যালয়ের দক্ষ শিক্ষকেরা অন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে পাঠ দেবেন। একে আমরা বলছি প্যানেল শিক্ষক ব্যবস্থা। তথ্য, শিখন তত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যাক, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এটি কেন জরুরি এবং কীভাবে সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

প্যানেল শিক্ষক কী এবং কী নয়

প্যানেল শিক্ষক হলেন উপজেলার বাছাই করা এমন কিছু দক্ষ শিক্ষক, যারা নির্ধারিত সময়সূচি মেনে নিজের বিদ্যালয়ের বাইরে অন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস নেবেন। প্রতিটি উপজেলায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, চারুকলা ও শারীরিক শিক্ষার মতো বিষয়ভিত্তিক একটি ছোট দল থাকবে। দলের প্রত্যেক সদস্য মাসে এক বা দুইবার আশপাশের কোনো বিদ্যালয়ে গিয়ে একটি বা দুটি পাঠ নেবেন, আর সেই ক্লাসে উপস্থিত থাকবেন ওই বিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষক।

এখানে একটি শব্দগত স্পষ্টতা দরকার। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ‘প্যানেল’ শব্দটি সাধারণত নিয়োগের অপেক্ষমাণ তালিকা অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন প্যানেল থেকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ। এই লেখায় প্যানেল শিক্ষক বলতে সেই অর্থ বোঝানো হচ্ছে না; বোঝানো হচ্ছে ঘুরে ঘুরে পাঠ দেওয়া অতিথি শিক্ষকদের একটি দল। প্যানেল শিক্ষক পরিদর্শকও নন। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিদর্শনে মূল্যায়ন ও জবাবদিহির বিষয় থাকে, ফলে শিক্ষক ও শিশু দুজনেই চাপে থাকেন। প্যানেল শিক্ষক আসবেন সহকর্মী হিসেবে, নম্বর দিতে নয়, পড়াতে আর পারস্পরিক শিখতে। একজনের কাজ তদারকি, অন্যজনের কাজ শিক্ষণ।

নতুন কোনো অবকাঠামোও এর জন্য লাগবে না। ১৯৯৭ সাল থেকে দেশের ৫০৫টি উপজেলা বা থানায় উপজেলা রিসোর্স সেন্টার (ইউআরসি) শিক্ষকদের চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সাব-ক্লাস্টার প্রশিক্ষণেও আশপাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নিয়মিত একসঙ্গে বসেন। প্যানেল শিক্ষক ব্যবস্থা সেই প্রশিক্ষণ কক্ষের জ্ঞানকে নিয়ে যাবে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে, শিশুদের সামনে।

বিজ্ঞাপন

শিশু কেন বৈচিত্র্য চায়: শিখন তত্ত্ব কী বলে

মনোবিজ্ঞানে একটি চেনা ধারণা হলো অভ্যস্ততা বা হ্যাবিচুয়েশন। একই উদ্দীপক বারবার এলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে তাতে সাড়া দেওয়া কমিয়ে দেয়। পাঁচ বছর একই বাচনভঙ্গি, একই উদাহরণ, একই প্রশ্নের ধরন শিশুর কাছে এক সময় পটভূমির শব্দে পরিণত হয়।

নতুনত্ব যে শিখনকে জোরালো করে, তার একটি আকর্ষণীয় প্রমাণ এসেছে আর্জেন্টিনার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। বুয়েনোস আইরেসের আটটি স্কুলের ৭ থেকে ৯ বছর বয়সী ১ হাজার ৬৭৬ জন শিশুর ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, গল্প পড়ার এক ঘণ্টা আগে বা পরে একটি নতুন ধরনের ক্লাস হলে পরের দিন শিশুরা গল্পটি অনেক ভালো মনে রাখতে পারে। সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, গবেষকেরা নতুন ক্লাসের একটি শর্ত রেখেছিলেন; পাঠ দেবেন শিশুদের অচেনা একজন দক্ষ শিক্ষক। আর একই ক্লাস পরপর কয়েক সপ্তাহ পুনরাবৃত্তি করে চেনা বানিয়ে ফেললে সেই সুফল আর পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

এই ফলাফলকে সতর্কতার সঙ্গে পড়াও জরুরি। শব্দ শেখার একটি পরীক্ষায় নতুনত্বের এমন কোনো প্রভাব পাওয়া যায়নি অর্থাৎ নতুনত্ব জাদুমন্ত্র নয়, তবে প্রাথমিক স্কুলের বাস্তব পরিবেশে এর ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত গুরুত্ব দেওয়ার মতো।

শিখনের ধ্রুপদী তত্ত্বগুলোও একই দিকে ইঙ্গিত করে। আলবার্ট বান্ডুরার সামাজিক শিখন তত্ত্ব অনুযায়ী, শিশু অনুকরণীয় মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে শেখে। যত বেশি ভিন্ন ধরনের আদর্শ সে দেখবে, তত বেশি পথ ও কৌশল তার ভাণ্ডারে জমা হবে।

লেভ ভিগোতস্কি বলেছিলেন নিকটবর্তী বিকাশের অঞ্চলের কথা। যেখানে একজন অধিক জ্ঞানী মানুষের সহায়তায় শিশু একা যা পারে না তা-ও পারে। নতুন শিক্ষক নতুন ধরনের সহায়তা নিয়ে আসেন, যা অনেক সময় আটকে থাকা শিশুকে পরের ধাপে নিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

হাওয়ার্ড গার্ডনারের বহুমুখী বুদ্ধিমত্তার ধারণাবাদ মনে করিয়ে দেয়, সব শিশু একই পথে শেখে না। কেউ গানে, কেউ ছবিতে, কেউ হাতে-কলমে কাজ করে সবচেয়ে ভালো বোঝে। একজন শিক্ষকের পক্ষে সব ধরনের বুদ্ধিমত্তাকে সমানভাবে ছুঁতে পারা কঠিন, কিন্তু ভিন্ন শক্তির কয়েকজন শিক্ষক মিলে সেটি সম্ভব করতে পারেন।
তবে এখানে একটি ভারসাম্য দরকার। ছোট শিশুর জন্য চেনা শিক্ষকের সঙ্গে নিরাপদ সম্পর্ক ও নিয়মিত রুটিন শিখনের ভিত্তি। প্যানেল শিক্ষক তাই মূল খাবার নয়, রান্নার মশলার মতো, পরিমিত ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলেই সবচেয়ে বেশি কাজের।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবতা: সংখ্যার আয়নায়

প্যানেল শিক্ষকের প্রস্তাব কেন এখন জরুরি, তা বোঝা যায় আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক চিত্র দেখলে। নিচের সংখ্যাগুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।

সংখ্যাগুলোর পেছনের মানবিক ছবি আরও স্পষ্ট। গাজীপুরের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটে প্রতিদিন প্রায় তিনটি ক্লাস বাতিল হয়, আর একজন শিক্ষককে একই দিনে বাংলা, ধর্ম ও ইংরেজি পড়াতে হয়। জামালপুরের একটি বিদ্যালয়ে পাঁচটি পদের বিপরীতে জানুয়ারি থেকে মাত্র একজন শিক্ষক সত্তরজন শিশুকে পড়াচ্ছেন। এমন বিদ্যালয়ে শিশুর পাঁচ বছরের পুরো প্রাথমিক জীবন কাটে হাতেগোনা দু-একজন মানুষের সঙ্গে।

শিখন ফলাফলও একই সতর্ক বার্তা দেয়। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২ অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণির ৬১ শতাংশ ও পঞ্চম শ্রেণির ৭০ শতাংশ শিশুর গণিতে শ্রেণি উপযোগী দক্ষতা নেই। বাংলায় এই হার যথাক্রমে ৫১ ও ৫০ শতাংশ। প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হারও ২০২৩ সালের ১৩.১৫ থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে ১৬.২৫ শতাংশ হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে একটি বিষয় লক্ষণীয়। অনেক জেলায় প্রধান শিক্ষকহীন বিদ্যালয় চালু রাখতে অন্য বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক প্রেষণে পাঠানো হচ্ছে। যেমনটা জানিয়েছেন রংপুরের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। অর্থাৎ এক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অন্য বিদ্যালয়ে যাওয়ার চর্চা আমাদের ব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই আছে। তবে সংকট সামলানোর জোড়াতালি হিসেবে। প্যানেল শিক্ষক ব্যবস্থা সেই চর্চাকেই পরিকল্পিত আর শিখনকেন্দ্রিক রূপ দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন

আগামী দশকে যে পেশাগুলো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে

বিশ্বের অভিজ্ঞতা: শ্রেণিকক্ষের দরজা খুলে দেওয়া

প্যানেল শিক্ষকের মূল ভাবনা, অর্থাৎ এক শিক্ষকের ক্লাস অন্য শিক্ষকের জন্য উন্মুক্ত করা, বিশ্বে নতুন নয়। বরং সফল শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যই হলো, সেখানে শিক্ষণ শিক্ষকের একার বন্ধ ঘরের কাজ নয়।

জাপানের ‘জুগ্যো কেনকিউ’ বা লেসন স্টাডির সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। একদল শিক্ষক একটি শিখন সমস্যা বেছে নেন, একসঙ্গে পাঠ পরিকল্পনা করেন, একজন সেটি ক্লাসে পড়ান আর বাকিরা পর্যবেক্ষণ করেন। প্রায়ই বিদ্যালয়ের বাইরের একজন উপদেষ্টাও থাকেন, যিনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রে ৩৯টি শিক্ষক দলের ওপর এক দৈবনির্বাচিত পরীক্ষায়, যাদের ৮৭ শতাংশই ছিলেন প্রাথমিকের শিক্ষক। মাত্র তিন মাসের লেসন স্টাডিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দুই পক্ষেরই ভগ্নাংশের জ্ঞান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। পিয়ার কোচিং নিয়ে ব্রুস জয়েস ও বেভারলি শাওয়ার্সের গবেষণা আরও প্রাসঙ্গিক।

১৯৭০-এর দশকের মূল্যায়নে তারা দেখেছিলেন, প্রশিক্ষণে যা শেখানো হয় তার শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করেন মাত্র ১০ শতাংশের মতো শিক্ষক। অথচ সহকর্মীরা একসঙ্গে পরিকল্পনা করলে ও একে অপরের ক্লাস দেখলে প্রয়োগের হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। একটি পর্যবেক্ষণ প্যানেল শিক্ষক ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়: যিনি পড়ান তিনিই ‘কোচ’, আর যিনি দেখেন তিনি শিখছেন। ক্লাস দেখার পর মূল্যায়নমূলক মন্তব্য না করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা, কারণ মূল্যায়নের ভয়ে সহযোগিতা ভেঙে পড়ে।

বাংলাদেশেও বাইরের শিক্ষকের প্রভাবের একটি প্রমাণ আছে। কোভিডের সময় খুলনা অঞ্চলের ২০০টি গ্রামে স্বেচ্ছাসেবক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ফোনে প্রাথমিকের শিশুদের পড়ানোর পর তাদের পরীক্ষার নম্বর ৩৫ শতাংশ বেড়েছিল। গবেষকরা এর একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ‘রোল মডেল প্রভাব’ এর কথা বলেছেন। অর্থাৎ বাইরে থেকে আসা সম্মানিত একজন পথপ্রদর্শক শিশু ও মায়ের আগ্রহ বাড়িয়েছিলেন।

এসব অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা একটিই। প্রশিক্ষণকক্ষে বসে শেখা জ্ঞান নিজে থেকে ক্লাসরুমে পৌঁছায় না, তাকে পৌঁছাতে হয় জীবন্ত ক্লাসের মধ্য দিয়ে। আর তাতে বাইরের একটি চোখ আর কণ্ঠ বড় ভূমিকা রাখে।

প্যানেল শিক্ষক কী বদলাতে পারে

এই ব্যবস্থার লাভ তিন পক্ষের: শিশু, শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের।

শিশুর জন্য নতুন জানালা

যে শিশু এক শিক্ষকের ব্যাখ্যায় ভগ্নাংশ বোঝেনি, সে অন্যজনের রুটি ভাগের গল্পে হঠাৎ বুঝে যেতে পারে। নতুন মুখ, নতুন কৌশল আর পরিকল্পিত চমক শিশুর মনোযোগ ফিরিয়ে আনে। আর আগেই দেখানো গেছে, এমন নতুন অভিজ্ঞতা আশপাশের পাঠকেও মনে রাখতে সাহায্য করতে পারে। যেখানে একজন শিক্ষককে তিন-চারটি বিষয় পড়াতে হয়, সেখানে মাসে একদিন হলেও একজন বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের ক্লাস পাওয়া শিশুর জন্য বড় প্রাপ্তি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশু বুঝতে শেখে তার ছোট্ট বিদ্যালয়টি একটি বড় শিখন জগতের অংশ।

শিক্ষকের জন্য জীবন্ত প্রশিক্ষণ

অধিকাংশ প্রাথমিক শিক্ষক চাকরিজীবনে খুব কমই অন্য শিক্ষকের আসল ক্লাস দেখার সুযোগ পান। প্যানেল শিক্ষক যখন ক্লাস নেন, আয়োজক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পেছনে বসে দেখেন নিজেরই শিশুরা নতুন কৌশলে কীভাবে সাড়া দেয়। এটি সবচেয়ে বাস্তব প্রশিক্ষণ, কারণ এখানে কৌশলটি পরীক্ষিত হচ্ছে তার নিজের ক্লাসেই। আবার প্যানেল শিক্ষকও ভিন্ন পরিবেশের শিশুদের পড়াতে গিয়ে নিজের কৌশল শানিয়ে নেন। দুজনের পেশাগত একাকিত্বও কমে।

দক্ষতার স্বীকৃতি

উপজেলার প্যানেলে জায়গা পাওয়া একজন শিক্ষকের জন্য সম্মানের বিষয় হতে পারে। যে পেশায় ভালো পড়ানোর আলাদা স্বীকৃতি খুব কম, সেখানে এটি দক্ষ শিক্ষকদের উদ্যম ধরে রাখার একটি উপায়। নতুন শিক্ষকদের কাছেও এটি একটি লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

বিদ্যালয়ের জন্য ভালো চর্চার প্রসার

এক বিদ্যালয়ের সফল কৌশল এখন সেখানেই আটকে থাকে। প্যানেল শিক্ষক সেই কৌশল উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারেন। শিক্ষক সংকটে পড়া বিদ্যালয়ের জন্যও এটি এক ধরনের নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক সহায়তা। অভিভাবকেরাও দেখেন তাদের সন্তানের বিদ্যালয়ে নতুন কিছু ঘটছে। যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা ফেরাতে সাহায্য করতে পারে।

বাস্তবায়নের একটি সম্ভাব্য রূপরেখা

প্যানেল শিক্ষক ব্যবস্থা চালু করতে বড় কোনো প্রকল্পের দরকার নেই; দরকার সুস্পষ্ট নিয়মের। একটি সম্ভাব্য কাঠামো এমন হতে পারে-

  • প্যানেল গঠন: প্রতিটি উপজেলায় ইউআরসি ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ তত্ত্বাবধানে ১৫-২০ জনের একটি বিষয়ভিত্তিক প্যানেল থাকবে। নির্বাচন হবে নমুনা ক্লাস, সহকর্মী ও প্রধান শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে। মেয়াদ দুই বছর, যাতে নতুনরাও সুযোগ পান।
  • অগ্রাধিকার বিষয়: শুরুতে গণিত ও বাংলায় জোর দেওয়া যেতে পারে, কারণ জাতীয় মূল্যায়নে এই দুই বিষয়েই সবচেয়ে বড় ঘাটতি ধরা পড়েছে। সঙ্গে চারুকলা, সঙ্গীত বা খেলাধুলার মতো বিষয়ও থাকতে পারে। যেগুলো শিশুর কাছে সবচেয়ে বেশি নতুনত্ব নিয়ে আসে।
  • সময়সূচি: প্রতিটি প্যানেল শিক্ষক মাসে দুইদিন নিকটবর্তী কোনো বিদ্যালয়ে ১-২টি ক্লাস নেবেন। ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৫০৫টি উপজেলার হিসাবে ভাগ করলে উপজেলাপ্রতি গড়ে প্রায় ১৩০টি বিদ্যালয় দাঁড়ায়। ২০ জনের প্যানেল মাসে ৪০টি বিদ্যালয় ঘুরলে প্রতিটি বিদ্যালয় বছরে তিন-চারবার অতিথি শিক্ষক পাবে, যা নতুনত্ব ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট।
  • ক্লাসের আগে যৌথ পরিকল্পনা: আয়োজক শিক্ষকের সঙ্গে ১৫-২০ মিনিটের আলাপে ঠিক হবে কোন অধ্যায় পড়ানো হবে আর শিশুরা কোথায় আটকে আছে। পাঠ হবে চলমান শিক্ষাক্রমের অংশ, আলাদা কোনো প্রদর্শনী নয়।
    ক্লাস চলাকালে পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন নয়। আয়োজক শিক্ষক উপস্থিত থেকে দেখবেন, কোনো নম্বরপত্র বা পরিদর্শন ফরম থাকবে না।
  • ক্লাসের পরে ছোট প্রতিফলন: দুজনে মিলে দেখবেন শিশুরা কী শিখল আর কোন কৌশল কাজ করল। মাসিক সাব-ক্লাস্টার প্রশিক্ষণে এই অভিজ্ঞতা ভাগ করা হবে।
  • বিনিময় পদ্ধতি: প্যানেল শিক্ষকের নিজের ক্লাস যেন ফাঁকা না থাকে, সেজন্য দুটি পাশাপাশি বিদ্যালয় একই দিনে একজন করে শিক্ষক বিনিময় করতে পারে। এতে কোনো ক্লাস বাতিল হয় না, আর দুই বিদ্যালয়ের শিশুরাই নতুন শিক্ষক পায়।
  • সহজ নথি ও প্রণোদনা: একটি সহজ রেজিস্টার বা বিদ্যমান অনলাইন ব্যবস্থায় ক্লাসের তারিখ, বিষয় ও শিশুদের প্রতিক্রিয়া লেখা থাকবে। প্যানেল শিক্ষকেরা পাবেন যাতায়াত ভাতা, সনদ ও বার্ষিক মূল্যায়নে স্বীকৃতি।
আরও পড়ুন

প্রফেশনাল কমিউনিকেশনে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা ও শিক্ষার্থীদের করণীয়

এই কাঠামোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি নতুন পদ বা ভবন চায় না। ইউআরসি, সাব-ক্লাস্টার ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক তো আগে থেকেই আছে, দরকার শুধু তাদের এক সুতোয় গাঁথা।

চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতা

ভালো ধারণাও ভুলভাবে বাস্তবায়ন করলে উল্টো ফল দিতে পারে। প্যানেল শিক্ষক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অন্তত চারটি ঝুঁকি আগে থেকেই মাথায় রাখা দরকার।

  • এক ঘর ভরাতে গিয়ে আরেক ঘর খালি: ১২ হাজারের বেশি বিদ্যালয় যেখানে চার বা তার কম শিক্ষক দিয়ে চলছে, সেখানে একজন শিক্ষককে বাইরে পাঠালে নিজের বিদ্যালয়ের ক্লাসই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই প্যানেল শিক্ষক বেছে নিতে হবে তুলনামূলক ভালো জনবলের বিদ্যালয় থেকে। আর কম জনবলের বিদ্যালয়গুলো হবে প্রধানত আয়োজক। পাশাপাশি আগে বলা বিনিময় পদ্ধতিও এখানে সমাধান হতে পারে।
  • ভূগোল ও যাতায়াত: হাওর, চর ও পাহাড়ি এলাকায় পাশের বিদ্যালয়ে যেতেও নৌকা বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটা লাগতে পারে। এসব এলাকায় সাব-ক্লাস্টারের ভেতরেই সবচেয়ে কাছের বিদ্যালয় জোড়া বাঁধা, বর্ষার মাসে সময়সূচি শিথিল করা ও নির্দিষ্ট যাতায়াত ভাতা নিশ্চিত করা জরুরি।
  • মূল্যায়নের ভয় ও আত্মসম্মান: আয়োজক শিক্ষক মনে করতে পারেন, তার ক্লাস অন্যকে দিয়ে নেওয়ানো মানে তিনি অযোগ্য। এই ভয় দূর করতে হলে প্রথম দিন থেকেই স্পষ্ট করতে হবে যে এটি পরিদর্শন নয়, আর কোনো পর্যবেক্ষণ শিক্ষকের বার্ষিক মূল্যায়নে যাবে না। পিয়ার কোচিং গবেষণার সেই শিক্ষাই এখানে প্রযোজ্য; মূল্যায়ন ঢুকলে সহযোগিতা বেরিয়ে যায়।
  • নতুনত্বের ক্ষয়: একই প্যানেল শিক্ষক বারবার একই বিদ্যালয়ে গেলে তিনিও একসময় ‘চেনা’ হয়ে যাবেন। আর্জেন্টিনার গবেষণায় ক্লাস চেনা হয়ে গেলে তার প্রভাব হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এখানে মনে রাখা দরকার। তাই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভিন্ন শিক্ষক পাঠানো ও মাঝারি মাত্রায় আসা-যাওয়া রাখাই ভালো। অন্যথায় ছোট শিশুর রুটিনও বারবার ভাঙবে।

এর সঙ্গে প্যানেল নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে পুরো উদ্যোগটি পছন্দের লোককে সুবিধা দেওয়ার আরেকটি পথে পরিণত হতে পারে। নির্বাচনের মানদণ্ড জনসমক্ষে প্রকাশ করা ও প্রতি দুই বছরে প্যানেল নতুন করে গঠন করা এখানে বড় সুরক্ষা।

সুপারিশ

প্যানেল শিক্ষক ব্যবস্থাকে স্লোগান না বানিয়ে প্রমাণনির্ভর উদ্যোগ হিসেবে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সেজন্য কয়েকটি পদক্ষেপ-

  • এক বছরের পাইলট: হাওর, চর, পাহাড়,উপকুল ও সমতলের কয়েকটি উপজেলায় এক শিক্ষাবর্ষ পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। সম্ভব হলে খুলনার টেলিমেন্টরিং গবেষণার মতো দৈবনির্বাচিত তুলনা করে শিখন ফলাফল মাপা দরকার।
  • নীতিগত স্বীকৃতি: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি স্পষ্ট নির্দেশনা ও পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে (পিইডিপি-৫) এটিকে শিক্ষক উন্নয়নের একটি অংশ হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে।
  • ইউআরসিকে সমন্বয়কের দায়িত্ব: প্যানেল গঠন, সময়সূচি তৈরি ও প্রতিফলন সভার দায়িত্ব উপজেলা রিসোর্স সেন্টারকে দেওয়া যেতে পারে। যাতে এটি প্রশিক্ষণেরই ধারাবাহিকতা হয়ে ওঠে।
  • নারী শিক্ষকদের অংশগ্রহণ: সরকারি প্রাথমিকের ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭০৪ জনই নারী। তাই কাছাকাছি বিদ্যালয়ে পাঠানো, নিরাপদ যাতায়াত ও নমনীয় সময়সূচি নিশ্চিত না করলে প্যানেল অর্ধেক শক্তি হারাবে।
  • শিশুর কণ্ঠ শোনা: ক্লাস শেষে শিশুরা কী ভাবল, তা ছোট প্রশ্ন, ছবি আঁকা বা মুখে বলার মাধ্যমে জানা যায়, আর সেটিই হবে ব্যবস্থাটির সবচেয়ে সৎ মাপকাঠি।
  • স্বল্প খরচের প্রণোদনা: যাতায়াত ভাতা ও সনদের খরচ খুবই কম। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা প্রস্তাবিত হয়েছে যার অতি ক্ষুদ্র একটি অংশেই এই উদ্যোগ চালানো সম্ভব।

স্যার, আবার কবে আসবেন?

লেখার শুরুর সেই প্রশ্নটিই আসলে প্যানেল শিক্ষক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় যুক্তি। যে শিশু ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করে, সে শেখার জন্যও প্রস্তুত থাকে। শিক্ষণ তখনই সার্থক, যখন তা থেকে শিখন ঘটে। আর শিখন সবচেয়ে ভালো ঘটে যখন শিশুর কৌতূহল জেগে ওঠে।

প্যানেল শিক্ষক কোনো জাদুর ওষুধ নয়। এটি শিক্ষক সংকট মেটাবে না, দুই শিফটের সমস্যারও সমাধান করবে না। কিন্তু প্রায় বিনা খরচে, বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরে থেকেই এটি প্রাথমিক শিক্ষায় তিনটি জিনিস ফিরিয়ে আনতে পারে। শিশুর কাছে শেখার আনন্দ, শিক্ষকের কাছে পেশাগত মর্যাদা, আর বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একসঙ্গে শেখার সংস্কৃতি।

আমাদের শ্রেণিকক্ষের দরজা এখন নির্ভয়ে খুলে দেওয়ার সময়। একটি উপজেলায়, একটি শিক্ষাবর্ষে, কয়েকজন আগ্রহী শিক্ষককে দিয়ে শুরু করলেই বোঝা যাবে, শিশুরা আসলেই কতটা অপেক্ষা করছিল একটুখানি নতুনত্বের জন্য।

লেখক: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত।