সিরিয়ায় আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে দোষী সাব্যস্ত নারী

প্রকাশিত: ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় গিয়ে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) এক যোদ্ধাকে বিয়ে করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া হালিমা সালমান। আইএসের কাছ থেকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার মামলায় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।

এ অপরাধে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি তার সাজা ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হালিমার বিরুদ্ধে আইএসের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার এবং সংগঠনটির কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। বিচার চলাকালে আদালতে একটি ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে তাকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে দেখা যায়।

এ ছাড়া আইএসের পতাকার সঙ্গে তার একটি ছবি এবং স্বামীর কাছে পাঠানো কয়েকটি স্নেহপূর্ণ খুদে বার্তাও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

ব্রুকলিনের মার্কিন অ্যাটর্নি জোসেফ নোসেলা জুনিয়র এক বিবৃতিতে বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে হালিমাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য দায়ী করা হয়েছে।

তবে হালিমার আইনজীবীদের দাবি, কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় গিয়ে তিনি গৃহযুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়েন। পরে চরমপন্থী স্বামীর নিয়ন্ত্রণে থাকতে বাধ্য হন। তাদের বক্তব্য, স্বামীর নির্দেশ মেনে চলা ছাড়া তার সামনে তেমন কোনো বিকল্প ছিল না।

আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে হালিমা বলেন, ‘আপনি চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে আপনার মৃত্যু হবে।’ তিনি আরও জানান, ১৮ বছর বয়সে তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেননি। বিয়ের পর একাধিকবার বিবাহবিচ্ছেদের চেষ্টাও করেছিলেন।

রায় ঘোষণার পর হালিমা, তার মা ও আইনজীবীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আদালতের রেলিংয়ের দুই পাশ থেকে হালিমা ও তার মা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।

বিচারকেরা বৃহস্পতিবার থেকে মামলার রায় নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। সোমবার তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা হালিমাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। রায়ের পর আদালত থেকে বের হওয়ার সময় বিচারকেরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

হালিমার আইনজীবীরা রায় বাতিল করে তাকে খালাস দেওয়ার আবেদন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব না হলে বিচারক রায় বাতিল করে খালাস দিতে পারেন। তবে এ ধরনের আবেদন খুব কম ক্ষেত্রেই মঞ্জুর হয়।

বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় যাত্রা

নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া হালিমার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন ২০১৭ সালে তার বাবা পুরো পরিবারকে নিয়ে সিরিয়ায় যান। হালিমার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ভেবেছিলেন, তারা তুরস্কে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের বহনকারী ভ্যানটি সিরিয়ায় ঢুকে পড়লে মুখোশ পরা কয়েকজন বন্দুকধারী তাদের ঘিরে ধরে।

আদালতে হালিমা বলেন, তিনি ভীত ছিলেন এবং কী ঘটছে, তা বুঝতে পারছিলেন না। বাবার পরিকল্পনা সম্পর্কেও তার ধারণা ছিল না। তিনি বলেন, ‘যা যা ঘটেছে, তার অনেক কিছুর জন্যই আমি আমার বাবাকে দায়ী করি।’

পরিবারের সঙ্গে আবার মিলিত হওয়ার আগে তিনি তিন মাস আইএস পরিচালিত একটি আবাসনকেন্দ্রে ছিলেন বলে জানান। বিমান হামলায় তাদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুবার বাসা বদল করতে হয়।

বিয়ের প্রথম দিনের স্মৃতিচারণ করে হালিমা জানান, তার স্বামী তাকে বলেছিলেন, ‘ওঠো, বোকা বউ। এবার তোমার স্ত্রী হওয়ার সময় হয়েছে।’ বিয়ের বেশির ভাগ সময় তিনি স্বামী ও শাশুড়ির জন্য ঘরের কাজ করতেন। ২০১৮ সালে বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর তার বাবা মারা যান।

অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে বিতর্ক

হালিমার আইনজীবীদের দাবি, সিরিয়ায় নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি পুরো সত্য বলেননি। তাদের মতে, সেখানে তার স্বাধীনতা হালিমার বর্ণনার চেয়ে বেশি ছিল। জেরার সময় আইনজীবীরা তাকে স্বীকার করতে বলেন, তিনি একবার ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে একটি ধর্মীয় গান স্বামীকে পাঠিয়েছিলেন। তার দাম্পত্য জীবন ভালো ছিল না—এমন বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। এ সময় স্বামীর কাছে পাঠানো দুটি স্নেহপূর্ণ খুদে বার্তা আদালতে তুলে ধরা হয়।

মামলার সমাপনী বক্তব্যে সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নি আমান্ডা শামি বলেন, প্রমাণে দেখা গেছে, হালিমা একটি সহিংস ও নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী সংগঠনের কাছ থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। আইনজীবীদের দাবি, হালিমার স্বামী তার হাতে একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থাকার ভিডিও ধারণ করেছিলেন এবং তাকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।

তবে হালিমার বক্তব্য, স্বামীর অনুরোধেই তিনি রাইফেলটি হাতে নিয়েছিলেন। তিনি আরও জানান, তাদের দাম্পত্য জীবনের শেষ বছরটি ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ। এ সময় প্রায়ই বোমা হামলা হতো এবং কখনো কখনো হামলার কারণে তাদের রাস্তায় রাত কাটাতে হতো। সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘চারদিকে শুধু মৃতদেহ দেখতে পেতাম।’

একপর্যায়ে অন্য শরণার্থীদের সঙ্গে একটি ট্রাকে করে পালিয়ে যান তারা। ট্রাকে থাকতেই স্বামীকে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা জানান হালিমা। আদালতে তিনি বলেন, এরপর আর কখনো স্বামীকে দেখেননি।

২০১৯ সালে সিরিয়ার বাঘুজ এলাকায় আইএসবিরোধী বাহিনীর হাতে আটক হন হালিমা। ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে ফিরে এলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তার করে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার আইএসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৪ সালে সংগঠনটি ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিজেদের খিলাফত ঘোষণা করে। ২০১৭ সালে ইরাকে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় তারা পরাজিত হলেও দুই দেশেই সংগঠনটির গোপন ঘাঁটি রয়েছে, যেখান থেকে তারা প্রাণঘাতী হামলা চালায়।