ফের পুতিন! প্রকাশিত: ৪:৪৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। ফলটি অবশ্য অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) শুরু হয়ে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) শেষ হওয়া এই নির্বাচনে রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার সদস্য নির্বাচন করা হয়েছে। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এই নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়া নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে যাচ্ছে। পুতিনের নীতির বিরোধিতা করার সুযোগও ছিল সীমিত। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ক্রেমলিন এই নির্বাচনকে সাধারণ মানুষের মতামত জানানোর সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছিল। তবে যুদ্ধবিরোধী অধিকাংশ প্রার্থীকে ব্যালটে জায়গা দেওয়া হয়নি। যেসব যুদ্ধবিরোধী প্রার্থী উদারপন্থি ইয়াবলোকো পার্টির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তারাও স্বাধীনতা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। নির্বাচনের আগে দলটির দুই জ্যেষ্ঠ নেতাকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্যের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারপরও ইয়াবলোকোর নেতা নিকোলাই রিবাকভ নিজের ব্যালট ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করেন। ব্যালটে তিনি নিজের দলের নামের পাশাপাশি লেখেন- ‘শান্তির জন্য’। প্রাথমিক ফলে কী দেখা যাচ্ছে? রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস সোমবার জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ৯০ দশমিক ৪৩ শতাংশ ব্যালট গণনা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, রোববার রাত পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৫৭ শতাংশের সামান্য কম। দলীয় তালিকার ভোটে ইউনাইটেড রাশিয়া পেয়েছে ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ ভোট। দলীয় তালিকার মাধ্যমে স্টেট ডুমার ২২৫টি আসনে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। বাকি ২২৫টি আসন একক আসনের নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণ হবে। এসব আসনের অধিকাংশও পুতিনের দল পেতে যাচ্ছে বলে প্রাথমিক ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় কোনো অপ্রত্যাশিত ফল বা পালাবদলের ঘটনা দেখা যায়নি। তাস আরও জানিয়েছে, ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট, কমিউনিকেশনস অ্যান্ড মাস মিডিয়া মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩৬ লাখের বেশি মানুষ অনলাইনে ভোট দিয়েছেন। এই ভোটারদের মধ্যে ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল- দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া- থেকে ভোট দেওয়া মানুষও ছিলেন। ২০২২ সালে মস্কো এসব অঞ্চলকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেয়। ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়ার ভোটাররাও অংশ নিয়েছেন। তবে জাতিসংঘ এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ক্রিমিয়া ও ইউক্রেনের অন্যান্য দখলকৃত অঞ্চলকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। অন্য দলগুলোর অবস্থান কী? প্রাথমিক ফলাফলে ইউনাইটেড রাশিয়ার পেছনে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য রাশিয়ান ফেডারেশন বা সিপিআরএফ, কট্টোর জাতীয়তাবাদী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব রাশিয়া বা এলডিপিআর, নিউ পিপল ও এ জাস্ট রাশিয়া। তাসের হিসাবে, সিপিআরএফ পেয়েছে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট। এলডিপিআর পেয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, নিউ পিপল ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং এ জাস্ট রাশিয়া ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ ভোট। এই দলগুলো পার্লামেন্টে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ইউনাইটেড রাশিয়ার সঙ্গেই ভোট দেয়। তারপরও প্রাথমিক ফলে তারা স্টেট ডুমায় আসন পেতে যাচ্ছে। তবে বার্লিনভিত্তিক থিংকট্যাংক এনইএসটি বা নেস্ট বলছে, ফলাফল যতটা অনুমানযোগ্য মনে হচ্ছে, অর্থনৈতিক চাপের সময়ে এর মধ্যে ক্রেমলিনের জন্য কিছু অস্বস্তিকর বার্তাও থাকতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্রেমলিন সমালোচক মিখাইল খোদোরকভস্কি। নেস্ট-এর মতে, সিপিআরএফ ও নিউ পিপল যে ভোট পেয়েছে, তার একটি অংশ অনেক ক্ষেত্রে পুতিন ও ইউনাইটেড রাশিয়ার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে দেখা যেতে পারে। যদিও পার্লামেন্টের অধিকাংশ ইস্যুতে এসব দল প্রেসিডেন্টকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে না। এক বিবৃতিতে নেস্ট বলেছে, যুদ্ধের প্রভাব রাশিয়ার ভেতরে ক্রমেই বেশি অনুভূত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা উদ্বেগ ও হতাশা এমন ভোটে রূপ নিতে পারে, যা ক্রেমলিন ব্যালটে থাকার অনুমতি দেওয়া ‘সিস্টেমিক’ বিরোধী দলগুলোর দিকে যেতে পারে। আগের নির্বাচনে কী হয়েছিল? ২০২১ সালের স্টেট ডুমা নির্বাচনে ৪৫০ আসনের নিম্নকক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছিল ইউনাইটেড রাশিয়া। দলটি পেয়েছিল ৩২৬টি আসন। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ছিল সিপিআরএফ। তারা পেয়েছিল ৫৭টি আসন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই রাশিয়ার রাজনীতিতে দলটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে। এবারের নির্বাচনের প্রাথমিক ফল ও ভোটার উপস্থিতির তথ্য সোমবার প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। তবে চূড়ান্ত ফল শুক্রবারের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ততদিনে সব ব্যালট গণনা এবং আইনে নির্ধারিত অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা। রাশিয়ার নির্বাচনে ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া কী? ইউক্রেন রাশিয়ার এই নির্বাচনকে আগেই নিন্দা করেছে। বিশেষ করে, ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে ভোট নেওয়ার বিষয়টিকে অবৈধ বলে অভিহিত করেছে কিয়েভ। অন্যদিকে, রোববার ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার বড় একটি ঢেউয়ের পর মস্কো অভিযোগ করেছে, কিয়েভ নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করছে। তাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর রোববারের ড্রোন হামলা ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি। রুশ আঞ্চলিক গভর্নর ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মস্কো অঞ্চলে ওই হামলায় তিনজন এবং রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত খেরসন অঞ্চলে আরও দুজন নিহত হন। নিহতদের একজন ছিলেন নির্বাচন কর্মকর্তা। এছাড়া মস্কোর একটি তেল শোধনাগারের একটি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই স্থাপনাটি এর আগেও হামলার লক্ষ্য হয়েছিল। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলেও ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ইয়েগর কোভালচুকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। এবারের নির্বাচন তাই শুধু স্টেট ডুমার আসন নির্ধারণের ভোট নয়; ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ, ক্রেমলিনের প্রতি সমর্থন এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা Download PhotoCard SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: ফের পুতিন!