যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত মোদীর, ছাড়তে হলো গ্রেফতার মার্কিন নাগরিককে প্রকাশিত: ১২:৪১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে মাথা নত করেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ অ্যারন ভ্যানডাইককে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে মোদী সরকার। সম্প্রতি এমন অভিযোগ তুলেছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফের মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন ও এর মধ্য দিয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তবে ভ্যানডাইককে ‘সিআইএ এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো সরকারি প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি; কংগ্রেসের অভিযোগ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে মার্কিন নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভ্যানডাইককে ঘিরে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয় কংগ্রেস। দলটির অভিযোগ, ভ্যানডাইককে এক মাসের ডিফল্ট জামিনে মুক্তি দিয়ে দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে জাতীয় তদন্ত সংস্থা বা এনআইএ তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তদন্ত করলেও ৮ সেপ্টেম্বর দাখিল করা অভিযোগপত্রে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএর ধারা রাখা হয়নি। পরে দিল্লির একটি বিশেষ আদালত তাকে ডিফল্ট জামিন দেয় ও ২৪ সেপ্টেম্বর ভ্যানডাইকসহ ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিককে নিজ নিজ দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৩ মার্চ গ্রেফতার, শুরু হয় সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্রের তদন্ত রমেশের দেওয়া ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, ১৩ মার্চ ভ্যানডাইকসহ একদল বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করে এনআইএ। তাদের বিরুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। ভ্যানডাইককে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। একই দিনে ইউক্রেনের নাগরিক পেত্রো হুরবা, তারাস স্লিভিয়াক ও ইভান সুকমানভস্কিকে লখনৌ বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। অন্য তিন ইউক্রেনীয় হলেন- মারিয়ান স্টেফানকিভ, মাকসিম হনচারুক ও ভিক্টর কামিনস্কিই। তাদের গ্রেফতার করা হয় দিল্লি বিমানবন্দর থেকে। এনআইএর অভিযোগ ছিল, ওই বিদেশিরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ, অবস্থান ও চলাচলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মিয়ানমারভিত্তিক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। তাদের বিরুদ্ধে ভারতে ও মিয়ানমারে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা এবং ড্রোন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছিল। তদন্তকারীদের সন্দেহ ছিল, দলটি ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবেও কাজ করছিল। রমেশের দাবি, ১৬ মার্চ আদালতে দেওয়া এনআইএর বক্তব্যে বলা হয়েছিল, অভিযুক্তরা ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সহযোগিতা করছিলেন। তাদের একজন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তার কথা স্বীকার করেছিলেন বলেও অভিযোগ রমেশের। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি ও তদন্তের অংশ হিসেবেই এগুলো সামনে এসেছে। রুবিওর ভারত সফরের সময় ভ্যানডাইকের প্রসঙ্গ কংগ্রেসের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর। রমেশের দাবি, ২৩ থেকে ২৬ মে রুবিও ভারত সফরের সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর ভ্যানডাইকের বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির কাছে তুলেছিলেন। ভ্যানডাইকের পরিবারও এর আগে মার্কিন কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছিল। পরিবার-সংশ্লিষ্ট এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ভারতে ভ্যানডাইকের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর রুবিও ও বিক্রম মিশ্রিকে অবহিত করেছিলেন। তবে এই যোগাযোগকে ভ্যানডাইকের মুক্তির জন্য সরাসরি মার্কিন চাপ হিসেবে ভারত সরকার বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি। রুবিও ২৩ মে ভারতে পৌঁছেছিলেন ও ২৩ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত তার সফর চলে। সফরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কোয়াড সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। ৮ সেপ্টেম্বর বদলে যায় মামলার গতিপথ এরপর ৮ সেপ্টেম্বর মামলায় বড় পরিবর্তন আসে। ওই দিন এনআইএ সাত বিদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এতে ভ্যানডাইক ও ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্টের ২১ ও ২৩ ধারায় ভারতে অবৈধ প্রবেশ, অবস্থান ও চলাচলের অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু আগে যে ইউএপিএর অধীনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল, অভিযোগপত্রে সেই আইন প্রয়োগ করা হয়নি। অভিযোগপত্রে অবশ্য ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) বলেছে, ইউএপিএ-সংক্রান্ত তদন্ত পুরোপুরি শেষ হয়নি। সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে বিপুল পরিমাণ ড্রোন ও ড্রোনের সরঞ্জাম আনা এবং বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস জব্দের বিষয়টির তদন্ত চলছিল। এসব ডিভাইস পরীক্ষা করতেও সময় প্রয়োজন ছিল। সেই কারণে ইউএপিএর অধীনে অপরাধের প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে আদালতকে জানায় এনআইএ। এনআইএ আরও বলেছিল, তদন্তে এমন তথ্য সামনে আসতে পারে, যা ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কিংবা দেশের কোনো অংশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা নির্দেশ করতে পারে। বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সব দিক খতিয়ে দেখতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা বা বিএনএসএসের ১৯৩(৯) ধারার অধীনে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও চাওয়া হয়। ইউএপিএ বাদ দেওয়ায় আগেই প্রশ্ন তুলেছিল কংগ্রেস ৮ সেপ্টেম্বর এনআইএ অভিযোগপত্রে ইউএপিএ না রাখার পরই কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছিল, মার্কিন কর্তৃপক্ষের চাপে কি মোদী সরকার তদন্তকারী সংস্থাকে ইউএপিএ প্রয়োগ না করার নির্দেশ দিয়েছে? একই সঙ্গে দলটি প্রশ্ন করেছিল, এর বিনিময়ে ভারত কী পাওয়ার আশা করছে। কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হলেও বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে এই আইন বাদ দেওয়া হয়েছে। দলটি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বুলিং’ বা চাপ প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবেও বর্ণনা করেছিল। অন্যদিকে সরকারি অবস্থান হলো, ভ্যানডাইক ও অন্য ছয় বিদেশির বিরুদ্ধে ইউএপিএর তদন্ত বন্ধ করা হয়নি। এনআইএ জানিয়েছে, ইমিগ্রেশন আইনে চার্জশিট দাখিলের পাশাপাশি সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্র নিয়ে তদন্ত চলমান ছিল এবং প্রয়োজন হলে পরে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হতে পারে। এক মাসের ডিফল্ট জামিনে মুক্তি ভ্যানডাইক ১৩ মার্চ গ্রেফতার হওয়ায় ইউএপিএ মামলায় তদন্ত শেষ করার ১৮০ দিনের সময়সীমা ৮ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। ওই দিনই এনআইএ অভিযোগপত্র দাখিল করলেও সেখানে ইউএপিএর অভিযোগ রাখা হয়নি। পরে ভ্যানডাইকের আইনজীবীরা এই পরিস্থিতিতে ডিফল্ট জামিনের আবেদন করেন। ১৯ সেপ্টেম্বর দিল্লির বিশেষ এনআইএ আদালত ভ্যানডাইককে ডিফল্ট জামিন দেয়। বিচারক প্রশান্ত শর্মা মনে করেন, এনআইএর দাখিল করা অভিযোগপত্রটি অসম্পূর্ণ বা আংশিক ছিল, কারণ এতে ইমিগ্রেশন আইনের অভিযোগ থাকলেও ইউএপিএ-সংক্রান্ত তদন্ত তখনো চলছিল। আইনি সময়সীমার মধ্যে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়ায় ভ্যানডাইক ডিফল্ট জামিন পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন বলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর ভ্যানডাইককে তিহার জেল থেকে বের হওয়ার ও যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। একই মামলায় থাকা ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিককেও পরে ডিফল্ট জামিন দেওয়া হয় ও নিজ নিজ দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। আদালতের অনুমতির পর তাদের পাসপোর্ট ছাড়ার ব্যবস্থাও করা হয়। কীভাবে ভিসা পেলেন বিদেশিরা, অমিত শাহকে প্রশ্ন কংগ্রেসের ভ্যানডাইকের মুক্তির পর কংগ্রেস শুধু মার্কিন চাপের অভিযোগই তোলেনি, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছেও আরও মৌলিক প্রশ্নের উত্তর চেয়েছে। জয়রাম রমেশ প্রশ্ন তুলেছেন, সন্দেহভাজন এসব বিদেশি নাগরিক কীভাবে ভারতে প্রবেশের ভিসা পেলেন ও কীভাবে তারা ভারতের ভেতর দিয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত যেতে পারলেন? ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দিয়ে তাদের চলাচল, মিয়ানমারে প্রবেশ ও সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কথিত যোগাযোগ সম্পর্কে সরকারের কাছে কী তথ্য ছিল, সেটিও জানতে চেয়েছে কংগ্রেস। এনআইএর তদন্ত অনুযায়ী, অভিযুক্তরা পর্যটন ভিসায় ভারতে প্রবেশ করেছিলেন ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি না নিয়েই সেখানে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তারা মিজোরাম দিয়ে মিয়ানমারে প্রবেশ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই পুরো ঘটনা সামনে রেখে কংগ্রেসের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতের নির্বাচন, প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। রমেশের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের চাপেই যদি ভ্যানডাইকের মুক্তির পথ তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে এর বিনিময়ে ভারত কী পেয়েছে- সেটিই এখন সরকারের কাছে তাদের প্রধান প্রশ্ন। Download PhotoCard SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: ছাড়তে হলো গ্রেফতার মার্কিন নাগরিককেযুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত মোদীর